১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টেলিগ্রাম থেকে ডিজিটাল ফোন

  • রেজা নওফল হায়দার

বাঙালীর জন্য টেলিগ্রামের সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হয়েছে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। এই টেলিগ্রামের মাধ্যমেই বিশ্ব দরবারে পৌঁছেছিল পাকিস্তানী বাহিনীর গণহত্যার খবর। আর্চার কেবাড তখন ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিক। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কনসাল জেনারেল নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে তৎকালীন চলমান নৃশংসতা বন্ধে ব্যর্থ হওয়ায় কঠোর ভাষায় একটি টেলিগ্রাম বার্তা পাঠানোর জন্য বিখ্যাত। তার সেই বিখ্যাত টেলিগ্রাম বার্তা ‘বাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত।

টেলিগ্রাম যুগ ভারতে শেষ হলেও বাংলাদেশে কিন্তু এখনই শেষ হচ্ছে না। ভারতের মতো বাংলাদেশে ঘোষণা দিয়ে টেলিগ্রামের যুগের বিলুপ্তি ঘটানোর কোন ইচ্ছেও নাকি নেই সরকারের। নামমাত্র চললেও বহু আবেগ মিশে আছে এই টেলিগ্রামের সঙ্গে। ঢাকা সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিসের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক বলেন, এক সময় আড়াই হাজারের মতো জনবল ছিল এই টেলিগ্রাফে। এখন আছে শ’তিনেকের মতো। কাজ করেন অন্য দফতরে। বাংলাদেশে প্রায় ৮শ’ টেলিগ্রাফ অফিস ছিল। আর এখন ৬৪ জেলার আছে ৪০টির মতো অফিস। তাও চলছে ধিক ধিক করে। কোথাও ঘরটি পরিত্যক্ত হয়েছে। আর কোন ঘরে জমেছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। তবে ওই ঘরগুলোতে এখন আর নেই টেলিগ্রাফের টরে টক্কা যন্ত্র। কোথাও আছে একটি ফ্যাক্স মেশিন, আবার কোথাও আছে একটি ল্যান্ড টেলিফোন।

এক কালের সেই টরে-টক্কার টেলিগ্রাম এখন আর নেই। টেলিগ্রাম এখন শুধুই স্মৃতি। ইন্টারনেট আর মোবাইল ফোনের এই রাজত্বে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ হয়ে উঠেছে খুবই সহজ একটি বিষয়। পোস্ট অফিসের চিঠি আর টেলিগ্রাম অফিসের জরুরী টেলিগ্রাম পরবর্তী প্রজন্মরা হয়ত চিনবেই না।

স্যামুয়েল মোর্স ১৮৪০ সালে বৈদ্যুতিক টেলিগ্রাফ যোগাযোগের জন্য প্রথম এ কোড তৈরি করেন। মোর্স কোড কোন উপাদানের ‘সংক্ষিপ্ত এবং দীর্ঘ’ এ দুটি অবশ্যকীয় উপাদান নিয়ে গঠিত। এক্ষেত্রে কোন উপাদানের ‘সংক্ষিপ্ত এবং দীর্ঘ’ এ দুটি রূপের এক ধরনের পর্যায়ক্রম যার মাধ্যমে কোন তথ্যের বর্ণ, সংখ্যা, যতিচিহ্ন ইত্যাদিকে উপস্থাপন করা যায়।

এতে এই ‘সংক্ষিপ্ত এবং দীর্ঘ’ উপাদান হিসেবে শব্দ, চিহ্ন, স্পন্দন, কোন যন্ত্রের সুইচ অন বা অফ এবং সাধারণভাবে ব্যবহৃত ‘ডট (ডিট)’ এবং ‘ড্যাশ (ডাহ্)’ ইত্যাদি ছাড়াও আরও অসংখ্য জিনিস ব্যবহার করা যেতে পারে। ‘ওয়ার্ড পার মিনিট’ হিসাবে মোর্স কোড হিসাব করা হয়ে থাকে। রেডিও যোগাযোগের জন্য প্রথম দিকে মোর্স কোড ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। এমন কি বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকেও টেলিগ্রাফ লাইন, সমুদ্রের নিচের কেবল এবং রেডিও সার্কিটে দ্রুতগতির যোগাযোগ মোর্স কোডের মাধ্যমে করা হতো।

পেশাগতভাবে পাইলট, এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারী, জাহাজের ক্যাপ্টেন, সামুদ্রিক স্টেশন চালনাকারীদের মোর্স কোডে খুবই ভাল দক্ষতা থাকতে হয়। আকাশে বিমান চালানোর সুবিধার্থে গঠিত বিভিন্ন বেইজ স্টেশন যেমনdirectional Radio Range Non-Directional Beaconহ আকাশে চলমান বিমানের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে জন্য প্রতিনিয়ত নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে মোর্স কোডের ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডেরাল কমিউনিকেশন কমিশন এখনও সামুদ্রিক যোগাযোগের জন্য মোর্স কোড ব্যবহার করে। মোর্স কোডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি নানা রকমভাবে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা যায়। শব্দ, চিহ্ন, পাল্স, রেডিও সিগনাল, রেডিও অন অফ, আয়নার আলো, লাইট অন অফ ইত্যাদি নানা উপায়ে মোর্স কোডের মাধ্যমে তথ্য প্রেরণ করা যায়। এ কারণেই S O S মেসেজ পাঠানোর জন্য মোর্স কোড সবচেয়ে উপযোগী।

বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল ১৮৪৭ সালের ৩ মার্চ স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আলেকজান্ডার মেলভিল বেল এবং মাতা এলিজা গ্রেস সাইমন্ডস বেল। ১৮৮৮ সালে বেল পরিবার আমেরিকায় অভিবাসী হয়। ২৩ বছর বয়সে তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে কানাডায় চলে যান। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল টেলিফোনের অন্যতম আবিষ্কারক হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। মূলত বেল টেলিফোন যন্ত্রের প্রথম পেটেন্ট করেছিলেন বটে কিন্তু তিনি প্রথম আবিষ্কারক নন। এই দাবি করতে পারেন এ্যান্তেনিও মিউচি। তিনি ১৮৫৭ সালে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক টেলিফোন আবিষ্কারের গবেষণায় সফলতা লাভ করেন। আর ১৮৬৫ সালে ইটালিয়ান আবিষ্কারক ইনোচেনযো মেনজাডি একটি স্পিকিং টেলিফোন আবিষ্কার করেন। হাঙ্গেরিয়ান আবিষ্কারক থিবেদার পুশকাস সুইচবোর্ড ও পার্টি লাইন আবিষ্কার করে টেলিফোনকে ব্যবহার উপযোগী করে তুলেন। তবে এরা বেল এর প্রধান প্রতিযোগী নন। বেল এর প্রধান প্রতিযোগী হলেন আমেরিকান উদ্ভাবক এলিশা গ্রে। ভাগ্য কখনো কখনো খুব নির্দয় হয় যেমন হয়েছিল এলিশা গ্রের ক্ষেত্রে। সৌভাগ্য কিংবা দুঃর্ভাগ্য, করুণ অথবা মজার যাই হোক ব্যাপার হলো এলিশা গ্রে এবং বেল একই দিন অর্থাৎ (১৮৭৬ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি) পেটেন্ট অফিসে যান টেলিফোন যন্ত্রের নিবন্ধন করার জন্য। তবে দুঃর্ভাগ্যজনকভাবে এলিশা গ্রের আইনজীবী বেল এর চেয়ে কয়েকঘণ্টা পরে যাওয়ায় ১৮৭৬ সালে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলকে টেলিফোনের প্রথম মার্কিন পেটেন্টের সম্মানে ভূষিত করা হয় এবং শেষপর্যন্ত বেলই টেলিফোন আবিষ্কারের কৃর্তত্ব লাভ করেন। আজ আমরা দিনে বহুবার উচ্চারণ করি হ্যালো শব্দটি। Hello শব্দটি প্রথম উচ্চারিত হয়ে ছিল আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল-এর মুখেই। হ্যালো তার বান্ধবীর নাম। পুরো নাম মার্গারেট হ্যালো। কথিত আছে ১৮৭৬ সালে টেলিফোন আবিষ্কারের পর তিনি তার বান্ধবী হ্যালো কে-ই প্রথম ফোনটি করেছিলেন। যদিও বিতর্ক আছে আদৌ তার কোনো বান্ধবী ছিল কী-না। কারণ মার্গারেট হেলো নামে কোন মহিলার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি যাকে তিনি সত্যিকার ভাল বাসতেন। অনেকে বলেন বধির স্ত্রী ম্যাবেল হাবার্ড বেল ব্যতীত তাঁর আর কোন ভালবাসার মানুষ ছিল না। মাবেল গার্ডিনার হুবার্ড ছিলেন গ্রাহাম বেলের বাগদত্তা। মাবেল ছিলেন শ্রবণ ও বাকশক্তিহীনতা। মাবেলের পিতা ধনী আইনজ্ঞ ছিলেন। তিনিই আলেকান্ডার গ্রাহাম বেলকে গবেষণা চালিয়ে যাবার খরচ পাতি যুগিয়ে ছিলেন। তবে টেলিফোন আবিষ্কার হবু শ্বশুরের উদ্দেশ্য ছিল না। যতদূর যানা যায় , হবু শ্বশুর চেয়েছিলেন হিয়ারিং এইড জাতীয় ডিভাইস আবিষ্কার করতে- যাতে তাঁর কন্যা শ্রবণশক্তি ফিরে পান। কারণ শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মাবেলের পক্ষে টেলিফোনের কোন শব্দই শোনার কথা না।

আধুনিক টেলিফোনের যাত্রা

বেতার টেলিফোন প্রযুক্তি, মোবাইল টেলিযোগাযোগের প্রথম বা প্রারম্ভিক পর্যায়কে বুঝিয়ে থাকে। এটা হলো এনালগ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা যা ১৯৮০ সালে প্রবর্তন করা হয় এবং ২জি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছিল। স্মার্টফোন-২২জি হলো ডিজিটাল টেলিযোগাযোগ পদ্ধতি। ১জি এবং ২জি মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো, যে রেডিও সঙ্কেত ১জি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয় তা এনালগ, যখন ২জি নেটওয়ার্কে ব্যবহার করা হয় তার ডিজিটালরূপ। যদিও উভয় সিস্টেমের জন্য রেডিও টাওয়ার (যা হ্যান্ডসেট শোনা যায়) সংযোগ করতে ডিজিটাল সঙ্কেত ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, এই ধরনের পদ্ধতি হলো এনএমটি (নর্ডিক মোবাইল টেলিফোন), নর্ডিক দেশসমূহে ব্যবহৃত, যেমন সুইজারল্যান্ড, হল্যান্ড, পূর্ব ইউরোপ এবং রাশিয়া। এছাড়া এএমপিএস (উন্নত মোবাইল ফোন পদ্ধতি) উত্তর আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় ব্যবহার করা হয়।