১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

থাকবে না গরু সঙ্কট

  • আরিফুর সবুজ

একদিন এক ছাত্র ক্লাসে গরু নিয়ে এলে স্যার বলে উঠলেন, এই তোতা ক্লাসে গরু নিয়ে এলি কেন? জবাবে ছাত্রটির উত্তর, স্যার আপনিই তো বলেন, কত গরু পিটাইয়া মানুষ বানাইলাম, এখন এই গরুটাকে একটু মানুষ বানাইয়া দেন! গরুর গুরুত্ব এই গুরু আর শিষ্য বুঝতে পারেনি। এটা নিছক কৌতুক। এখানে তাই গরুকে গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু শৈশবে গুরুরা যেভাবে শিষ্যদের দিয়ে গরু রচনা পড়ান ও লেখান, তার মধ্যে দিয়েই আসলে প্রকাশ পায় আমাদের জীবনে গরু কত গুরুত্বপূর্ণ। ইদানীং এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীটি নিয়ে আমাদের দেশে মাতম চলছে। কারণ গরু সঙ্কটের আশঙ্কা। সামনে কোরবানির ঈদ। এই ঈদে ভারত থেকে গরু আসতে পারবে কি পারবে না, সেই দোদুল্যমান অবস্থাই শঙ্কার কারণ। তবে হাটে ভারতীয় গরুর ব্যাপক উপস্থিতিই জানান দিচ্ছে, কেটে যাচ্ছে গরু নিয়ে সব শঙ্কা।

গরু নিয়ে সঙ্কটের প্রেক্ষাপট ও ভারত প্রসঙ্গ

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের গরু নিয়ে কোন আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক নেই। তবে প্রতিবছরই ভারত থেকে পাচার হয়ে প্রচুর গরু এ দেশে আসে। ভারত থেকে গরু পাচার হয়, এ দেশে আসে সীমান্তের ৩১টি করিডোর দিয়ে। রাজশাহী অঞ্চলেই রয়েছে বারোটি করিডোর। এছাড়া যশোর, খুলনা, সিলেট ও চট্টগ্রামের করিডোর দিয়েও প্রচুর গরু আসে। এসব করিডোর থেকে অবৈধ পথে আসা পশু বৈধ করা হয় রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে ভারত থেকে গরু এনে এদেশের সঙ্কট মেটানো হচ্ছে। তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। সঙ্কটের শুরু এ বছরের এপ্রিলে। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে বিএসএফকে বাংলাদেশে গরু পাচারের ওপর কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেয়ার পর থেকেই।

কারণটা ধর্মীয়। দেশটির অনেক রাজ্যেই গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গরু জবাই নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্তে ভারতীয় জনগণের মাঝেই দেখা দিয়েছে মিশ্র এবং তীব্র প্রতিক্রিয়া। দেশটির অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, বিহার, ছত্তিশগড়, দিল্লী, গোয়া, গুজরাট, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, ঝাড়খন্ড, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ এবং উত্তরাখন্ড রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ। অথচ অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো গরুর মাংস রফতানিতে ভারতই বিশ্বসেরা। চলতি বছরে ইতোমধ্যে ২.৪ মিলিয়ন টন গরুর মাংস রফতানি করেছে দেশটি। সে যাই হোক, দেশটির বিভিন্ন রাজ্য গরু জবাই নিষিদ্ধকরণ এবং সীমান্তে পাচার বন্ধের কঠোর নির্দেশনার কারণেই বাংলাদেশে গরু সঙ্কট দেখা দেয়।

বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ভারত থেকে বাংলাদেশে ২২ লাখ গরু আসে। অর্থাৎ মাসে গড়ে পৌনে দুই লাখ গরু আসে। কিন্তু এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত কোন মাসেই ২০ হাজারের বেশি গরু আসেনি। ফলে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেখা দিয়েছে তীব্র গরু সঙ্কটের শঙ্কা।

কোরবানির ঈদ ও গরু প্রসঙ্গ

এদেশে কোরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ। এরমধ্যে ৬০ লাখের জোগান আছে দেশের অভ্যন্তরে। ঘাটতি ১০ লাখ নিয়েই চিন্তা। এই ঘাটতির কারণেই গরুর বাজার যেন আগুন। গত বছর যে গরু বিক্রি হয়েছিল ত্রিশ হাজার টাকা, তার দাম হাকানো হচ্ছে ষাট থেকে সত্তর হাজার টাকা। ক্রেতারা তাই বিরস মুখে ফিরে আসছেন খালি হাতে। অথচ কোরবানির আর বেশি দেরি নেই। তবে কোরবানির হাটগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী পশুর সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক রাখতে সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ভারত সরকারকে গরুর অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের বিষয়ে নমনীয় করা হয়েছে। ফলে সীমান্ত করিডোর দিয়ে প্রচুর গরু প্রতিদিন এদেশে ঢুকছে। তাছাড়া, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তান থেকে গরু আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলে আশা করা হচ্ছে, কোরবানির ঈদকে ঘিরে গরু সঙ্কটের যে শঙ্কা করা হয়েছে, তা থাকবে না। তবে কিছু অসৎ ব্যবসায়ী সঙ্কট না থাকলেও কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে বেশি টাকা আয় করার ফন্দি আটছেন, এটাই সমস্যা।

