২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম...

গৌতম পাণ্ডে ॥ ‘বন্ধে মায়া লাগাইছে, ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘বসন্ত বাতাসে সইগো’সহ অসংখ্য লোক গানের রচয়িতা শাহ্ আবদুল করিম। একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শিল্পীর ষষ্ঠ প্রয়াণবার্ষিকী আজ শনিবার। সিলেটের একটি ক্লিনিকে ২০০৯ সালের এই দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। উপমহাদেশের বরেণ্য এই শিল্পীর ষষ্ঠ প্রয়াণবাষিকী উপলক্ষে আগামীকাল এক স্মরণসভার আয়োজন করেছে যৌথভাবে সুবচন নাট্য সংসদ ও ভাটি বাংলা সংস্কৃতি পরিষদ। শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আলোচনা, গান, প্রামাণ্যচিত্র ও নাট্য প্রদর্শনীর মধ্যদিয়ে শিল্পীকে স্মরণ করবে সংগঠন দুটি। সুবচন নাট্য সংসদের দলপ্রধান নাট্যাভিনেতা আহাম্মেদ গিয়াস জানান, অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশেষ অতিথি থাকবেন সুবচন নাট্য সংসদের প্রধান উপদেষ্টা ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল (বীরপ্রতীক) ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, ভাটি বাংলা সংস্কৃতি পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা নেসার আলম মুকুল। আহাম্মেদ গিয়াস আরও জানান, আলোচনা শেষে শাহ্ আবদুল করিমের জীবন, সঙ্গীত ও দর্শন নিয়ে তথ্যচিত্র ‘ভাটির পুরুষ’ প্রদর্শন এবং সুবচন প্রয়োজিত ‘মহাজনের নাও’ নাটকের ৮৯তম মঞ্চায়ন হবে। গীতল নাটকটি লিখেছেন শাকুর মজিদ এবং নির্দেশনা দিয়েছেন সুদীপ চক্রবর্তী।

বাউল গানের কিংবদন্তি শাহ আবদুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই থানার উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দারিদ্র্য ও জীবন সংগ্রামের মাঝে বেড়ে ওঠা বাউল শাহ আবদুল করিমের সঙ্গীত সাধনার শুরু ছেলেবেলা থেকেই। তার স্ত্রী আফতাবুন্নেসার প্রেরণা তাঁকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে। তিনি তাকে আদর করে ডাকতেন ‘সরলা’। ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালবাসার পাশাপাশি তাঁর গান কথা বলে সকল অন্যায় অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তিনি তার গানের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন প্রখ্যাত বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ, পাঞ্জু শাহ ও দুদু শাহর দর্শন থেকে। যদিও দারিদ্র্য তাকে বাধ্য করে কৃষিকাজে তার শ্রম ব্যয় করতে কিন্তু কোন কিছু তাকে গান সৃষ্টি থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি আধ্যাত্মিক ও বাউল গানের দীক্ষা লাভ করেছেন কামাল উদ্দীন, সাধক রশীদ উদ্দীন, শাহ ইব্রাহীম মাস্তান বকশের কাছ থেকে। তিনি শরিয়তী, মারফতী, নবুয়ত, বেলায়াতসহ সব ধরনের বাউল গান ও গানের অন্যান্য শাখার চর্চাও করেছেন।

স্বশিক্ষিত বাউল শাহ আবদুল করিম দেড় সহস্রাধিক গান লিখেছেন ও সুরারোপ করেছেন। বাংলা একাডেমির উদ্যোগে তার ১০টি গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। শিল্পীর চাওয়া অনুযায়ী এ বছরের প্রথম দিকে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের উদ্যোগে বাউল শাহ আবদুল করিমের সমগ্র সৃষ্টিকর্ম নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কিশোর বয়স থেকে গান লিখলেও কয়েক বছর আগেও এ সব গান শুধুমাত্র ভাটি অঞ্চলের মানুষের কাছেই জনপ্রিয় ছিল। সম্প্রতি এ সময়ের বেশ কয়েকজন শিল্পী বাউল শাহ আবদুল করিমের গানগুলো নতুন করে গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

এ পর্যন্ত তাঁর ৬টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো হলোÑ ‘আফতাব সঙ্গীত’, ‘গণসঙ্গীত’, ‘কালনীর ঢেউ’, ‘ভাটির চিঠি’, ‘কালনীর কূলে’ ও ‘দোলমেলা’। সম্প্রতি সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে তার রচনাসমগ্র (অমনিবাস)’র মোড়ক উন্মোচন হয়েছে।

বাউল শাহ আবদুল করিম ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। দ্বিতীয় সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক এ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানে এই বাউল সম্রাটকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। তিনি ২০০০ সালে কথা সাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরী পদক পান। তিনি আজীবন দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করেছেন। সাউন্ড মেশিন নামের একটি অডিও প্রকাশনা সংস্থা ২০০৬ সালে ‘জীবন্ত কিংবদন্তি : বাউল শাহ আবদুল করিম’ নামে বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া তার জনপ্রিয় ১২টি গানের একটি এ্যালবাম প্রকাশ করে। এই এ্যালবামের বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ বার্ধক্যজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য তার পরিবারের কাছে তুলে দেয়া হয়। বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম ২০০৯ সালের ১২সেপ্টেম্বর সিলেটের একটি ক্লিনিকে সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর মাধ্যমে এক মহান সঙ্গীত সাধকের মৃত্যু হয়। তবে তাঁর রতি গানই তাঁকে বাচিয়ে রাখবে বাঙ্গালীর হৃদয়ে এমনটাই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

নির্বাচিত সংবাদ