১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকার যানজট ও জলাবদ্ধতা

  • কাজী সেলিম

ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ শহর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়রদের নির্বাচনপূর্ব ওয়াদা বা শহরবাসীর উপকার ও উন্নয়নের পরিকল্পনার কার্যক্রম বাস্তবায়নের ‘প্ল্যান অব এ্যাকশন’ দেখার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামের নগরবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

রাজধানী ঢাকা শহরের অসহনীয় যানজট ও সামান্য ভারি বর্ষণে জলাবদ্ধতায় অচল শহরবাসীর জন্য যেমন দিন দিন অসহনীয় দুর্ভোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তেমনি চট্টগ্রাম শহরবাসীর জন্য দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার লাঘবহীন অকার্যকরী ব্যবস্থা যেন মানবজীবনের চরম দুঃখ-কষ্ট ও অশান্তির এক সীমাহীন ঔদ্ধত্যপূর্ণ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।

ঢাকার নিত্যদিনের যানজট যেন দিন দিন ব্যর্থ নিয়ন্ত্রণহীন এক ভঙ্গুর অবস্থায় পরিণত হয়েছে। যদিও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক অফিসার ও পুলিশ সদস্যরা দিনরাত পরিশ্রম করে রাজধানী ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে থাকেন, তবুও রাজধানীর সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের যেন রয়েছে একটি সঠিক টেকসই বাস্তব পরিকল্পনা ও কার্যকরী বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণের সদিচ্ছার অভাব। প্রথমেই ঢাকা শহরের অসহনীয় যন্ত্রণাদায়ক যানজট ও তার অত্যাচার থেকে পরিত্রাণের ওপর কিছু মতামত।

ট্রাফিক সিগন্যাল দেশের রাজধানীর জন্য একটি বিশেষ অপরিহার্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। একটি দেশের রাজধানীর ট্রাফিক সিগন্যালের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও তার যথাযথ অনুসরণ ও সম্মানকরণের মধ্যেই ফুটে ওঠে সে দেশের সর্বাত্মক শৃঙ্খলা ও আইনের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা ও মেনে চলার আপোসহীন একটি স্বচ্ছ প্রতীকী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা। আমাদের দেশের রাজধানী ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যালের অনিয়ন্ত্রিত ও অব্যবহৃত অচলাবস্থার চিত্র অবলোকন করলে এক সদ্য আগত যাত্রী বা পর্যটকের কাছে অবিশ্বাস্য চোখে সরষে ফুলের মতো বিবেচিত হবে। বিদেশী যাত্রী বা পর্যটকরা প্রথমে হয়তবা মনে করেন যে, দীর্ঘ সময়ের বিমানযাত্রার নির্ঘুম প্রতিক্রিয়া হিসেবে হয়ত বা চোখ ও মস্তিষ্কের স্নায়ু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় গরমিল বা বিরূপ এক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টিরই কারণ স্বরূপ তাদের চোখে ঢাকার অচল ট্রাফিক ব্যবস্থা মনে হচ্ছে। ঢাকা বিমানবন্দর হতে তাদের গন্তব্যস্থল হোটেলে না ওঠা পর্যন্ত, দীর্ঘ যানজট ও অনিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থার অকার্যকারিতার দীর্ঘ লাইন অতিক্রম করার সময় এক অবিশ্বাস্য ধারণার সৃষ্ট হয়। প্রথম দিনের পদার্পণেই ঠিক তাদের মনে একটি ভুল-ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয় দেশের সামগ্রিক ট্রাফিক ও আইনশৃঙ্খলার ওপর। এ সকল বিদেশী আমাদের দেশের রাজধানীসহ অন্যান্য শহরের ট্রাফিক অব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলার ওপর এক বিরূপ মনভাবসহ দ্বিতীয়বার আর আমাদের রাজধানী ঢাকা বা বাংলাদেশে ফিরে না আসার এবং অপরকে প্রভাবিত করার অটল সিদ্ধান্তের অঙ্গীকারে অবদ্ধ হয়ে ফিরে যান। রাজধানী ঢাকার জনগণকে এই ভয়াবহ যানজট ও ভারি বর্ষণে জনবদ্ধতার নিত্যদিনের দুঃখ-কষ্ট ও অত্যাচারের কারণসমূহের লাঘবের জন্য নিম্নে আলোচিত হলো কিছু বিবেচনাযোগ্য বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণের অভিমত।

