২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জমছে না সীমান্ত হাট

জমছে না সীমান্ত হাট
  • সীমিত পণ্য ও তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ী হওয়ায় বাজারের প্রসার ঘটছে না ;###;সব ধরনের পণ্য বিক্রির অনুমোদন প্রয়োজন;###;পরিচয়পত্র দেখিয়ে সবাইকে হাটে যাওয়ার সুযোগ দেয়া দরকার

রাজন ভট্টাচার্য ॥ অল্প সময়ের জন্য সপ্তাহে একদিন হাট বসে। চুক্তি অনুযায়ী সীমান্তের পাঁচ কিলোমিটার অভ্যন্তরের মানুষ পরিচয়পত্র দেখিয়ে কেনাবেচার সুযোগ পান। এক দেশের তালিকাভুক্ত মাত্র ২৫ ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রি করতে পারেন। একজন ১০০ ডলারের বেশি পণ্য কিনতে পারবেন না। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুনির্দিষ্ট কিছু পণ্যই শুধু বাজারে ওঠে, যা খুবই সহজলভ্য। দামের দিক থেকেও উভয় দেশে কম। তাছাড়া বাজারে ওঠা একেবারেই সাধারণ পণ্য এখন আর ক্রেতাকে আকৃষ্ট করে না। ফলে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ক্রেতা। হতাশ উভয় দেশের ব্যবসায়ীও। অনেক হাটে বাংলাদেশের দোকানগুলো থাকে ক্রেতাশূন্য। মূলত এসব কারণেই আগ্রহ হারাচ্ছে দেশের সীমান্ত হাটগুলো। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে হাট স্থাপনের লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। এদিকে কোন ঘোষণা ছাড়াই বন্যার কারণে প্রায় দেড় মাস কুড়িগ্রামের সীমান্ত হাট বন্ধ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাটের উদ্দেশ্য সফল করতে হলে সব ধরনের পণ্য বেচাকেনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বাড়াতে হবে তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ীর সংখ্যা। আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে বাজারের নাগরিক সুবিধা। জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে উভয় দেশের নাগরিকের হাটে প্রবেশের সুযোগ দেয়ার বিকল্প নেই। দামী পণ্যের ক্ষেত্রে অর্ধেক শুল্ক ধরারও পরামর্শ দিয়েছেন কেউ কেউ।

পণ্য কেনাবেচার মাধ্যমে সীমান্তে দু’দশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব, আচরণ ও জনগণের দৈনন্দিন জীবনমান উন্নয়নের স্বপ্ন নিয়ে হাটের যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু এর কোনটাই পূরণ হয়নি সীমান্তে বসবাসকারী ভারত বা বাংলাদেশীর জীবনে। উভয় দেশের মানুষের মনে কেবল হতাশাই জন্ম দিয়েছে সীমান্ত হাটকে কেন্দ্র করে। এখন অনেকেই এসব হাটে বেড়াতে আসেন। কেউ আসেন উভয় দেশের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য।

তবে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য কেনার সুযোগ পান ক্রেতা। বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে চারটি বর্ডার হাট চালু রয়েছে। এগুলো হলো কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জ, ফেনী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। দু’দেশের মানুষের ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়া সীমান্ত এলাকায় কেনাবেচার সুযোগ করে দিতে ২০১১ সালে সীমান্ত হাটের যাত্রা শুরু হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্ত হাটের উদ্যোগ ছিল দীর্ঘদিনের। ২০০৫ সালে বাংলাদেশকে সীমান্ত হাট স্থাপনের প্রথম প্রস্তাব দেয় ভারত। বাংলাদেশ তখন এ বিষয়ে ভারতকে একটি ধারণাপত্র দিতে অনুরোধ জানায়। জবাবে ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ধারণাপত্রে হাটের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যসহ বিস্তারিত জানানো হয় ২০০৭ সালে, যার বাস্তবায়ন শুরু আর তিন বছর পর।

