২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সাতক্ষীরায় গৃহবধূসহ তিনজনকে নির্যাতন

স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা ॥ লোকলজ্জার ভয়ে দীর্ঘ ১৩ দিন বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করেছিল মালয়েশিয়া প্রবাসীর স্ত্রী, তার খালাত বোন ও বোন জামাই। অসামাজিক কার্যকলাপের কল্পিত অভিযোগ তুলে এই তিন সদস্যকে প্রকাশ্যে দড়ি দিয়ে বেঁধে, বাঁশের লাঠি ও কুড়ালের হাতল দিয়ে পিটিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য করা হয়। কান ধরে ওঠ-বস করিয়ে তাদের গ্রামে আর ফিরবে ন- এই শর্তে তাড়িয়ে দেয়ার পর এখন মামলা তুলে না নিলে জীবননাশের হুমকি দিচ্ছে সন্ত্রাসীরা। জীবনের নিরাপত্তার জন্য অসহায় নির্যাতিতরা এখন সংবাদকর্মীদের কাছে মুখ খুলছে। বর্বর নির্যাতনের এ ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ বিল্লাল হোসেন নামের একজনকে গ্রেফতার করলেও আদালত থেকে সে জামিনে মুক্তি পেয়ে মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছে।

এদিকে লোকলজ্জায় নিজের মুখ লুকিয়ে রেখেছেন নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ সুমাইয়া খাতুন। আর তার খালাত বোন রুমা খুঁজছেন আত্মহননের পথ। তার স্বামী জাহিদও লোকলজ্জার ভয়ে ঘরের বাইরে আসতে পারছেন না। নির্যাতনের ঘটনাটি ১৩ দিন আগের হলেও উভয়পক্ষ তা নিজ নিজ কারণে বিষয়টি চেপে রাখার চেষ্টা করে। অবশেষে ঘটনাটি ফাঁস হওয়ায় সন্ত্রাসীরা নিজেদের ঠেকাতে এখন পুলিশ ও সংবাদকর্মীদের দ্বারস্থ হচ্ছে। অভিযোগ নির্যাতনকারী বিল্লাল ও কুদ্দুস স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির ক্যাডার বাহিনীর সদস্য। ওই জনপ্রতিনিধি তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রামের ডাঃ আবদুল আজিজের মেয়ে নির্যাতিত সুমাইয়া খাতুন জানান, প্রায় ১২ বছর আগে তার সঙ্গে বিয়ে হয় একই উপজেলার কেড়াগাছি ইউনিয়নের পাঁচপোতা গ্রামের হেজো মোড়লের ছেলে হাফিজুলের। হাফিজুল গত তিন বছর ধরে মালয়েশিয়া প্রবাসী। সুমাইয়া জানান, স্বামীর অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে একই গ্রামের ইব্রাহীমের ছেলে ট্রলিচালক চোরাকারবারি বিল্লাল হোসেন তাকে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত। তার মোবাইল ফোন নম্বর চেয়েও না পাওয়ায় সে আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সুমাইয়া পরিচয়ে বিল্লালের মামী। তার খারাপ প্রস্তাবে সাড়া না পেয়ে বিল্লাল তার বিরুদ্ধে অশোভন কথা বলে বেড়াত। সুমাইয়ার আরও অভিযোগ, কিছুদিন পূর্বে মালয়েশিয়া থেকে বাড়ি ফিরে আসা তার ভাসুর মোস্তফা মোড়লের সঙ্গে স্বামীর জমির সীমানা নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়। ভাগ্নে বিল্লাল এ সুযোগে তার মামা মোস্তফার পক্ষ নিয়ে সুমাইয়া সম্পর্কে আরও বেশি কটূক্তি করতে থাকে। এই বিরোধের মধ্যে ভাই ওমর শরিফ বোন সুমাইয়াকে বাবার বাড়িতে নিয়ে আসেন মাস চারেক আগে। সুমাইয়া জানান, গত ২৭ আগস্ট মেয়ে ঈশিতা ও তার খালাত বোন রুমা খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যান। এর দুই দিন পর ২৯ আগস্ট রুমার স্বামী জাহিদুল ইসলামও আসেন তাদের বাড়িতে। দুপুরে তারা যখন একই ঘরে রান্নার কাজে ব্যস্ত সে সময় তার বাড়িতে ঢুকে পড়ে বিল্লাল, গোলাম মোস্তফার ছেলে রুহুল কুদ্দুস, ভাসুর মোস্তফা মোড়ল, জিয়া, জোহর, লাল্টু, ভোলা, ইসমাইল, ইমান মুহুরি, আশরাফুল, কওসারসহ বেশ কয়েকজন।

