২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মামলায় আক্রান্ত স্বাস্থ্য বিভাগ, স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত

  • চেন অব কমান্ড হুমকিতে

নিখিল মানখিন ॥ উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা সহস্রাধিক মামলায় চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাভাবিক কার্যক্রম। ওই সব রিট মামলা নিষ্পত্তিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদফতরের আইন শাখা। রিট আবেদনগুলো বছরের পর বছর অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। অধিদফতরের আইন শাখায় জনবল সঙ্কট রয়েছে। সংক্ষুব্ধরা কারণে-অকারণে রিট ঠুকে অফিস আদেশ আটকে দেয়ায় অধিদফতরের ‘চেন অব কমান্ড’ নষ্ট হচ্ছে। বদলি আদেশ জারি হলে রিটের মাধ্যমে তা ঠেকিয়ে দেয়ায় পদটি দিনের পর দিন শূন্য থাকে। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ সেবাবঞ্চিত হন।

রিট মামলাগুলোর কারণে দেশের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ দীন মোঃ নুরুল হক। তিনি জনকণ্ঠকে জানান, রিট মামলাগুলো অধিদফতরের পরিকল্পিত কার্যক্রমে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বদলি ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণের ক্ষেত্রে বেশি রিট আবেদন হয়ে থাকে।

অধিদফতরের আইন বিভাগে দক্ষ জনবলের সঙ্কট রয়েছে। একটি রিট আবেদন নিষ্পত্তি হতেই বেশ সময় লেগে যায়। একটি পুরনো রিট নিষ্পত্তি হওয়ার আগে দু’টি নতুন রিট আবেদনের মুখোমুখি হতে হয়। তবে আগের তুলনায় গতিশীল হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের আইন শাখা। সরকারী আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে বেশ সহযোগিতা দিয়ে থাকেন। অধিদফতরের আইন শাখায় আরও জনবল নিয়োগ দেয়া হবে। মহাপরিচালক আরও জানান, রিট মামলা দায়েরকারীদের সঙ্গে কোন ধরনের আপোস হতে পারে না। দেশের স্বাস্থ্যসেবায় ‘চেন অব কমান্ড’ বজায় রাখতে আমরা সচেষ্ট। অনেকে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে অধিদফতরের বিরুদ্ধে রিট আবেদন করেন বলে অভিযোগ করেন মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ দীন মোঃ নুরুল হক।

আদালতে শক্ত অবস্থান ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে না পারায় সাম্প্রতিক সময়ে যে ক’টিতে আদালতের আদেশ হয়েছে সেগুলোতে স্বাস্থ্য বিভাগ হেরে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, যে কোন অফিস আদেশ মানতে না চাইলেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আদালতে রিট ঠুকে দেন। এটা এক ধরনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। রিটের মাধ্যমে স্থগিতাদেশ নিয়ে লাভবান হচ্ছেন রিটকারীরাই। বদলি আদেশ জারি হলে রিটের মাধ্যমে তা ঠেকিয়ে দেয়ায় পদটি দিনের পর দিন শূন্য থাকে। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ সেবাবঞ্চিত হন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আইন শাখায় পেশাদার লোক নেই। শক্ত অবস্থান নিতে না পারায় রিট হলে পরাজয়ই যেন স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ কাউকে শাস্তিমূলক বদলি অথবা দূরবর্তী স্থানে পদায়ন দিলেই সংক্ষুব্ধরা রিট দায়ের করেন। ওই রিট নিষ্পত্তি না হলে বদলি আদেশই কার্যকর হয় না। এভাবে অফিস আদেশগুলো আটকে যায়।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের আইন শাখা জানায়, সহস্রাধিক শতাধিক মামলার অধিকাংশেরই কোন সুরাহা হয়নি। তথ্য-উপাত্ত বলছে, গত কয়েক বছরে রিট ও মামলার সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, এর মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি রিট অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। অধিকাংশই বদলি ও পদোন্নতি সংক্রান্ত। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতাও এক্ষেত্রে সঙ্কটের আরেকটি কারণ। আইন শাখা সূত্র জানায়, প্রচুর কাজের চাপ সামলাতে বিদ্যমান জনবল অপর্যাপ্ত। মামলার ভারে নুয়ে পড়ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এ কারণে হুমকির মুখে পড়েছে স্বাস্থ্য বিভাগের চেন অব কমান্ড। বছরের পর বছর এসব মামলা ঝুলছে আদালতে। এতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগের দাফতরিক কাজ। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগ আদালতে শক্ত অবস্থান তুলে ধরতে না পারায় অধিকাংশ মামলাতেই হেরে যাচ্ছে। ফলে মামলার কারণে বদলি, পদোন্নতি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ইত্যাদি প্রশাসনিক আদেশ জারি করেও নিশ্চিত থাকতে পারছে না স্বাস্থ্য বিভাগ।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের বিরুদ্ধে মামলা ও রিটের সংখ্যা সরকারের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় বেশি। কারণ সংক্ষুব্ধরা ইচ্ছে করলেই আদালতে যেতে পারেন। তবে এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হলে স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম চালানো সহজ হয়।

অভিযোগ উঠেছে, আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে বদলি ঠেকানোসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিতে ব্যস্ত স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক শ্রেণীর কর্মচারী। সংশ্লিষ্ট শাখার দুর্বলতায় কর্মচারীদের মামলার দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে ব্যাহত হচ্ছে জনগুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাভাবিক কার্যক্রম। ফলে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

অধিদফতরের আইন শাখার তথ্যমতে, ১৯৮৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত শুধু হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের হয়েছে ১০৫৭টি। এর মধ্যে শুধু ২০১৪ সালে রিট মামলা দায়েরের সংখ্যা ৩২টি, যার মাত্র একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়। এ ছাড়া ১৯৯০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মোট মামলা হয়েছে ২০৪টি এবং প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালে মোট মামলার সংখ্যা ৩৫টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মামলাই নিষ্পত্তির মুখ দেখেনি। তবে অধিদফতরের বিরুদ্ধে কতটি দেওয়ানি মামলা চলমান অথবা এসব মামলার কতটি নিষ্পত্তি হয়েছে তার সর্বশেষ হিসাব নেই অধিদফতরের কাছে। রিট মামলার সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের আইন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান, অধিদফতরের বিরুদ্ধে যতগুলো রিট মামলা আছে, এগুলোর বেশিরভাগই তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বদলি সংক্রান্ত বিষয়ের। এরশাদ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশ অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের নিজ জেলায় অবস্থানের সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। কিন্তু অধিদফতরের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মচারী চাকরির নিয়মানুযায়ী পাশের থানায় বদলি হলেও এই আদেশের অপব্যাখ্যা করে অধিদফতরের বিরুদ্ধে একের পর এক রিট মামলা করে যাচ্ছেন। ফলে দিনে দিনে বাড়ছে অধিদফতরের মামলার সংখ্যা। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে অধিদফতরের আইন উপদেষ্টা না থাকায় মামলার কার্যক্রমে গতি আনয়ন সম্ভব হয় না।