১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যুদ্ধাপরাধী বিচার ॥ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনে শীঘ্রই প্রজ্ঞাপন

  • সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে

বিকাশ দত্ত ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের জন্য শীঘ্রই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানা গেছে। ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের সারসংক্ষেপটি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির পর সেটি রাষ্ট্রপতির দফতরে যাবে। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর শেষে পুনরায় আইন মন্ত্রণালয়ে আসলেই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে মামলাগুলো ট্রাইব্যুনালে-১ এ স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে একটি মামলার বিচার চলছে, অন্য তিনটি মামলা চার্জ ফ্রেমের পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে তদন্ত সংস্থায় প্রায় ৬টি মামলা তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। দুটি ট্রাইব্যুনালের মধ্যে একটির কার্যক্রম চলবে, অন্যটি নিষ্ক্রিয় থাকবে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের লোকবল কমিয়ে আনা হবে। এছাড়া সাড়ে ৫ বছরে দেশের তারকা খচিত অপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে যাদের বিচার করা হচ্ছে তাদের তদন্ত নিয়েও নানা ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি ট্রাইব্যুনাল-১ জাতীয় পার্টির নেতা সাবেক সাংসদ সাখাওয়াত হোসেনসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিলেও অন্য তিন জনকে অব্যাহতি দিয়েছেন। আকরাম হোসেন, অজিহার মোড়ল ওরফে ওজিয়ার মোড়ল ও মশিয়ার রহমানের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একটি সূত্র জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন শাখা তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে ৫টি অভিযোগ আনলেও অজিহার মোড়লের বিরুদ্ধে একটিতেও কোন অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ট্রাইব্যুনাল এ সমস্ত অভিযোগ বিচার বিশ্লেষণ করে ওই তিনজনকে অব্যাহিত দিয়েছে। এর আগেও বাগেরহাটের তিন রাজাকারের মামলার সময় ট্রাইব্যুনাল-১ বলেছিলেন সম্প্রতি আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে তদন্ত সংস্থা একজনের বিরুদ্ধে দেড় বছর ধরে তদন্ত করার পরও কোন রিপোর্ট তো দেনই নাই বরঞ্চ সেই আসামিকে সীমান্ত পার করতে সহায়তা করেছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে বহু লোকের সাক্ষ্য গ্রহণও করা হয়েছিল। আদালত প্রশ্ন তোলে বাগেরহাটের অভিযুক্ত তিন অপরাধীর সঙ্গে আরও আসামি ছিল তাদের কেন আনা হয়নি। আর এর কোন সদুত্তর দিতে পারেননি রাষ্ট্রপক্ষ। এক্ষেত্রে চুজ এ্যান্ড পিক করা হয়েছে বলেও মন্তব্য ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান। যদিও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলছেন ঘটনাটি সত্য নয়। যুক্তিতর্কের এক পর্যায়ে আসামি পক্ষের আইনজীবী বলেন, আসামিদের সেফহোমে জিজ্ঞাসাবাদের সময় বলা হয় অর্থ দিলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা দেয়া হতো না। এ সমস্ত ঘটনার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের তদন্ত নিয়ে জনমনে নানামুখী সন্দেহের জন্ম নিয়েছে। যদিও তদন্ত সংস্থা তখন বলেছিল আমাদের কাছে এমন অভিযোগ আসেনি, আসলে তদন্ত করে দেখা হবে।

ট্রাইব্যুনাল একটি করা হচ্ছে এমন আভাস পেয়েই ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে ট্রাইব্যুনাল-১ এ স্থানান্তর করা হয়েছে। এখন ট্রাইব্যুনাল-২ এ কোন মামলা নেই। সংশ্লিষ্ট তিন বিচারপতি মামলা পরিচালনা করছেন না। অন্যদিকে ট্রাইব্যুনাল-১ এ যে সমস্ত মামলা আছে সেগুলোতেও শুধুমাত্র লম্বা তারিখ দেয়া হচ্ছে। সূত্র মতে, ট্রাইব্যুনাল একটি হলে যারা ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য দায়িত্ব পাবেন তারাই বিচারিক কার্যক্রম শুরু করবেন। অথচ এক সপ্তাহের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের কোন প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়াতে ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজে স্থবিরতা নেমে এসেছে। কর্মচারীর মধ্যেও অনেকটা স্থবিরতা লক্ষ্য করা গেছে। অনেকে ভাবছেন তাদের কি ট্রাইব্যুনালে রাখা হবে না অন্যত্র বদলি করা হবে। বিচারপতির সঙ্কটের কারণে সুপ্রীমকোর্টে ২৮ লাখ মামলা ঝুলে আছে। হাইকোর্টে এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা রয়েছে। শুধু শুধু ট্রাইব্যুনালে ৬ বিচারপতি রেখে মামলা জট আরও তীব্র আকারে ধারণ করবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অতিসত্বর বিচারপতিদের ট্রাইব্যুনালে না রেখে সুপ্রীমকোর্টে নেয়া হলে মামলার জট কমে আসবে।