আরও ১৪ হাট স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে ॥ বাংলাদেশ আট জেলায় আরও ১৪টি সীমান্ত হাট স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে। নতুন হাটের স্থানগুলো হলোÑ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ঘোলাশালা ইউনিয়নের জগমোহনপুর গ্রাম, কুষ্টিয়া দৌলতপুর রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মুন্সীগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর ইউনিয়নের বিষ্ণপুর গ্রামের দক্ষিণ অংশ, রাজশাহীর গোদাগাড়ী চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের সীমানা পিলার ৪১/৩ এবং ৪১/৪-এর মধ্যবর্তী স্থান, নওগাঁর সাপাহার শিরন্টি মৌজার খঞ্জন সীমান্ত, নওগাঁর ধামইরহাট কালুপাড়া মৌজার কালুপাড়া সীমান্ত, নওগাঁর পতœীতলা উপজেলার শীতলবাজার সীমান্ত, রাধানগর মৌজার সীমান্ত, শাওলি সীমান্ত, তালতলা পাড়া শাওলি সীমান্ত, ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট গাজীর ভিটা ইউনিয়নের উত্তর নলকুড়া সীমান্ত, ঝিনাইদহের মহেশপুর যাদবপুর ইউনিয়নের গোপালপুর মৌজা, নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার পাঁচগাঁও এবং নেত্রকোনার দুর্গাপুর বিজয়পুর সীমান্তে। এর আগে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ-ভারত মেঘালয় সীমান্তে ভারত সরকার সম্ভাব্য ২২টি সীমান্ত হাটের তালিকা দিয়েছিল।

তবে মন্ত্রণালয়ের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, পণ্য বিনিময় বা কেনাবেচার সুযোগ বাড়তে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে আরও ২১টি বর্ডার হাট চালুর চেষ্টা চলছে। সীমান্তের যেসব স্থানে দুই দেশের কোন হাটবাজার নেই, সেখানে গড়ে উঠবে এসব হাট। তবে বর্ডার হাটে বিক্রি উপযোগী পণ্য ও ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়ানোর দাবি সব মহল থেকেই।

যেসব পণ্য কেনাবেচা হয় ॥ চুক্তি অনুযায়ী একেবারেই সাধারণ কিছু পণ্য বেচাকেনা চলে বর্ডার হাটগুলোতে। এসব পণ্য দু’দেশের মানুষের কাছে এখন আর খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ উভয় দেশেই এসব পণ্য অনেকটা হাতের নাগালে। সীমান্ত হাটে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা চানাচুর, চিপস, আলু, তৈরি পোশাক, মাছ, শুঁটকি, মুরগি, ডিম, সাবান, শিম, সবজি, গামছা ও তোয়ালে, কাঠের টেবিল-চেয়ার, গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত লোহার তৈরি পণ্য বিক্রি করা যাবে। আর ভারতীয় ব্যবসায়ীরা ফল, সবজি, মসলা, মরিচ, হুলুদ, পান, সুপারি, আলু, মধু, বাঁশ ইত্যাদি বিক্রির সুযোগ পান।

