১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মসজিদুল হারামে দুর্ঘটনার জন্য নির্মাণ প্রতিষ্ঠান দায়ী

  • নিহত বেড়ে ১০৭

‍জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ সৌদি আরবের মক্কায় মসজিদুল হারামে ক্রেন ভেঙ্গে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১০৭ জনে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবারের এ ঘটনায় ৪০ বাংলাদেশীসহ আহত হয়েছেন ২৩৮ জন। এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আরব নেতাদের পাশাপাশি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিলিপ হ্যামন্ড, ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিশ্ব নেতারা শোক প্রকাশ করেছেন। খবর বিবিসি, আলজাজিরা, সৌদি গেজেট, এএফপি ও দ্য খালিজ টাইমসের। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই হজ পালনের জন্য সৌদি আরব গিয়েছিলেন। ঘটনা তদন্তে দুটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন মক্কার গবর্নর প্রিন্স খালিদ আল ফয়সাল। এছাড়া আহতদের চিকিৎসার বন্দোবস্তেরও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। নিহত সবার পরিচয়

পাওয়া না গেলেও এদের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান ও ইরানের নাগরিক রয়েছেন। বাকি আহতদের মধ্যে এসব দেশের নাগরিক ছাড়াও বাংলাদেশ, মিসর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার বহু নাগরিক রয়েছেন। শুক্রবারের এই দুর্ঘটনার মধ্যেও পুরোদমে হজ পালনের কাজ এগিয়ে চলছে। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর থেকেই হজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শনিবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সৌদি সরকারের এক কর্মকর্তা জানান, শুক্রবারের দুর্ঘটনার পর আমাদের হজকার্যক্রম পুরোদমে এগিয়ে চলছে। শুক্রবারের ঘটনা এ বছর হজ অনুষ্ঠানে কোন সমস্যা সৃষ্টি করবে না।

শুক্রবারের এ ঘটনার জন্য প্রচ- ঝড়-বৃষ্টিকে দায়ী করছে সৌদি আরব সরকার। তবে সমালোচকরা এ ঘটনার জন্য নির্মাণ প্রতিষ্ঠান বিন লাদেন গ্রুপের ‘অসতর্কতা’ এবং উদাসীনতা দায়ী বলে জানিয়েছে। সৌদি সিভিল ডিফেন্সের প্রধান জেনারেল সুলাইমান আল-আমর আল-ইখবারিয়া গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাস্থল পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে।

মসজিদুল হারামের মুখপাত্র আহমেদ বিন মোহাম্মদ আল মানসুরি বলেছেন, প্রচ- ঝড়োবাতাস আর বৃষ্টিতে শুক্রবার বিকেল পাঁচটা ১০ মিটিতে ক্রেনটি ভেঙ্গে পড়ে।

এ ঘটনায় নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের ‘অসতর্কতাকে’ দায়ী করে মক্কাভিত্তিক ইসলামিক হেরিটেজ রিসার্স ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইরফান আল আলাভী এ ঘটনাকে বোমা বিস্ফোরণে ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, কর্তৃপক্ষ অসতর্ক উপায়ে এ ধরনের ভারি ক্রেন ছাদের ওপর তুলেছিল। তারা এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তার কথা ভাবেনি। ইরফান আল আলাভী মসজিদুল হারামের সম্প্রসারণ কাজের একজন কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। তার মতে, এ কাজে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর অনেক স্মৃতি মুছে যাবে।

সৌদি রেড ক্রিসেন্টের হজ ও ওমরাহ বিষয়ক প্রধান খালেদ আল-হাবশি জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাস্থল থেকে আহতদের হাসপাতালে নিতে ৬৮টি উদ্ধারকারী দল কাজ করে। যারা অল্প আহত হয়েছেন, দুর্ঘটনাস্থলেই তাদের চিকিৎসা দেয়া হয়। শুক্রবার রাতে সৌদি আরবসহ দেশটিতে অবস্থানরত বহু বিদেশী নাগরিক আহতদের চিকিৎসায় রক্ত দিতে হাসপাতালের সামনে লাইন দেন। দুর্ঘটনার পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাদের উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছে যায়। প্রথমেই ৪৯ জনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

তবে এ ঘটনায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মসজিদটির বর্তমান সম্প্রসারণ কাজের দায়িত্ব পাওয়া বিন লাদেন গ্রুপের কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। চলতি হজের আগেই এই সংস্কার কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখনও পাঁচ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে।

ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, মাগরিবের আগে প্রচ- বালু ঝড় হয়। এ সময় ক্রেনটি ভেঙ্গে পড়ে। আমাদের চোখের সামনে বহু মানুষকে আহত-নিহত হতে দেখেছি। বছরে ৩০ থেকে ৪০ লাখ মুসলমান হজ পালন করতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই মসজিদে সমবেত হন। এবার প্রায় এক লাখ বাংলাদেশীও হজে অংশ নিচ্ছেন।

আব্দুল আজিজ নাকুর নামে মসজিদটির সম্প্রসারণ প্রকল্পে নিয়োজিত এক কর্মকর্তা বলেন, আমি দেখলাম প্রচ- ঝড়ের কারণে সম্প্রসারণ কাজে ব্যবহৃত বিশাল আকৃতির ক্রেনটি ভেঙ্গে পড়ছে। আর সেখানে যদি আল-তাওয়াফ ব্রিজটি না থাকত, তবে হতাহতের সংখ্যা অনেক বাড়ত বলে মত দেন তিনি। আল এ্যারাবিয়া টেলিভিশনের এক খবরে বলা হয়, প্রবল ঝড়ের কারণেই ক্রেন উল্টে পড়লে হতাহতের এ ঘটনা ঘটে। গত কয়েক দিন ধরে সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলে শক্তিশালী বালু ঝড় বইছে। ঝড়ে গাছ উপড়ে পড়ায় ক্রেনটি স্থানচ্যুত হয়ে আছড়ে পড়ে বলে উল্লেখ করা হয়। টুইটারে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, হজের ইহরাম পরিহিত রক্তাক্ত বহু মানুষের দেহ কংক্রিটের স্তূপের মধ্যে পড়ে আছে। ছাদ ভেঙ্গে নেমে আসা লাল রঙের একটি বিশাল ক্রেনের অংশবিশেষও এসব ছবিতে দেখা যাচ্ছে।

একসঙ্গে ২২ লাখ হাজীর স্থান সঙ্কুলানের জন্য গতবছর মসজিদের এলাকা ৪ লাখ বর্গমিটার সম্প্রসারণের কাজ শুরু করে সৌদি সরকার। এই নির্মাণ কাজের জন্য ভারি কয়েকটি ক্রেন সেখানে রাখা ছিল। এক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, পৌনে ৬টার দিকে একটি ক্রেন মসজিদের পূর্ব অংশের চতুর্থ তলার ওপর আছড়ে পড়ে। হজে আসা মানুষ মাগরিবের নামাজের আগে জড়ো হওয়ায় সে সময় ওই অংশটি ছিল বহু মানুষে পূর্ণ।

গত ৪০ বছরে সৌদি আরবে হজ করতে গিয়ে বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও রোগে অন্তত তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৬ সালে কাবা শরিফের কাছে একটি বহুতল হোটেল ভবন ধসে ৭৬ জন নিহত হন। নিকট অতীতে হজ মৌসুমে সবচেয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে ১৯৯০ সালের ২ জুলাই। ওই ঘটনায় একটি সুড়ঙ্গে পদদলিত হয়ে ১ হাজার ৪২৬ জন মারা যান।

প্রধানমন্ত্রীর শোক ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মক্কায় মসজিদ আল হারামে শুক্রবার ক্রেন উল্টে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

শনিবার এক শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, পবিত্র মসজিদের ভেতরে ক্রেন ভেঙ্গে পড়ার খবর শুনে তিনি এবং বাংলাদেশের জনগণ শোকাহত হয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এ কথা জানান। খবর বাসস’র

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সৌদি সরকার এবং দেশের জনগণ এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠবে এবং চলতি মাসের শেষ দিকে এ বছরের পবিত্র হজ অনুষ্ঠান আয়োজনে হজযাত্রীদের জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারবে।

শেখ হাসিনা নিহতদের রূহের মাগফিরাত এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন।

রওশন এরশাদের শোক ॥ মক্কা শরীফের প্রধান মসজিদে (মসজিদ আল-হারাম) নির্মাণ কাজের ক্রেন ভেঙ্গে শতাধিক মুসল্লির মৃত্যুতে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ এমপি গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

শনিবার এক শোক বার্তায় বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, হজের জন্য বিশ্বের লাখ লাখ মুসলমান এখন সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। মক্কার অন্যতম প্রধান এ মসজিদে গতকাল শতাধিক মুসল্লির মৃত্যুতে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণও মর্মাহত।

বিরোধীদলীয় নেতা মরহুমদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা ও শোক-সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং আহতদের সুচিকিৎসার মাধ্যমে দ্রুত আরোগ্য লাভের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া কামনা করেন।