১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাস্তবায়নে যাচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল

  • দারিদ্র্য ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্যকে কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করবে সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ শুধু পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র। গত জুন মাসে এটি মন্ত্রিসভা অনুমোদন করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন দিয়েছেন। এখন চলছে বাস্তবায়ন পর্যায়ের কাজ। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচী সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় পরিবীক্ষণ কমিটির নবম সভায় এ বিষয়ে ছয়টি বিশেষ সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইয়া।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় পরিবীক্ষণ কমিটির সভাপতি মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইয়া সভায় বলেন, এ কৌশলপত্র বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল একটি দিকনির্দেশনামূলক দলিল, যা প্রতিপালনে আইনী বাধ্যবাধকতা নেই। প্রচলিত নিয়মকানুন মেনেই এতে সুপারিশকৃত বিভিন্ন পরিকল্পনা বা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি জানান, সম্পদের প্রাপ্যতার ওপর এ কৌশলে বর্ণিত কার্যক্রমসমূহের বাস্তবায়ন অগ্রাধিকার অনেকাংশে নির্ভর করবে।

সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল বাস্তবায়নে যে ছয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে, প্রথমত, জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক কর্ম-পরিকল্পনা প্রণয়নের বিষয়টি অনুসরণের জন্য কেন্দ্রীয় পরিবীক্ষণ কমিটির একটি উপ-কমিটি গঠন করা হবে। ক্লাস্টারভিত্তিক প্রথম দফায় সভাসমূহের সমাপ্তির পর এ উপ-কমিটি গঠন করা হবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলে প্রস্তাবিত পাঁচটি ক্লাস্টারের লিড মন্ত্রণালয়সমূহ আগামী তিন সপ্তাহের (চলতি সেপ্টেম্বর এর মাঝামাঝি পর্যন্ত) মধ্যে প্রতিটি ক্লাস্টারের সমন্বয় সভার আয়োজন করবে এবং রেকর্ড নোটস মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবে।

তৃতীয়ত, সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগকে কোন ক্লাস্টারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি তাদের উপযুক্ত ক্লাস্টারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি পর্যালোচনাক্রমে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। চতুর্থত, ক্লাস্টারসমূহে কোন অধিদফতর বা কর্তৃপক্ষের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলে তা বাদ দিয়ে কেবল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সামাজিক ভাতা ক্লাস্টারে, অর্থ বিভাগকে খাদ্য নিরাপত্তা ও দুর্যোগ সহায়তা ক্লাস্টারে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শিল্প মন্ত্রণালয়কে শ্রম বা জীবিকা ক্লাস্টারে এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে মানব সম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক ক্ষমতায়ন ক্লাস্টারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পঞ্চমত, সরকারী পেনশন অর্থ বিভাগের কর্ম-পরিধির আওতাভুক্ত হবে।

বেসরকারী পেনশন বিষয়ক কার্যক্রম ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের আওতাভুক্ত হবে। ষষ্ঠত, সভায় উত্থাপিত দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে সামাজিক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহের মাধ্যমে সমন্বিত দারিদ্র্যবিমোচন সংক্রান্ত ধারণাপত্র পর্যালোচনা এবং এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য কেন্দ্রীয় পরিবীক্ষণ কমিটির একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সভাপিতর দায়িত্ব পালন করবেন অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব এবং সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব। এ ছাড়া কমিটির সদস্যরা হলেন শিল্প সচিব, সচিব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব।

সূত্র জানায়, সভায় জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নে একটি সমন্বিত এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট আনফরমেশন সিস্টেম) প্রতিষ্ঠাক্রমে একক নাগরিক নিবন্ধন ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রয়োজন বলে মত দেয়া হয়। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব সভাকে অবহিত করেন যে, তার বিভাগের এই প্রকার সুবিধাভোগীদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য এমআইএস তৈরির কাজ চলমান আছে।

সুবিধাভোগী নির্বাচন দ্বৈততা পরিহারের ক্ষেত্রে এ বথ্য ভা-ার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। অর্থ বিভাগের গৃহীত কার্যক্রমে সমন্বয় সাধন করে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদানে উপযোগী এমআইএস স্থাপনে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক্সেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রামকে অনুরাধ করা যেতে পারে বলেও তিনি মত দেন।

সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম এ বিষয়ে জনকণ্ঠকে বলেন, জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল পত্রের লক্ষ্য হচ্ছে সকল যোগ্য বাংলাদেশীর জন্য এমন একটি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা দারিদ্র্য ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্যকে কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করবে এবং বৃহত্তর মানব উন্নয়ন, কর্মের সুযোগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তা ছাড়া আরও দক্ষতার সঙ্গে ও কার্যকরভাবে সম্পদের ব্যবহার, সেবা প্রদান ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হয়ে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কার সাধন, যা সমাজের চরম দারিদ্র্য ও সর্বাধিক ঝুঁকিগ্রস্ত সদস্যদের অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকরভাবে জীবনচক্রের বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবেলা করবে।

সূত্র জানায়, গত জুন মাসে অনুমোদন পাওয়া সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই কৌশলপত্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে বদলে যাবে সরকারের সামাজিক নিরাত্তা কর্মসূচী। সেই সঙ্গে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর এবং এ খাতে বিনিয়োগকে উৎপাদনমুখী করার উদ্যোগ রয়েছে। এই কৌশলপত্রের মাধ্যমে বর্তমান চলমান প্রায় ১৪৫টি কর্মসূচীকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা হবে। তাছাড়া আসবে ব্যাপক পরিবর্তন।

আসছে জীবনচক্রভিত্তিক সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী। নতুন কৌশলপত্রে যেসব বিষয় যুক্ত হচ্ছে সেগুলো হচ্ছে, অতি দরিদ্রদের জন্য ভিজিএফ, টিআর, কাবিখা ও বয়স্ক ভাতাসহ যেসব কর্মসূচী রয়েছে, সেগুলোর ধরন ও কৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়েছে। কৌশলপত্রে যে বিষয়টির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়েছে, তা হলো ‘লাইফ সাইকেল।’ জিইডি কৌশলপত্রে বলছে, ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে ‘লাইফ সাইকেল’ পদক্ষেপ ছাড়া কোন বিকল্প নেই। এ জন্য জন্ম থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মোট পাঁচটি লাইফ সাইকেল চালু করতে হবে।

অতিদরিদ্র, ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতিবন্ধী সবাইকে এই লাইফ সাইকেলে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রথমত, সারাদেশে শূন্য থেকে চার বছর বয়সী পর্যন্ত যেসব অতিদরিদ্র, প্রতিবন্ধী ও ক্ষতিগ্রস্ত শিশু এবং পরিবার রয়েছে তারা একটি সাইকেলে যুক্ত হবে এবং নির্দিষ্ট হারে ভাতা পাবে। দ্বিতীয়ত, পাঁচ থেকে ১৮ বছর বয়সী যারা রয়েছে, তাদের একটি নির্দিষ্ট হারে মাসিক ভাতা দেয়া হবে।

যদিও তারা এখন ১২০ টাকা করে পাচ্ছে। তৃতীয়ত, ১৯ থেকে ৫৯ বছর বয়সী যারা অতিদরিদ্র, ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতিবন্ধী, চতুর্থত, যাদের বয়স ৬০ থেকে ৮৯ তাদেরও নির্দিষ্ট হারে ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পঞ্চমত, যাদের বয়স ৯০ বছরের ওপরে তাদের মাসে কয়েক হাজার টাকা ভাতা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে কৌশলপত্রে। আর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকার যা নির্ধারণ করে দেবে তাই প্রযোজ্য হবে। সরকার এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।