২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমরা বিজয়ী জাতি এ বিজয়ই আমার ছবির প্রেরণা ॥ শিল্পী শাহাবুদ্দিন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ পৃথিবীর যেখানেই যাই গর্ব করে বলি জয় বাংলা। কারণ, আমাদের রয়েছে যুদ্ধ বিজয়ের ইতিহাস। আমরা বিজয়ী জাতি। আমার ছবি আঁকার মূল শক্তিই হচ্ছে এই বিজয়। ওটাই আমার ইতিহাস। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আমরা যারা বেঁচে আছি তারা সৌভাগ্যবান। অন্যদিকে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের রক্ত বৃথা যায়নি। তাদের রক্তের ঋণে অর্জিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। এভাবেই অহঙ্কার ও হৃদয়ের ভালবাসায় স্বদেশের কথা বললেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বরেণ্য চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। শনিবার ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা) প্রদত্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত এই চিত্রকর। শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে ইউডার ১৪ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

সংবর্ধনা প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় ঘণ্টাব্যাপী দীর্ঘ বক্তৃতা করেন শাহাবুদ্দীন আহমেদ। চমকপ্রদ বাচনভঙ্গিতে তুলে ধরেন তার শিল্পজীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা, সংগ্রামের কথা, স্বদেশের প্রতি অনুরাগের কথা এবং একাত্তরের রণাঙ্গনের বীরত্বগাথাসহ নানা বিষয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ এবং মুজিবনগর সরকারের সাবেক এমপি অধ্যাপক আবদুল মান্নান। সভাপতিত্ব করেন ইউডার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মুজিব খান। স্বাগত বক্তব্য দেন ইউডার চারুকলা বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক শাহ্্জাহান আহমেদ বিকাশ।

বক্তব্যের শুরুতেই শাহাবুদ্দিন আহমেদ যুদ্ধাপরাধী সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী মামলায় সাক্ষ্য দেয়ার জন্য অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার দীর্ঘ জীবন কামনা করেন। এরপর তার বক্তব্যে উঠে আসে দেশের সংস্কৃতির এগিয়ে চলার কথা। বলেন, এই গরিব দেশে নাচ, গান, নাটক, কবিতাÑকত কিছুই না হচ্ছে। শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সংস্কৃতির এই স্রোতধারাটি আমাকে ভীষণ অবাক করে। আর বর্তমানে দেশের চিত্রকলা যে অবস্থানে এসেছে তা অকল্পনীয়। এদেশে অগণিত শিল্পী চিত্রকর্ম চর্চা করে। এটাকে আরও মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। ফ্রান্সে নিজের অবস্থানের সঙ্গে এ দেশের সংযোগ সিঁড়ির কথা উল্লেখ করে বলেন, প্যারিসের সৌন্দর্যের সঙ্গে আমি বাংলাদেশের অনেক কিছুর মিল খুঁজে পাই।

মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে নিজের চিত্রকর্মের সম্পর্ক উল্লেখ করে শাহাবুদ্দিন বলেন, যুদ্ধের সময় লুকিয়ে চলতাম। শত্রুর চোখ ফাঁকি দিয়ে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে পথ পাড়ি দিতাম। একদিন ভোরবেলায় কুমিল্লার কোন এক অঞ্চলে নৌকা করে গন্তব্যে যাচ্ছিলাম। ওই সময় নদীর পাড় ঘেঁষে কর্মরত কয়েকজন নারীর মুখাবয়ব দেখি। ওই মহিলাদের সেই মুখস্মৃতি আজও আমার ক্যানভাসে ঘুরেফিরে উঠে আসে। চিত্রকর্মের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে বলেন, আসলে রংই হচ্ছে একটি ছবির জীবন। ক্যানভাসে একটাই লাইন টেনে দিলে সেটা জীবন পায়। তবে রংয়ের ব্যবহারটা জানতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের স্মৃতিচারণ করে শিল্পী বলেন, তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে পড়ছি। সেসময় অনুষদের প্রিন্সিপালের কাছে মেজর জিয়াউর রহমানের একটি ফোন আসে। প্রিন্সিপাল ফোনটা ধরিয়ে দিলেন আমাকে। অপর প্রান্ত থেকে মেজর জিয়া বললেন, তিনি চারুকলা থেকে কিছু ছবি কিনতে চান। আমি তাকে চারুকলায় আসতে বললাম। এরপর সানগ্লাস পরিহিত সুদর্শন মেজর জিয়া এলেন চারুকলায়। আমি তাকে বললাম, স্যার সানগ্লাসটি না খুললে আপনি ঠিকমতো ছবি দেখতে পারবেন না। বেশ কিছু ছবি দেখার পর আমার একটি ছবি পছন্দ হলো জিয়ার। আমি দাম চাইলাম এক লাখ টাকা। শুনে তিনি যেন ভিমরি খেলেন। আসলে আমি ওই ছবিটা বিক্রি না করে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পরামর্শে বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টকে দেয়ার বিষয়ে মনস্থির করি। এদিকে আমার কথা শুনে চলে গেলেন মেজর জিয়া। পরদিন আমি তাকে ফোন করে বললাম, আমাকে রংসহ ছবি আঁকার যাবতীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা করে দিলে বিনা পয়সায় ছবি এঁকে দেব। তিনি কলকাতা থেকে রং, বিশাল ক্যানভাসসহ সবকিছু এনে দিলেন। এভাবে জিয়ার সঙ্গে আমার একটি সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর আমি যেন আরেক জিয়াকে দেখলাম। অবাক হলাম এই যে মানুষটি কতটা ভয়ঙ্কর আর নিষ্ঠুর।