কুড়িগ্রামে জমছে না সীমান্ত হাট ॥

কুড়িগ্রাম থেকে রাজু মোস্তাফিজ জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা বালিয়ামারীতে চালু হওয়া সীমান্ত হাট জমে উঠছে না। ক্রেতা বিক্রেতার সমাগম নেই এই হাটে। পণ্য কেনাবেচায় নানা বিধিনিষেধ আর পছন্দের পণ্য কেনাকেচা করতে না পেরে বিমুখ হয়ে পড়েছেন ক্রেতা ও বিক্রেতা।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে ২০১১ সালে মহাজোট সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল সীমান্ত হাট। ঘটা করে ২০১০ সালের ২৩ জুলাই কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলা সদর থেকে সাড়ে ৪ কিলোমিটার দূরে ভারতের কালাইরচর সীমান্তের বিপরীতে বাংলাদেশের বালিয়ামারী সীমান্তে সীমান্ত হাট উদ্বোধন করা হয়। সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী দু’দেশের ৪৭টি করে পণ্য বেচাকেনার কথা। কিন্তু নানা জটিলতায় বাংলাদেশী পণ্য কিনতে না পেরে হতাশ ভারতীয় ক্রেতাও। হাতেগোনা কয়েকটি পণ্য নিয়ে প্রতি বুধবার বসে সীমান্ত হাট। এর মধ্যে বাংলাদেশী পণ্য নেই বললেই চলে। হাটে পণ্য বেচতে না পেরে তাই হতাশ বাংলাদেশী বিক্রেতা। আবার কোন ঘোষণা ছাড়াই বন্যার কারণে প্রায় দেড় মাস থেকে এই সীমান্ত হাট বন্ধ রয়েছে। হাটে পানি থৈথৈ করছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, বিক্রিযোগ্য পণ্যের তালিকা এমন হওয়া উচিত, যাতে শুধু রাজীবপুরে উৎপাদিত নয়, বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করা যায়। কারণ ভারতীয়রা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও প্লাস্টিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য কিনতে ব্যাপক আগ্রহ দেখালেও এই পণ্য ভারতে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি মিলছে না। বালিয়াডাঙ্গী বিওপি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার খোরশেদ আলম জানান, বন্যার কারণে দু’সপ্তাহের বেশি সময় পর্যন্ত হাট বন্ধ রয়েছে। রাজীবপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নুরে শাহী ফুল জানান, পণ্যের তালিকা ও স্থানীয় উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের অসম এবং মেঘালয়ে সন্ত্রাসীদের কারণে জমছে না সীমান্ত হাট। তিনি আরও বলেন, তালিকা সংশোধন করে আরও বেশি বাংলাদেশী পণ্য বিক্রির সুযোগ দিলে হাট জমজমাট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় কয়েক বিশেষজ্ঞ জানান, নতুন করে সার্ভে করে পণ্য তালিকা তৈরি, ভারতীয় ক্রেতার সংখ্যা বাড়ানো, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতিসহ কয়েকটি পদক্ষেপ নিলে দু’দেশেরই ক্রেতা-বিক্রেতা লাভবান হবে। আরও জমে উঠবে দু’দেশের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকা আলোচিত সীমান্ত হাট।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চাহিদার পণ্য সরবরাহ কম ॥ ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে রিয়াজউদ্দিন জামি জানান, দু’দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের সেতু বন্ধন গড়ে তুলতেই সীমান্ত হাটের যাত্রা শুরু হয়েছি। প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়-বিক্রির পাশাপাশি এ হাট দু’দেশের জনগণের মধ্যে সৃষ্টি করেছে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। সপ্তাহের একটি দিন এ হাট নিয়ে সীমান্তবাসীর কৌতূহল বিরাজ করে। শুধুই কি সীমান্তবাসী ? ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার ২০৩৯ নং পিলার সংলগ্ন কমলাসাগর দীঘির উত্তরপারে তারাপুর এলাকায় এ হাট বসে। প্রতি বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ২০১৪ সালের ২১ মে এ হাটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। চলতি বছরের ১১ জুন সীমান্ত হাটের কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশের ৬৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ ও ভারতের ৬৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ ভূমিতে বাংলাদেশী ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় এ হাটের স্থাপনা নির্মাণ করা হয়।

বাংলাদেশের ১৫ ও ভারতের ১৬ টি পণ্য এখানে বেচাকেনা হয়। বাংলাদেশ থেকে হাটে বিক্রির জন্য অনুমোদিত পণ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে বিস্কুট, লুঙ্গি, ফলমূল, স্থানীয় কুটিরশিল্পে উৎপাদিত সামগ্রী। ভারতের বিক্রির তালিকায় রয়েছে শাক-সবজি, ফলমূল, মসলাজাতীয় দ্রব্য, বনজ ও কুটির শিল্পে উৎপাদিত দ্রব্য, কৃষি উপকরণ, চা, এলুমিনিয়াম ইত্যাদি সামগ্রী । দু’দেশের অনুমোদিত ৫০ ব্যবসায়ী নির্ধারিত পণ্যদ্রব্য বিক্রি করতে পারছেন। যৌথ মালিকানায় সীমান্ত হাটের বেশ গুরুত্ব রয়েছে সীমান্ত অঞ্চলে। সীমান্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিকভাবে সীমান্ত হাট পরিচালনা করতে পারলে দু’দেশই লাভবান হবে। পাশাপাশি সীমান্ত অপরাধ কমে আসবে। তবে এতে সময় লাগবে। রাতারাতি কোন কিছুই সম্ভব নয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, এ হাটের দিন অন্তত ৫/৬শ’ মানুষ আসা-যাওয়া করে। কর্মকর্তারা বলছেন, এ হাট চালুর ফলে সীমান্ত এলাকার অপরাধ ক্রমশ কমে আসবে। তবে এ হাটকে ঘিরে কঠোর নজরদারি রয়েছে সীমান্তরক্ষীদের। ১২ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল নজরুল ইসলাম বলেন, এ হাটের আড়ালে যাতে মাদক, অস্ত্র পাচারসহ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কোন তৎপরতা না থাকে সেজন্য হাট চলাকালে সর্বক্ষণিক বিশেষ নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা বলছেন, যে সকল পণ্য তালিকা হাটে দেয়া হয়েছে তা বাড়ানো উচিত। এ হাটে বাংলাদেশের শাক-সবজি, ইলিশ মাছ, শুঁটকি, কুটির শিল্পের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে তাজা মাছের চাহিদা থাকায় জেলা প্রশাসনের পক্ষে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে তাজা মাছ বিক্রির নির্দেশনা চাওয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমা বেগম বলেন, এ হাট ভালই চলছে। বর্তমানে দু’দেশের চব্বিশটি করে স্টল দেয়া হয়েছে। সীমান্তের সূত্র জানায়, বাংলাদেশী কসবা অঞ্চল ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় তারা বেশি মাত্রায় ভারতীয় পণ্য ক্রয় করে। অন্যদিকে ত্রিপুরার কমলাসাগর ও আশপাশ এলাকায় ঘনবসতি কম হওয়ায় এ হাটে তাদের ক্রয় তুলনামূলকভাবে কম। এ হাটের মাধ্যমে দু’দেশের বাসিন্দারা কেনাকাটার পাশাপাশি স্বজনের সঙ্গে সপ্তাহে দেখা সাক্ষাতের কাজটি শেষ করতে পারেন। গত ১৩ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন সরেজমিনে সীমান্ত হাট পরিদর্শন করেছেন। এ সংক্রান্ত এক বৈঠকে হাটের উন্নয়নে দু’দেশের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন।