ঢাকা শহরের সকল ফুটপাথ থেকে স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকানপাট, ব্যবস্থাপনার স্থায়ী অপসারণ করে ফুটপাথে পথচারীদের অবাধ ও মুক্ত চলাচলের স্থায়ীভাবে ব্যবস্থাকরণ, ফুটপাথের ওপর ও রাস্তার পাশের নির্মাণধীন বাড়িঘর, এ্যাপার্টমেন্ট ও মার্কেট-দোকান নির্মাণকারী মালিকদের দ্বারা রাস্তা ও ফুটপাথের ওপর নিক্ষিপ্ত বা জমাকৃত উচ্ছিষ্ট নির্মাণসামগ্রী যেমন ইট, খোয়া, বালু, সিমেন্ট, সুরকি স্তূপ আকারে জমা করা বা রাখার বিরুদ্ধে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করে ওই সকল বাড়িঘর, দোকান, এ্যাপার্টমেন্টের মালিকদের সর্বোচ্চ সাতদিনের সময় দিয়ে তাদের জমাকৃত সকল আবর্জনা অপসারণের নির্দেশ সংবলিত নোটিস প্রদান ও শাস্তিস্বরূপ জরিমানার ব্যবস্থা কার্যকর করা উচিত। ঢাকা শহরের প্রতিট অলিগলি, সড়ক-মহাসড়কে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও ডিএমপির ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক প্রতিনিয়ত মোবাইল টহল ও ঘোষিত ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর কঠোর নজরদান ও নির্দেশ-আদেশ বিজ্ঞপ্তির আইনের ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া উচিত। রাজধানী ঢাকায় বিশেষ করে ভিআইপি ও ভিভিআইপি সড়কের চলন্ত ট্রাফিক সিগন্যালকে অবজ্ঞা বা ভঙ্গ করে এক ধরনের সরকারী গাড়ি ব্যবহারকারী মন্ত্রী, আমলা ও সামরিক-বেসামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ ফ্লাগ কারের সিগন্যাল ভঙ্গ করে ট্রাফিক পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে উল্টোপথে চলাচলের দৃষ্টান্তের নজির প্রতিনিয়ত পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হয়। ভিআইপি ও ভিভিআইপি সাহেবদের এই আইন ভঙ্গ করে চলাচলের পর দেশের সাধারণ জনগণকে ট্রাফিক আইন মেনে চলার উপদেশ দেয়া বা বাধ্য করা যে কতটুকু যুক্তি ও ন্যায়সঙ্গত, তা ওই সকল নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী ও রাষ্ট্রের পতাকা, মনোগ্রাম সংবলিত গাড়িতে চলাচলকারী ভিভিআইপি ও ভিআইপি সাহেবগণই সঠিক জবাব প্রদান করতে পারেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও তার লালন-পালনকারী জনগণের সেবক ওই সকল সিগন্যালের আইন ও স্বাভাবিক ট্রাফিক কানুন ভঙ্গকারী ফ্লাগ কার ব্যবহারকারী ভিআইপি সাহেবদের যথাযথ স্বাভাবিক নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য আইন ও জবাবদিহির আওতায় এনে এ ধরনের নির্লজ্জ ধৃষ্টতার অবসান হওয়া উচিত। ভিআইপিদের কমপক্ষে দুই ঘণ্টা পূর্বে তাদের দফতর বা সভা মিটিংয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য হাতে সময় নিয়ে রাস্তায় চলাচল করা উচিত। প্রয়োজনে সকাল সাত ঘটিকায় তাদের স্ব-স্ব দফতরে চলে আসা উচিত। ফলে রাজধানীর সড়ক ও মহাসড়কে চলাচলকারী জনসাধারণ ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, এ্যাম্বুলেন্স, অসুস্থ মানুষ, শিশুসন্তানসহ সব ধরনের মানুষই একটি যানজটবিহীন সুষ্ঠু সড়কে ও রাস্তায় চলাচলের সুযোগ পাবেন। অন্যথায় সাধারণ জনগণের ওপর অবৈধ ও অন্যায় দৃষ্টান্ত এবং ট্রাফিক আইন ভঙ্গের দায়-দায়িত্ব দেশের সাধারণ জনগণের ওপরই কেবল ন্যস্ত করা অন্যায় ও নীতি-আদর্শ বহির্ভূত একটি জঘন্য বেআইনী প্রক্রিয়া বলে দেশ ও সমাজের মানুষ গণ্য করবে। ভিআইপি ও ভিভিআইপি সাহেবরা আইনের রক্ষক ও তা যথাযথ কার্যকরী করার দায়িত্বে নিয়োজিত, প্রচলিত আইনের ভঙ্গকারী ভক্ষক নন। এটাই তাদের মনে রাখা উচিত।

