১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ ফজলুল হক মাস্টার

  • শিক্ষকের মর্যাদা

শিক্ষকদের জীবন অভাব-অনটনে জর্জরিত। অভাবে মানুষের মেধা কমে যায়। তবুও তারা মেধা অনুঘটকের কাজটি শ্রেণীকক্ষে করে চলেছেন। আমরা শিক্ষায় উন্নতি চাই। আমাদের সন্তানরা মেধাবী হয়ে গড়ে উঠুক এটাই আমরা চাই। কিন্তু শিক্ষকরা কেমন আছেন সেটা একবারও ভাবি? সামরিক শাসক গেল। স্বৈরশাসক গেল। এখন তো গণতান্ত্রিকমনা সরকার, এখনও কি অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে। শিক্ষকদের প্রারম্ভিক বেতন ছয় হাজার টাকা। তাদের সংসার আছে। প্রধানমন্ত্রী কি বলবেন শিক্ষকরা করবেটা কি? বেসরকারী কলেজের প্রভাষকের বেতন এগারো হাজার টাকা। তাদের সন্তানরা কোথায় দাঁড়াবে? ৯০ ভাগ শিক্ষকের সংসার চলে ধারকর্জ করে। প্রকাশ্য লোকালয়ে শিক্ষকরা অপমানিত হচ্ছেন প্রতিদিন। তাহলে ভেবে দেখুন শিক্ষকদের মর্যাদা কতটা ভূ-লুণ্ঠিত। একজন রিক্সাওয়ালা, ভ্যানওয়ালার চেয়ে শিক্ষকের আয় কম। জাতির এগিয়ে যাওয়ার পথে শিক্ষকরা সেতুবন্ধনের কাজটি করেন। আমরা তো বলি শিক্ষা জাতির মেরুদ-। আমরা জানি শিক্ষা জাতির দর্পণ। শিক্ষকরা এ দর্পণে আলো ঢালে। অভাবী শিক্ষকরা শিক্ষা দিয়ে থাকেন, ‘সকল ধনের সেরা বিদ্যা মহাধন।’ আরও শিক্ষা দেন লেখাপড়া করে যে গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে সে। এ দেশে ধনের ঘাটতি নেই। তবুও শিক্ষায় বাজেট ঘাটতি রয়েছে। লেখাপড়াওয়ালা লোকদের গাড়িও রয়েছে বিস্তর। যারা বিত্তশালী হচ্ছে তারা আরও ফুলে উঠুক। কিন্তু শিক্ষকবান্ধব না হলে যে তাদের সন্তানরাই ঠকবে। শুধু এলজিএসপি, এডিপি কিংবা থোক বরাদ্দের টাকা যেভাবে অপচয় হচ্ছে এসব রোধ করতে পারলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থ সঙ্কটের বিষয়টি অচিরেই মিটে যাবে। শিক্ষকদের সুবিধা দিতে টাকার অভাব হয় কিন্তু দেশের উপচে পড়া টাকা তো প্রতিদিন পাচার হয়ে যাচ্ছে। ইয়াবা ব্যবসা করে অনেকে কোটিপতি বনে যাচ্ছে এটা যে মানবতার ভূতের উল্টো পায়ে হাঁটার মতো কিছু, সেটা ভাবতে হবে। সরকারী মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাত্র ৩২৩টির মতো। আর বেসরকারী মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১৩ হাজারেরও অধিক। সরকারী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা মেধাবী বলে বিবেচিত হয়ে প্রমোশন পেয়ে শিক্ষা অফিসে চলে যাচ্ছে। বঞ্চিত করা হচ্ছে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের। শিক্ষায় যত বৈষম্য রয়েছে এবং শিক্ষক বঞ্চনার যতটা বিস্তৃত অনাকাক্সিক্ষত পথের সৃষ্টি হয়েছে- এটা রোধ করতে তো আর অর্থের দরকার নেই। কাজেই শিক্ষা সেক্টর যে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে এটা আমরা বলতে পারি না। শিক্ষামন্ত্রী বছরের শুরুতে সময়মতো ছাত্রদের হাতে বই উঠিয়ে দিয়ে বাহবা নিচ্ছে। আমরাও বিষয়টির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু কথা হলো একটি প্রতিষ্ঠানে আগত বছরে কত ছাত্র বাণিজ্যে, কত ছাত্র মানবিকে কিংবা বিজ্ঞানে চয়েজ দেবে এটা নির্ভুলভাবে নিরূপণ সম্ভব হয় না। ফলে অনেক ছাত্রের হাতে বই তুলে দেয়া সম্ভব হয় না। বই পাওয়ার বিকল্প কোন পথও নেই।

সরকারের হাতে জনগণ ক্ষমতা তুলে দেয় দক্ষতার সঙ্গে নিরপেক্ষতার সঙ্গে দেশ পরিচালনার জন্যে। দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের সুবিধায় সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য। সরকার শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারছে কি? মন্ত্রী-এমপিরা সংসদে বসে নিজেদের সুবিধা বৃদ্ধির আইন অকপটে পাস করে নিচ্ছে অথচ দেখুন শিক্ষকদের দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে নামতে হচ্ছে। অতীতে এটাকে প্রতিরোধ করতে আবার আইন রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠির গুঁতো খেতে হচ্ছে শিক্ষকদের। ক্ষমতার অপব্যবহার করা অতি সহজ কিন্তু ক্ষমতা চিরায়িত করা সম্ভব নয়। শিক্ষা সেক্টর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। ব্যক্তি তথা জাতিকে উন্নততর পথে পরিচালিত হওয়ার স্বীকৃত চালিকাশক্তি। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সঙ্কটের কথা অস্বীকার করব না। কিন্তু জাতির গতির প্রধান সঞ্চালক শিক্ষকদের সমস্যার কথা তো অগ্রে বিবেচনায় নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী দক্ষ প্রশাসক বটে। অতপর তিনি শিক্ষকদের মানবেতর অবস্থার উত্তরণের জন্য সিদ্ধান্ত নেবেন দ্রুত আমাদের প্রত্যাশা এরকমই।

লেখক : শিক্ষাবিদ