ফেনীর বর্ডার হাটে সৌখিন মানুষের ভিড় ॥ ফেনী থেকে ওছমান হারুন মাহমুদ জানান, সৌখিন মানুষের হাটে পরিণত হয়েছে ফেনীর বর্ডার হাট। এখানে বেশিরভাগ মানুষ সখের বশে বেড়াতে আসেন। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে যান অনেকে। দেশের তৃতীয় বর্ডার হাট ফেনীর ছাগলনাইয়া থানার রাধানগর ইউনিয়নের মোকামিয়া গ্রামের ভারত সীমান্তের শ্রীনগর এলাকায়। ভারত সরকারের ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে এ হাটে ৫০ টি দোকান শেড স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ২৫ টি বাংলাদেশীদের ও ২৫ টি ভারতীয়দের মধ্যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ হাট চলছে। এ হাটে প্রতিটি ক্রেতা সর্বোচ্চ ১০০ ডলারের পণ্য ক্রয় করতে পারেন। শুল্কমুক্ত এ হাটে দু’দেশের স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করার কথা ছিল। চলতি বছর ১৩ জানুয়ারি এ হাটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

প্রতি মঙ্গলবার সকাল ১১ টা থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত বর্ডার হাটে বেচাকেনা চলে। সরজমিনে দেখা গেছে - বাস্তবে এ হাটে ভারতীয় অংশে ভারতের ব্যান্ড আইটেমের দুধ, চকোলেট, প্রসাধনী, হাঁড়ি, পাতিল, হরলিকস, সাবান, শ্যাম্পু, থ্রি পিস, চা পাতা, খাবার সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হচ্ছে। অধিকাংশ খাবারের পণ্যের গায়ে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ নেই। চকোলেটসহ বিভিন্ন পণ্য প্যাকেট হিসেবে পাইকারি দোকানের মতো বিক্রি হচ্ছে। খুচরা ২/১ টাও বিক্রি হয় না। এতে সাধারণত স্বল্প আয়ের ক্রেতারা বঞ্চিত হচ্ছেন। বাংলাদেশ অংশের প্রবেশ/বাহির গেটে ব্যান্ড আইটেম পণ্য হরলিকসসহ ব্যান্ড আইটেম আনা যাবে না লেখা নোটিস লাগানো থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ নেই।