ঢাকা শহরের সড়ক ও মহাসড়কের নির্ধারিত পার্কিংয়ের স্থান বা জায়গা ব্যতীত যানবাহন অবৈধভাবে পার্কিংয়ের ওপর কঠোর নির্দেশাবলী ও নজরদারিসহ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এ ব্যবস্থা সকল সরকারী, বেসরকারী, ভিআইপি, ভিভিআইপি ফ্লাগ কার ও পরিবহনসহ সকল শহরে গাড়ি ব্যবহারকারী শহরবাসী নাগরিকদের জন্য কঠোর ও আপোসহীনভাবে প্রয়োগ করা উচিত। যত্রতত্র গাড়ি, বাস, অটোরিক্সাসহ যে কোন ধরনের যানবাহনের পার্কিং বা থামানো সম্পূর্ণভাবে স্থায়ীরূপে বেআইনী ও দ-নীয় অপরাধ হিসেবে ব্যবস্থা কার্যকরী করা উচিত। ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, তিতাস গ্যাস, বিটিসিএল, পিডিবি ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যৌথ সমন্বয়ে একটি কার্যকরী পরিকল্পনা বা ‘এ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরি করে এবং সর্বদা একটি সমন্বয় রক্ষা করে ঢাকা শহরের বসবাসকারী জনগণের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান ও দুর্দশা-কষ্ট সৃষ্টিকারী সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে, নগরবাসীর সঙ্গে প্রতিনিয়ত মেয়র ও কাউন্সিলরদের উপস্থিতিতে মতামত আদান-প্রদান করে নগরবাসীর মতামতকে গুরুত্ব প্রদান করে এ ধরনের ‘প্ল্যান অব এ্যাকশন’ তৈরি করা উচিত। ঢাকা শহরের দীর্ঘদিনের যানজট নিরসনের উপায় উদ্ভাবনের জন্য বাংলাদেশের বিশেষ করে বুয়েটের নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রয়োজন হলে বিদেশী ট্রাফিক বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা উচিত।

মারাত্মক যানজটের স্থায়ী সমাধানকল্পে কমপক্ষে পাঁচ বছরের জন্য বিদেশ থেকে সকল ধরনের গাড়ি আমদানি বন্ধ ঘোষণা করা উচিত। ফলে সরকারের ও জনগণের কোটি কোটি টাকার যেমন রক্ষা হবে, তেমনি যানজট কমবে ও কৃচ্ছ্রতা সাধন হবে। অর্থ ও প্রভাবশালী পরিবারের একেকজন ৩-৪টি বা ততোধিক গাড়ি ব্যবহার করেন। এই বিলাসবহুল জীবনের ভোগকারীদের ওপর গাড়ি ব্যবহারের সংখ্যার ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত। সরকারী পয়সার অপচয়, যত্রতত্র খরচ ও কোটি কোটি টাকার আমদানিকৃত গাড়ির ট্যাক্স দেশের বিভিন্ন খাতে ব্যবহারেরও সুযোগ হবে। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা সিঙ্গাপুরে বিদ্যামন রয়েছে, যার ফলে সিঙ্গাপুর শহরটির যানজটবিহীন, সুশৃঙ্খল, কলুষমুক্ত একটি সুন্দর পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে খ্যাতি রয়েছে, দেশের নাগরিকগণও অতি আনন্দে ও আরামে যানজটবিহীন সুশৃঙ্খল একটি ট্রাফিক আইনের মধ্যে অবাধে ও সহজেই চলাচল করেন।

ভারি বর্ষণের জলাবদ্ধতায় বর্ষা মৌসুমে ঢাকার প্রধান প্রধান সড়ক, মহাসড়ক, অলিগলি পানিতে নিমেষের মধ্যেই ডুবে যেন নদী-খালের বা বিশাল জলাশয়ের আকারে পরিণত হয়। এ জলবদ্ধতায় যে নগরবাসী বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও অফিসগামীদের জন্য কী এক অসহায় ও অভাবনীয় দুঃখকষ্টের সৃষ্টি হয়, পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত ছবির দিকে একটু দৃষ্টিগোচর হলে তা ভালভাবেই অনুভব করা যায়। চলবে...

লেখক : গবেষক