সূত্রমতে জানা গেছে, তদন্ত সংস্থা যে সমস্ত কর্মকর্তা প্রেষণে আসছেন তাদের তদন্ত সংস্থায় না রেখে অন্যত্র বদলি করা হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি হবে। একই সঙ্গে প্রসিকিউশনেও প্রসিকিউটর থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যাও কমিয়ে আনা যেতে পারে এমনই আভাস পাওয়া গেছে। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে জানা গেছে ট্রাইব্যুনাল একটি হওয়ার পর তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন থেকে পর্যায়ক্রমে লোকবল কমিয়ে আনা হবে।

এর আগে আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক জনকণ্ঠকে বলেছিলেন, আমরা বিচারকে দ্রুত গতিতে নেয়ার লক্ষ্যেই একটি ট্রাইব্যুনাল করতে যাচ্ছি। এতে করে বিচার কাজ বন্ধ হবে না। একটি ট্রাইব্যুনাল নিয়মিত বিচারকাজ চালালে কোনভাবেই মামলাগুলো পেন্ডিং থাকার কথা নয়। শীঘ্রই একটি ট্রাইব্যুনাল করতে প্রজ্ঞাপন জারি হবে বলে আশা করছি।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সর্ববৃহৎ দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা উল্লেখ করে। নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ২৯ জানুযারি জাতীয় সংসদে দ্রুত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস হয়। এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধসমূহ (ট্রাইব্যুনালস) আইন ১৯৭৩ অনুযায়ী। সেই অনুযায়ীই ২০১০ সালের ২৫ মার্চ পুরাতন হাইকোর্ট ভবনে স্থাপন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলা কথা বিবেচনা করে ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ নামে আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) গঠন করেন। এতে করে সারাদেশে ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। দালাল আইন জারির পর ১৯৭৩ সালের ৩০ নবেম্বর পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশ থেকে ৩৭ হাজার ৪১৭ জন দালালকে গ্রেফতার করা হয়। শুরু হয় রাজাকার আলবদর আলশামসদের বিচার। ১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ২ হাজার ৮৪৮টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। তার মধ্যে ৭৫২ জন দ-িত হয়। খালাস পায় ২ হাজার ৯৬ জন। সাধারণ ক্ষমায় ৩৭ হাজারের মধ্যে ২৬ হাজার ছাড়া পেয়েছিলেন। ১১ হাজারের বেশি ব্যক্তি আটক ছিল। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এরপর ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বিচারপতি সায়েম ও জেনারেল জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার দালাল আইন বাতিল করে। ফলে এই ১১ হাজার ব্যক্তির পক্ষে আপীল করে জেল থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ ঘটে।

২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত দুটি ট্রাইব্যুনালে ২১টি মামলার রায় হয়েছে। তার মধ্যে ২৪ জনকে বিভিন্ন দ- প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ জনকে মৃত্যুদ-, একজনকে যাবজ্জীবন কারাদ-, একজনকে ৯০ বছরের কারাদ-, ও ৫ জনকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, ১০টি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২, ১১টি রায় প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালের দেয়া দ-ের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে ৫টি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলেও এখন পর্যন্ত তিনটি মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়নি।

উল্লেখ্য, যাদের দ- দেয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন জামায়াতের সাবেক রুকন বাচ্চু রাজাকার হিসেবে পরিচিত আবুল কালাম আজাদ (মৃত্যুদ-), জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা (আমৃত্যু কারাদ- (আপীলে মৃত্যুদ-, পরবর্তীতে রায় কার্যকর), জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (মৃত্যুদ-) আপীলে আমৃত্যু কারাদ-, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান (মৃত্যুদ-) আপীল বিভাগেও মৃত্যুদ- বহাল, পরবর্তীতে রায় কার্যকর। জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম (৯০ বছরের কারাদ-) অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ (মৃত্যুদ-), ১৬ জুন আপীল বিভাগেও তার মৃত্যুদ- বহাল রেখেছেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (মৃত্যুদ-), আপীল বিভাগেও মৃত্যুদ- বহাল। বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আব্দুল আলীম (আমৃত্যু করাদ-) অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ, বদর বাহিনীর নেতা চৌধুরী মাঈনুদ্দিন এবং মোঃ আশরাফুজ্জামান খান (মৃত্যুদ-), জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী (মৃত্যুদ-), জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর কাশেম আলী (মৃত্যুদ-), বিএনপি নেতা নগরকান্দা পৌর মেয়র জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকার (মৃত্যদ-), আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মোঃ মোবারক হোসেন (মৃত্যুদ-), জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী কায়সার বাহিনীর প্রধান সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার (মৃত্যুদ-), জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজাহারুল ইসলাম (মৃত্যুদ-) জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সুবহান (মৃত্যুদ-) ও জাতীয় পার্টির আব্দুল জব্বার (আমৃত্যু কারাদ-)। মাহিদুর রহমান এবং আফসার হোসেন চুটু (আমৃত্যু কারাদ-), হাসান আলী (মৃত্যুদ-), ফোরকান মল্লিক (মৃত্যুদ-) সর্বশেষ কাসাই সিরাজকে মৃত্যুদ- ও খান আকরামকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করা হয়েছে।