হাটে স্থানীয় ক্রেতার মধ্যে উঠতি বয়সী কিছু যুবক ছাড়া অন্য ক্রেতা খুঁজে প্ওায়া ভার। শতকরা ৯৫ ক্রেতা ফেনী থেকে এসে ভারতীয় পণ্য কিনে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে। গেটে বিজিবি লোক বুঝে ব্যান্ড আইটেম নিয়ে মৌখিক বাদ সাধল্ওে তারা আবার বের হয়ে যেতে দেখা গেছে। ভারতীয় অংশের স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য হাটে দেখা যায়নি। অপরদিকে বাংলাদেশ অংশে সামুদ্রিক মাছ ও ইলিশ, কই মাছ, শুঁটকি, ফেনীর বিভিন্ন বেকারির বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে। ভারতীয় অংশে বাংলাদেশী ক্রেতার ভিড়ে দোকানের পণ্য দেখা দুষ্কর হল্ওে বাংলাদেশ অংশের দোকানগুলো ফাঁকা ।

এছাড়া ভারতীয় বিএসএফ ভারতীয় ক্রেতাদের দেশে ফেরার সময় লাইন দিয়ে পণ্য চেক করে বের করতে দেখা গেছে। এ অবস্থায় ভারতীয় নাগরিকরা বাংলাদেশী পণ্য তেমন ক্রয় করছে না। মানি এক্সচেঞ্জ সূত্র জানায়, প্রতি হাট বারে বাংলাদেশী প্রায় ১০/১২ লাখ টাকা লেনদেন হয়। অপর একটি সূত্র জানায়, ভারতীয় দোকানিরা সন্ধ্যায় তাদের দোকান বন্ধ করে যাওয়ার সময় অবিক্রীত পণ্য কার্টুনসহ বাংলাদেশী দোকানিদের মাধ্যমে বা নির্ধারিত লোকের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে। এসব মালের মূল্য ভিন্নভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে। যা টাকার অংকে প্রায় ২০/২৫ লাখ। বাংলাদেশের গেটে থাকা বিজিবি জানায়- ক্রেতার কাছ থেকে মাল রেখে দেয়া হাটের ভারতীয় দোকানিদের অভিযোগ সত্য নয়। ক্রেতা পণ্য ক্রয় করে য্ওায়ার সময় কোন হয়রানি করা হয় না।

অনুসন্ধানে জানা যায়- বর্ডারহাটে মূলত সৌখিন ও ফেনী শহরের ক্রেতা, এছাড়া দেশের বিভিন্নস্থান থেকে ফেনীতে বেড়াতে আসা লোকজন শখ করে বর্ডার হাটে বাজার করতে আসেন। তারা তাদের পছন্দনীয় ভারতীয় প্রসাধনীসহ ব্যান্ড আইটেমের পণ্য ক্রয় করে থাকেন। বর্ডার হাটের কারণে দু’দেশের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ তাদের নিকট আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাচ্ছেন। বাংলাদেশের নাগরিকরা ছাগলনাইয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে পাস নিয়ে অথবা হাটের সামনে থেকে ২০ টাকা করে টিকেট কিনে হাটে প্রবেশ করতে পারছেন। এতে সীমান্তবর্তী এলাকার দু’দেশের মানুষের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় হচ্ছে। তবে হাটে আগত-ক্রেতাদের বিশ্রামের কোন ব্যবস্থা নেই।

সুনামগঞ্জে জমেছে সীমান্ত হাট ॥ সুনামগঞ্জ থেকে এমরানুল হক চৌধুরী জানান, সদর উপজেলার জাহাঙ্গীনগর ইউনিয়নের ডলুরা শহীদ মিনার সংলগ্ন এলাকায় ২০১২ সালের ১ মে সীমান্ত হাট চালু হয়। স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাপনার কমিটি ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতিতে বাজারটি চালু করা হয়। এই হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম আছে। বাংলাদেশ-ভারত জিরো পয়েন্টে এ সীমান্ত হাটটি যতদিন যাচ্ছে ততই জমে উঠছে। প্রতি মঙ্গলবার বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকার লোকজনের পণ্য কেনাবেচায় সরব হয়ে ওঠে এ হাট। সীমান্ত হাটের এ সফলতায় জেলার তাহিরপুর উপজেলার সায়েদাবাদ ও দোয়ারাবাজার উপজেলার বাগানবাড়ি এলাকায় আরও দুটি হাট চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। যে কোন দিন এ নতুন দুটি হাট উদ্বোধন করা হবে বলে বিজিবি সূত্র জানায়।