নিজের প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রসঙ্গে শিল্পী বলেন, প্যারিসে গিয়েও আমাকে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়তে হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে চারুকলায় বিএফএ ডিগ্রী নিয়েও সেখানে গিয়ে ছবি এঁকে তবেই ভর্তি হতে হয়েছে। আবার ভর্তির পরও ছবি আঁকার সময় অনেকের ঈর্ষার শিকার হয়েছি। এরপর ১৯৮২ সালে প্রথম প্রদর্শনী করি। সেখানেও কয়েকজন ফরাসি নাগরিকের বাজে মন্তব্য শুনতে হয়েছে। তবে আমি হাল ছাড়িনি। আমার শিল্পীজীবন নিয়ে যারা এক সময় অবহেলা করেছিলেন তারাই আবার একদিন এসে আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আমি আজকের এই অবস্থানে এসেছি। তবে আমি নিজেকে কখনই বড় শিল্পী মনে করি না। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সারাক্ষণ ছবি আঁকলেই হয় না। শিল্পী হতে হলে সাধনা লাগে। সঙ্গে থাকতে হবে সাহস ও মনোবল। ভেতরের সাহসটাকে জয় করে তবেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে আনিসুজ্জামান বলেন, ১৯৭১ সালে শিল্পী সত্তার সঙ্গে শাহাবুদ্দিন আহমেদের মুক্তিযোদ্ধা সত্তা এক হয়ে গিয়েছিল। এতটি বছর পরও তিনি সেই সত্তাকে লালন করে যাচ্ছেন। তার শিল্পকর্মের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। চিত্রকর্ম সৃজনের ক্ষেত্রে তাঁর যে গতি, রংয়ের প্রবাহ ও অবয়ব নির্মাণÑসবকিছুতেই সম্পৃক্ত রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সঙ্গে করি দীর্ঘদিন চিত্রকর্ম রচনা করে যাবেন এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে সেই চেতনা ছড়িয়ে দেবেনÑএটাই কামনা করি। দেশের সংস্কৃতিকে আরও ঋদ্ধ হবে তার হাত ধরে।

বিশেষ অতিথি নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, শাহাবুদ্দিন আহমেদ একইসঙ্গে আমার একাত্তরের রণাঙ্গন ও শিল্প ভুবনের বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধকালে আমরা একসঙ্গে নিঃশ্বাস নিয়েছি বাঁচার জন্য, একসঙ্গে আক্রমণ করেছি শত্রু নিধনের জন্য। রক্তরক্ষণের মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে আমাদের বন্ধুত্ব। রাজনৈতিক বিশ্বাস, দেশপ্রেম ও শিল্পপ্রেমের ঐক্য গড়েছেন এই শিল্পী। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তার চিত্রকর্মগুলো আমার মাঝে বিস্ময়ের ঘোর সৃষ্টি করে। একইসঙ্গে গতি ও শক্তির স্বতঃস্ফূর্ত অবয়ব মেলে শাহাবুদ্দিনের ক্যানভাসে।

এভাবেই একাত্তরে রণাঙ্গনের সূত্র ধরে সমর যুদ্ধের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে রাজাকার নিধন পর্যন্ত ঔজ্জ্বল্যমান স্মৃতি তুলে ধরেন নাসির উদ্দীন। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ শাহাবুদ্দিন আহমেদে তার গতিময় চিত্রকর্মের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন বিশ্বের সামনে।

নির্বাচিত সংবাদ