গরু ও ইলিশের অলিখিত বিনিময়

গরুর সঙ্কট দূর করতে মঞ্চস্থ করা হয়েছে নাটকের। গরু আর ইলিশের বিনিময়কে ঘিরে এই নাটক। গরু ও ইলিশ রফতানিতে ভারত ও বাংলাদেশে সরকারীভাবে নিষেধাজ্ঞা বহাল আছে। তবে বাণিজ্যিক কূটনীতির মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক ও অলিখিত সমঝোতার পথ তৈরি করা হয়েছে কোরবানির ঈদ ও দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে। দুর্গোৎসবে ভারতে ইলিশের প্রচুর চাহিদা তৈরি হয়। পদ্মার ইলিশের প্রতি তাদের দুর্বলতা আছে। বৈধপথে ইলিশ রফতানির সুযোগ না থাকলেও অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের মাধ্যমে পদ্মার ইলিশ ভারতে যেতে পারবে দুর্গোৎসবের আগ পর্যন্ত। এবং ভারত সীমান্তের নজরদারি কোরবানি উপলক্ষে শিথিল করবে। ঈদ ও দুর্গোৎসবের পর গরু ও ইলিশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দৃশ্যত পুনর্বহাল করা হবে। দু’দেশের সাজানো নাটকের মধ্য দিয়ে সাময়িকভাবে সঙ্কট মোকাবেলা করার পরিকল্পনা হাস্যকর মনে হলেও, এ মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গরু নিয়ে ভাবনা আর নয়

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গত জুনে প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, সারাদেশে পরিবারভিত্তিক দুই কোটি ৮২ লাখ গরু লালন-পালন করা হয়। আর খামারে গরু রয়েছে চার লাখ ১১ হাজার। পরিবার ও খামার মিলে দেশে এখন দুই কোটি ৮৬ লাখ গরু রয়েছে। এর মধ্যে এক কোটি ৭৫ লাখ হলো গাভী। ২০০৪-৫ অর্থবছরে দেশে গরুর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ২৭ লাখ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৩৫ লাখে। এক দশকে বছরে গড়ে গরুর সংখ্যা বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ হারে। এভাবে হার বৃদ্ধি পেলে সঙ্কট নিরসন সম্ভব নয়। কিন্তু সরকার যদি কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তবে গরুর জন্য বাংলাদেশকে আর অন্যদেশের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না।

ইতোমধ্যে বিফক্যাটল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৬ হাজার গরু বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাংস উৎপাদন উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। প্রায় প্রতি মাসে আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ গরু এ প্রকল্পের আওতায় আনা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় উৎপাদিত প্রতিটি গরু থেকে ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি মাংস হচ্ছে। প্রকল্পের আকার আরও বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেয়া হলে কয়েক বছরের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ মাংসের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশ থেকে ইতোমধ্যে গরু রফতানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চরজীবিকায়ন প্রকল্পের (সিএলপি) আওতায় চরাঞ্চলে এবং কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে যেসব গরু উৎপাদিত হচ্ছে, তা থেকে মালয়েশিয়ায় লাখখানেক গুরু রফতানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এর মধ্য দিয়েই এদেশের গরু প্রথমবারের মতো রফতানি খাতে উঠছে। এই প্রকল্পের আওতা আরও বৃদ্ধি করা হলে গরুর সঙ্কট থাকবে না। বরং রফতানি করে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গরু পালনে চাষীদের উৎসাহ দিতে একজন কৃষককে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা ঋণ দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই ঋণে সুদের হার হবে ৫ শতাংশ। তবে ঋণ বিতরণ করলেই হবে না, তার তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গরু পালনে প্রশিক্ষণ, কৃত্রিম প্রজনন ব্যাপৃতকরণসহ দীর্ঘমেয়াদি আরও কিছু পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশকে আর নাটক সাজিয়ে ভারত থেকে গরু আনতে হবে না। থাকবে না কোন গরু সঙ্কট।