২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রোহিঙ্গা ইস্যু পেছনে ফেলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ

  • সড়ক ও বিমান যোগাযোগ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ভ্রমণ সুবিধা বাড়ছে

তৌহিদুর রহমান ॥ আস্থাহীনতা কাটিয়ে বহুমুখী সম্পর্ক গড়তে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। এ লক্ষ্যে ঢাকা-নেপিডো এখন আন্তঃযোগাযোগ বাড়াতে চায়। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সড়ক ও বিমান যোগাযোগ, ভিসা সহজীকরণ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, ভ্রমণসুবিধা ইত্যাদি বাড়ছে। এছাড়া দেশটির সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে দুটি সমঝোতা চুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এসব তথ্য জানায়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মিয়ানমারের প্রায় ৫০ বছরের একাকিত্ব এখন ভেঙেছে। তারা এখন সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বের দরবারে উন্মুক্ত হচ্ছে। দেশটি বিদেশী উদ্যোক্তা ও উন্নয়ন অংশীদারদের জন্যও তার দুয়ার খুলছে। সে কারণে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনার পাশাপাশি রেল ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুসহ কয়েকটি বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব। প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র মিয়ানমার এখন বাংলাদেশীদের জন্য পর্যটন, ব্যবসা ও বিনিয়োগের একটি চমৎকার স্থান হিসেবেও পরিণত হতে পারে।

মিয়ানমারের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ তৈরির লক্ষ্যে একটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বালুখালী এবং বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুনধুম সীমান্ত দিয়ে এ সড়ক নির্মাণ করা হবে। সড়কটির নাম হবে, ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার মৈত্রী সড়ক’। এটি নির্মাণে সাড়ে ৫৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। আগামী ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে এটি নির্মাণ করা হবে। এটি নির্মিত হলে এ অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি সাধনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যকার এ নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা চীন, থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করবে।

এদিকে গত বছর থেকে ঢাকা-ইয়াঙ্গুন রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট চালু করা হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স মিয়ানমারে প্রথম ফ্লাইট চালু করে ১৯৭৬ সালের ১৩ জানুয়ারি। এর পর টানা তিন দশক পর্যন্ত চালু ছিল। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করে বিমান। প্রায় সাত বছর পর আবার ঢাকা-ইয়াঙ্গুন সরাসরি বিমান চালু হয়।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশীদের জন্য মিয়ানমারে ভ্রমণের জন্য ভিসা আরও সহজ করা হয়েছে। মিয়ানমার চলতি বছর থেকে বাংলাদেশীদের জন্য ই-ভিসা চালু করেছে। অনলাইনে আবেদনের পরে মাত্র চারদিনের মধ্যে মিয়ানমারের ই-ভিসা দেয়া হয়। বিশ্বের এক শ’টি দেশকে মিয়ানমার এখন ই-ভিসা দিচ্ছে। তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এছাড়াও বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য মিয়ানমার ট্যুরিস্ট ভিসা, এন্ট্রি ভিসা, মেডিটেশন ভিসা, বিজনেস ভিসা, মাল্টিপল ভিসা চালু করেছে। এসব ভিসা ছাড়াও টেকনাফ থেকে ট্রাভেল পাস নিয়ে বাংলাদেশীরা মিয়ানমারের ঘুনধুম শহর পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারেন।

সূত্র জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মিয়ানমার। গত বছর দেশটিতে সাড়ে ৩০ লাখ পর্যটকের আগমন ঘটেছিল। আর এ বছর এ সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা দেশটির। পর্যটক আকর্ষণে মিয়ানমার সরকার এখন বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। গত বছর সাড়ে ৩০ লাখ পর্যটকের ৭০ ভাগই আসিয়ানভুক্ত দেশ থেকে মিয়ানমারে গেছেন। এর পরই রয়েছে ইউরোপ। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও জার্মানি থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটক মিয়ানমার ভ্রমণ করেছেন। ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে আসা পর্যটকের সংখ্যা ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। ২০১৩ সালে দেশটিতে আসা পর্যটকের সংখ্যা ছিল ২০ লাখ ৪০ হাজার। মিয়ানমারের লক্ষ্য ২০২০ সালের মধ্যে সাড়ে ৭০ লাখের মাইলফলক স্পর্শ করা। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ থেকেও মিয়ানমার এখন পর্যটক টানতে চাইছে।

এদিকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক বাড়াতে স্থলসীমান্ত সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা সংলাপ ও সহযোগিতাবিষয়ক দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটির প্রস্তাবক মিয়ানমার এবং দ্বিতীয়টির বাংলাদেশ। আগামী নবেম্বরে মিয়ানমারের জাতীয় নির্বাচনের পর এই সমঝোতা স্মারক সই হবে বলে আশা করছে দুই দেশ।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের ঘাটতি অনেক বেশি। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলারের বাণিজ্য হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ মিয়ানমারে রফতানি করে ১ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের পণ্য, আর মিয়ানমার থেকে আমদানি করা হয় ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পণ্য। এদিকে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ইতোমধ্যেই মিয়ানমার থেকে গরু আমদানি বাড়ানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার কারণেই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আস্থাহীনতা রয়েছে। এছাড়াও দুই দেশের মধ্যে আরও বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে। সেসব সম্পর্ক যদি বাড়ানো যায়, তাহলে এই আস্থাহীনতা কেটে যাবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কূটনীতি বিশেষজ্ঞ ড. দেলোয়ার হোসেন জানান, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সম্পর্ক বাড়াতে হলে দুই দেশের পররাষ্ট্র নীতির মধ্যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও মিয়ানমার যে বিসিআইএম গড়ে তুলতে চলেছে সেটি কার্যকর করতে পারলে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক বাড়বে। রোহিঙ্গা সমস্যাকে পেছনে ফেলে বাণিজ্য, পর্যটন, শিক্ষা, মানুষে মানুষে যোগাযোগ ইত্যাদির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া যায় বলেও মত দেন তিনি।

২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মিয়ানমার সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন অভিযাত্রা সূচিত হয়। এছাড়া গত বছর ঢাকায় দেশ দুটির পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের অষ্টম বৈঠক হয়। সেখানে উভয় দেশই পারস্পরিক সহনশীলতা ও সদিচ্ছার মাধ্যমে সীমান্ত রক্ষা, বাণিজ্য-বিনিয়োগ, আন্তঃসংযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিসিআইএম ও বিমসটেকের উদ্যোগগুলোতেও একত্রে কাজ করার জন্য আলোচনা হয়। এদিকে বর্তমানে দেশটিতে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার জন্য অনেক দেশই অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি করলে উভয় দেশের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সুফল বয়ে আনতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যেই অতিমত দিয়েছেন।