তারা নিজেদের সমাজপতি দাবি করে সুমাইয়াদের ঘরে ঢুকে পড়ে। সুমাইয়া জানান, তারা তার বোন রুমা ও বোনজামাই জাহিদের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি তাদের নিজের বোন ও বোনজামাই বলে পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় তারা ঘরের আসবাবপত্র ভাংচুর করতে শুরু করে। যে যার মতো নগদ টাকা, গলার চেন, মোবাইলসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়। কুদ্দুস সুমাইয়ার মুখে চড় বসিয়ে মজা করে। তারা গরু বাঁধার দড়ি এনে তিনজনকেই হাতে ও পিঠে বেঁধে টানতে টানতে ঘরের বাইরে এনে শুরু করে বাঁশের লাঠি ও কুড়ালের আছাড় খুলে মারপিট। এ সময় সেখানে এলাকার শত শত মানুষ জড়ো হয়। তাদের সামনেই ওই তিনজনকে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এভাবে বেশ কয়েক মিনিট মারপিট করার পর তাদের ফের টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে প্রতিবেশী পুলিশিং কমিটির সদস্য ইসমাইলের বাড়িতে।

একইভাবে সেখানে মারধর করার পর তাদের এক শ’ বার কান ধরে ওঠ-বস করার শাস্তি ঘোষণা করা হয়। সুমাইয়া জানান, ‘আমাদের চারপাশে ঘুরে ঘুরে নাটকীয় কায়দায় প্রচ- মারপিট আর কান ধরে ওঠ-বসের মতো অপমান ও শারীরিক নির্যাতনের সময় তারা উল্লাস করে। এদিকে দিনদুপুরে নির্যাতিতদের চিৎকারে ঘটনাস্থলে দ্রুত ছুটে আসেন স্থানীয় ইউপি সদস্য ফারুক হোসেন ও তার ছেলে সবুজ। ফারুক তাদের কাছ থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে ওড়না ও রশির বাঁধন খুলে দেন। এরপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন সুমাইয়া। তার বোন রুমা ও বোনজামাইও গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সেখান থেকে সরে যায়। তাদের কাছ থেকে মোবাইল, নগদ টাকা ও সোনার গয়নাও ছিনিয়ে নেয়া হয়। রাত ১২টায় সুমাইয়ার ভাই ওমর শরিফ ঘটনা জানতে পেরে তার চাচা মফিদুল ইসলাম তাকে কলারোয়া হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে তাকে ভর্তি করা হয়। লোকলজ্জা এবং পরবর্তী বিপদ-আপদের আশঙ্কায় সব নির্যাতনের কথা চেপে রেখে ঘটনার ৮ দিন পর গত ৬ সেপ্টেম্বর সুমাইয়া বাদী হয়ে কলারোয়া থানায় মামলা দায়ের করেন। সুমাইয়ার অভিযোগ, দারোগা মোয়াজ্জেম সব আসামির নাম বাদ দিয়ে মোট ২০ আসামির মধ্যে তিনজনের নামে মামলা রেকর্ড করেন। কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হত্যার হুমকির বিষয়টি তার জানা নেই দাবি করে শনিবার বিকেলে জনকণ্ঠকে বলেন, পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। হুমকি সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নির্বাচিত সংবাদ