১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কুড়িগ্রামে ভারত থেকে দৈনিক ৫ হাজার গবাদিপশু আসছে ॥ গরুর দাম কমছে

রাজু মোস্তাফিজ, কুড়িগ্রাম ॥ কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন আসছে বিপুল পরিমাণ গরু। ফলে জেলার কোরবানির হাটগুলোতে ভারতীয় গরু ও মহিষে সয়লাব। প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার গবাদিপশু ভারত সীমান্ত থেকে বাংলাদেশে আসছে। অবৈধ পথে আসা এসব গবাদিপশু ৫০০টাকার বিনিময়ে কাস্টম বিভাগের মাধ্যমে করিডর করে দেয়া হয় বৈধতা। হাজার হাজার গরু সীমান্ত দিয়ে আসলেও এর মূল্য পরিশোধ করা হয় হুন্ডির মাধ্যমে। গরু আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের সাথে বাংলাদেশের কোন চুক্তি না থাকায় টাকা লেনদেন হয় অবৈধ পন্থায়। ফলে গরু লালনপালন করে মার খাচ্ছে দেশের কৃষক ও খামারীরা। কারণ হঠাৎ করে ভারত থেকে ব্যাপক হারে গবাদিপশু আসতে থাকায় দাম কমেছে। ন্যায্য মূল্য না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছে কৃষক ও খামারীরা।

জানা যায়, গত বছরের তুলনায় এ বছর মাংসের দাম বেড়েছে কেজিতে ১০০টাকা। এ কারণে গরু, মহিষ ও ছাগলের দাম কিছুটা বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় গরু প্রতি দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ থেকে ১৫হাজার টাকা। কিন্তু হঠাৎ করে সীমান্ত দিয়ে অবাধে গরু আসায় দাম কমে যায়।

খামারী শামসুল ইসলাম, এরশাদ হোসেন, জিল্লুর রহমান জানান, কোরবানির ঈদে পশুর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। এ কারণে ঈদের ৯মাস আগে থেকে ছোট গরু বাণিজ্যিকভাবে পালা শুরু করা হয়। আশা একটাই ভাল দাম পাওয়ার। কিন্তু এখন সে আশায় গুড়েবালি। এখন খরচ উঠবে কিনা সন্দেহ।

ঈদের বাজারে ভারতীয় গরুর চেয়ে দেশী গরুর চাহিদা একটু বেশি। ভারতীয় গরুর চাহিদা ঢাকায় বেশি। কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় আনতে প্রতি ট্রাক গরুতে অতিরিক্ত খরচ হয় ২/৩ হাজার টাকা।

কুড়িগ্রাম বিজিবির পরিচালক লে. কর্নেল জাকির হোসেনের দফতরের প্রেস রিলিজে জানা যায়, অবৈধ পথে আসা এসব গবাদিপশু ৫০০টাকার বিনিময়ে কাস্টম বিভাগের মাধ্যমে করিডর করা হয়। চলতি মাসে রবিবার পর্যন্ত দই খাওয়ারচর, নারায়ণপুর, ময়দান, দিয়াডাংগা, শালঝোড়, পাখি উড়ারচর, ধলডাংগা, বাগভা-ার, ভাওয়ালকুড়ি, শিংঝাড়, মাদারগঞ্জ সীমান্ত এবং ধরলা ব্রিজ চেকপোস্টের মাধ্যমে ৮হাজার ৯৭৩টি গরু আটক করে করিডর করা হয়। এতে রাজস্ব আয় হয় ৪৪ লাখ ৮৬ হাজার ৫শ’ টাকা। এর আগের সপ্তাহে করিডর করা হয় প্রায় সাড়ে ৭ হাজার গরু। জুলাই মাসে করিডর হয় প্রায় ২২ হাজার গরু। ঈদকে সামনে রেখে গরু আসার পরিমাণ আরো বেড়েছে।