জানা যায়, ডলুরা সীমান্ত হাটে দুই দেশের ২৫টি করে ৫০টি দোকান রয়েছে। সীমান্তবর্তী পাঁচ কিলোমিটার অভ্যন্তরের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ এখানে কেনাকাটার সুযোগ পান। জেলায় উৎপাদিত হয় এমন স্থানীয় পণ্য ছাড়াও জুস, চিপসসহ সব ধরনের কৃষিপণ্য রফতানি করা হয়ে থাকে। অপরদিকে ভারত থেকে ফল, শাক-সবজি, কৃষি যন্ত্রপাতি, পটেটো, মসলা জাতীয় পণ্য আমদানি করা যাবে। এপ্রিল মাস থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রতি মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এবং নবেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সকাল সাড়ে নয়টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বেচাকেনা চলে। দু’দেশের মুদ্রা টাকা ও রুপীবিনিময়ের জন্য বাংলাদেশর পক্ষে জনতা ব্যাংক ও ভারতের ইউ.সি.বি ব্যাংক কাজ করে। সীমান্ত হাটে থাকছে একটি ডাক্তার রুম ও বাজার পরিচালনা কমিটির রুম। নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত বাংলাদেশী বিজিবি ও ভারতীয় বিএসএফ ।

তবে অভিযোগ রয়েছে,সীমান্ত হাট থেকে ভারতীয় চকোলেট, হরলিকস, কোকারিজ, প্রশাধনী ও মসলাপণ্য, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও আশপাশের জেলার অভিজাত বিপণিতে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। এ ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বরং এসব দোকান থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিচ্ছে। এমনকি শহরের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে এসব পণ্য অবাধে বিক্রি করতে দেখা যায়। ফলে সীমান্তবর্তী এলাকার লোকজন তাদের চাহিদামতো ভারতীয় পণ্য পাচ্ছেন না। পেলেও অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে। তাদের দাবি এদিকে প্রশাসনে নজরদারি বাড়ানো দরকার।

স্থানীয় লোকজন জানান, তাদের উৎপাদিত সবজি দ্বিগুণ দামে সীমান্ত হাটে বিক্রি করতে পারছে। তাই লাভ হচ্ছে বেশি। এ হাট চালুর পর সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানও অনেক কমেছে। তাই এলাকাবাসী সপ্তাহে দু’দিন হাটটি চালু রাখার দাবি জানিয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের পুরান গুদিগাঁও গ্রামের আব্দুল হক জানান, এ হাট চালু হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের খুব ভাল হয়েছে। ভারত পাহাড়ী এলাকা হওয়ায় সবজির উৎপাদন তেমন একটা হয় না। তাই আমাদের দেশের সবজির চাহিদা ভারতীয় লোকজনের কাছে বেশি।

সীমান্ত হাটের ব্যবসায়ী সাদেক আলী জানান, হাট থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য বাজার মূল্যের চেয়ে কম দামে ক্রয় করছে মানুষ। সীমান্ত হাটটি সপ্তাহে দুদিন চালু রাখলে স্থানীয় লোকজন আরও উপকৃত হবে বলে দাবি তার। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সীমান্ত হাটটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনরা জন্য রয়েছে দুদেশের দুটি কমিটি। ওই দুই কমিটি নিরাপত্তাসহ হাট পরিচালনার যাবতীয় দিক দেখভাল করেন। নিরাপত্তার স্বার্থে ক্রেতার জন্য লাল কার্ড, বিক্রেতার জন্য আকাশি কার্ড, বিক্রেতার সহকারীর জন্য বাদামি কার্ড ও দর্শনার্থীর জন্য সাদা কার্ড রয়েছে। প্রতি হাটেই একজন সহকারী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম বর্ডার হাট মনিটরিং করে।

বর্ডার হাট পরিচালনা কমিটির প্রধান ও সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আবদুল হাই আল মাহমুদ জানান, বর্ডার হাটের সার্বিক বিষয় নিয়ে আমরা প্রতিমাসে একটি মিটিং করি। সীমান্ত হাটটি জমে ওঠায় ভারতের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে দোকান বৃদ্ধির জন্য। আট বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ গোলাম মহিউদ্দিন খন্দকার বলেন, মূলত নিরাপত্তার বিষয়টি বিজিবি দেখাশোনা করে। বর্ডার হাটে যাতে কেউ অবৈধ পণ্য বিক্রি করতে না পারে সেদিকে বিজিবি বিশেষ নজর রাখে।