১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এক যুগের স্মৃতি-বিস্মৃতি আবেগঘন প্রত্যাবর্তন অভিভূত নতুন প্রজন্ম

  • দেওয়ান গাজীর কিস্ সা

মোরসালিন মিজান

বয়স হয়েছে। প্রবীণের চেহারা। শরীরও সব সময় ভাল যায় না। অথচ ঠিকই মঞ্চে উঠে গেলেন আলী যাকের, আবুল হায়াত ও সারা যাকের। নবীনদের সঙ্গে নিয়ে দিব্যি অভিনয় করে গেলেন। বিশাল মিলনায়তনে গাদাগাদি করে বসা দর্শক। অবাক হয়ে তাদের দেখলেন শুধু। এ বয়সে এমন অসাধারণ অভিনয়! কী করে সম্ভব! পুরনোরা হিসেব কষলেন। নতুনদের চোখ ছানাবড়া। বহুকাল ধরে তারা কেবল শুনছিলেন নাটকটির কথা। শুক্রবার দেখলেন। প্রথমবারের মতো। সে কী উত্তেজনা! নাটকের আগে পরে কয়েক দফা ভিজে উঠল চোখ। সব মিলিয়ে আবেগঘন প্রত্যাবর্তন। হ্যাঁ, ঢাকার মঞ্চকে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ করা নাটকের নামÑ দেওয়ান গাজীর কিস্সা। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় প্রযোজনা শুক্রবার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হয়। গঙ্গা-যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসবের ১১তম দিবসটি সাক্ষী হয় নতুন ইতিহাসের।

একটু পেছন ফিরে তাকাতেই হয়। সেই কবেকার কথা, ১৯৭৭ সালে শুরু! ওই বছর প্রথম মঞ্চস্থ হয় ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’। হ্যাঁ, খুব অল্প সময়ের মধ্যে দর্শকনন্দিত হয়। ঢাকার মঞ্চকে দারুণভাবে আলোকিত করে। বিপুল চাহিদার কারণে খুব দ্রতই হয় শততম মঞ্চায়ন। ঢাকার মঞ্চের একেবারে প্রথমদিকে যেসব নাটকের শততম মঞ্চায়ন হয়, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’ সেগুলোর অন্যতম। পরবর্তিতে সাড়ে ৪০০ বারের মতো মঞ্চস্থ হয়। যৌবনে মঞ্চের প্রতি ভালবাসা প্রকাশের শ্রেষ্ঠ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নাটকটিকে গ্রহণ করেন অধিকাংশ অভিনেতা অভিনেত্রী। আলী যাকের, আবুল হায়ত, সারা যাকেরের মতো শিল্পীদের অভিনয় মঞ্চ নাটকের দর্শক সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বহুকালের পুরনো নাটকের সঙ্গে বাংলা নাটকের এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাসটিও বেশ জড়িয়ে আছে। সে ইতিহাস আজকের প্রজন্মের দর্শক শুনেছেন শুধু। এখান ওখান থেকে খুঁজে নিয়ে পড়েছেন। কিন্তু নাটকটি দেখার সুযোগ ছিল না। কারণ এক যুগেরও বেশি সময় মঞ্চের বাইরেই ছিল ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’। আর তার পর নতুন প্রজন্মের দর্শকের সামনে আসা। ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার সুযোগ। সঙ্গতকারণে অনেক দিন আগেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল টিকেট। বহু দর্শককে মিলনায়তনের বাইরে অপেক্ষমাণ রেখেই শুরু করতে

হয় ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’। ঠিক সাতটায় আলো ফুটে মঞ্চে। ততধিক আলো নিয়ে দৃশ্যমান হন আলী যাকের। তখন বয়স ছিল ৩০ কিংবা সামান্য বেশি। এবার একই অভিনেতার ষাট কিংবা তারও বেশি বয়স। জাত অভিনেতা বলে কথা, নিখুঁত শুরুটা নিশ্চিত করলেন। নাটকের নাম চরিত্রে চমৎকার প্রকাশিত হলেন। অচিরেই দেখা মিলল আরেক ষাটোর্ধ আবুল হায়াতের। যৌবনে মাখন চরিত্রটিতে রূপদান করেছিলেন। এবারও তা-ই। তবে আশ্চর্য সাবলীল। গল্প সামান্য এগোলে মঞ্চে পা রাখেন সারা যাকের। তার অভিনয়ও অপলক চোখে দেখতে হয়। বলা চলে, মঞ্চের অলৌকিক শক্তির একটি বিরল প্রদর্শনী দেখা হয় এদিন। নবীন অভিনেতা অভিনেত্রীর সঙ্গে পুরনোদের যে মিথষ্ক্রিয়া, দেখে সত্যি অবাক হতে হয়েছে।

মূল নাটকটি বের্টল্ড ব্রেখ্টের। রূপান্তর করেন আরেক তারকা শিল্পী আসাদুজ্জামান নূর। নির্দেশনাও তার। সরল ভাষায় অনেক কঠিনেরে নাটকে বাঁধার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। নাটকের প্রেক্ষাপট গড়ে ওঠে সামন্তবাদী সমাজের বাস্তবতায়। দেওয়ান গাজী সামন্তবাদী প্রভুর রূপে উপস্থিত হন। মাখন নির্যাতিত শ্রেণীর প্রতিনিধি। চাকরের ভূমিকায়। বঞ্চিত নারীর প্রতিরূপ হয়ে আসেন সারা যাকের। তার অভিনয় অনেক দিন চোখে লেগে থাকবে, নিশ্চিত করে বলা যায়। বাকি চরিত্রগুলোও পারস্পরিক দ্বন্দ্বমুখর। তবে কাহিনী এগিয়ে যায় সরল পথে। গল্পচ্ছলে এগিয়ে যায় গল্প। রসবোধ দারুণভাবে দর্শকদের কাছে টানে। একই সঙ্গে ভাবায়। দর্শককেও নাটকের চরিত্র করে তুলে। এ প্রজন্মের অভিনয় শিল্পীদেরও প্রশংসা করতে হয়। অনবদ্য অভিনয় করেছেন রুনা খান। মোস্তাফিজ শাহীন, ফারুক আহমেদ, লাবণ্য, শামীমা নাজনীন, ঝুমুু মজুমদার, অরণ্য, জিয়াউল হাসান কিসলু, গোলাম সারোয়ার, বেলায়েত হোসেন মিরু, পিন্টু, শাওন প্রমুখের অভিনয়ও নাটকটিকে উপভোগ্য করেছে। সব মিলিয়ে অনন্য সাধারণ ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’। নাটক শেষ হতেই মিলনায়তনভর্তি দর্শক করতালির মধ্য দিয়ে সে কথা জানিয়ে দেন। তবে সবাই যখন মন্ত্রমুগ্ধ তখন আলী যাকেরকে বলতে শোনা যায়, আরও কিছু করার ছিল। অনেক দিন পর মঞ্চে উঠায় কিছু বিষয় অনুমান করা যায়নি। এমন বিনয়ে করতালি দ্বিগুণ হয়। গাঢ় হয় ভালবাসা। আবুল হায়াত ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ায় সবাইকে ধন্যবাদ জানান। দর্শকরাও প্রবীণ অভিনেতাদের মঞ্চে থাকার জোর দাবি জানান। এমন আবেগঘন সময় কম আসে নাটকের মঞ্চে।