কুড়িগ্রাম কাস্টমস ইন্সপেক্টর আশরাফুল ইসলাম জানান, কুড়িগ্রাম জেলার ধরলা ব্রিজ পয়েন্ট ও রৌমারী পয়েন্ট দিয়ে চলতি মাসের বুধবার পর্যন্ত ৯দিনে ৩৫ হাজার ১৪৭টি ভারতীয় গবাদিপশু করিডর করা হয়। এতে সরকারের রাজস্ব আসে এক কোটি ৭৫লাখ ৭৩ হাজার ৫শ’ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি পশু আসে নাগেশ^রী, ফুলবাড়ী, ভুরুঙ্গামারী, সদর ও রৌমারী সীমান্ত দিয়ে। কয়েক শত কিশোর ও যুবক ভারত থেকে গরু পারাপার করে জীবিকা নির্বাহ করে। ভারত সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের মালিকের কাছে একটি গরু পার করে দিতে পারলে পারিশ্রমিক পাওয়া যায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। এরপর এই খাটালে জড়ো হওয়া গরুর একটি তালিকা তৈরি করে তা করিডরের জন্য পাঠানো হয়। করিডরে গিয়ে পশুপ্রতি ৫০০ টাকা করে শুল্ক দিতে হয়। আর এর পুরোটাই দেখভাল করে বিজিবি ও কাস্টমস। ঈদকে সামনে রেখে বেশি রোজগারের আশায় জীবন বাজি রেখে রাখালরা ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজে ঝুঁকে পড়ছেন।

‘করিডর ফাঁকি’

অভিযোগ রয়েছে, শুল্ক দেয়ার সময় কৌশলে গরুর সংখ্যা কম দেখানো হয়। তাছাড়া একটি শুল্ক রসিদ দিয়ে একাধিকবার পশু আনা -নেয়ার ঘটনাও ঘটে অহরহ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গরুপ্রতি তাদের ৫০০ টাকা রাজস্ব গুনতে হলেও নানা কারণে খরচ পড়ে অনেক বেশি। পাশাপাশি গরু পরিবহনের সময় ঘাটে ঘাটে গুনতে হয় বিভিন্ন অংকের চাঁদা। এছাড়া ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রিত একটি চক্র করিডর ফাঁকি দিয়ে নৌপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয় এসব ভারতীয় গবাদিপশু। এক্ষেতে দেশী গরু হিসাবে সংগ্রহ করা হয় ইউপি চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেট।

বেনাপোলের সীমান্ত

দিয়েও আসছে

আবুল হোসেন, বেনাপোল থেকে জানান, হঠাৎ করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কিছুটা নমনীয় হওয়ায় বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে আবারও আসছে গরু। ১ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেনাপোলের বিভিন্ন সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে আসে ৫ হাজার ৭শ’ ৮৪টি গরু-মহিষ। এদিকে, বেনাপোল সীমান্তে আরও একটি নতুন গরু খাটাল (বিট) উদ্বোধন হয়েছে। এ নিয়ে বেনাপোল সীমান্তে মোট ৫টি গরু খাটালে আসছে ভারতীয় গরু।

এছাড়াও কমপক্ষে ১০টি খাটালের আবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে। এগুলো অনুমোদন পেলে এবং ভারত থেকে গরু বেশি আসবে বলেও মনে করেন খাটালের সাথে সংশ্লিষ্টরা।

সীমান্তবর্তী রুদ্রপুরের গরু ব্যবসায়ী তবি মেম্বার জানায়, সীমান্ত দিয়ে অল্পসংখ্যক গরু আসছে। গরু আসা শুরু হলেও মূল্য কমছে না। গরু আসার পরিমাণ যদি বেশি হতো, তাহলে গরুর দাম অনেক কমে যেত। ভ্যাট আদায়কারীরা ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে অনেক গরু পাচার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইতোপূর্বে ভ্যাট ফাঁকি দেয়া অনেক গরু বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা আটক করেছে।

২৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আব্দুর রহিম জানান, গত বছরের চেয়ে এ বছর গরু ও মহিষ অনেক কম আসছে। এভাবে সীমান্ত পথ দিয়ে নিয়মিত গরু আসলে এলাকার মানুষ বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা থেকে সরে এসে গরুর ব্যবসায় নিয়োজিত হবে। সরকার উপার্জন করবে রাজস্ব।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া