১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চট্টগ্রামে ২২ ট্যানারির একটিও এখন নেই, চামড়া পাচারের শঙ্কা

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ দীর্ঘ প্রায় সাত দশক আগে গড়ে ওঠা ট্যানারি শিল্পের একটিও এখন আর চট্টগ্রামে চালু নেই। ফলে আসন্ন কোরবানির ঈদে পশুর চামড়া সরবরাহকারীদের জন্য বিষয়টি বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। বন্ধ হতে হতে সর্বশেষ যে দুটির অবস্থান ছিল পরিবেশ দূষণের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে সেগুলোও বর্তমানে বন্ধ। স্বাধীনতার পূর্বে ও পরবর্তী সময়ে মোট ২২ ট্যানারি কারখানা গড়ে উঠেছিল বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। শিল্পনগরী হিসেবে এ নগরীর বিকাশ পাকিস্তান আমলের শুরু থেকে। পরবর্তীতে দেশের স্বাধীনতার পরও এ শহরে বিভিন্ন ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দেশের সর্বপ্রথম একপোর্ট প্রসেসিং জোন প্রতিষ্ঠা হয়েছে এই চট্টগ্রামে। এরপর গড়ে উঠেছে

কর্ণফুলী এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন, কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন। বর্তমানে এক্সক্লুসিভ জোন খোঁজা হচ্ছে চীন, জাপান ও ভারতের জন্য। চীন ও জাপানের জন্য মীরসরাই ও আনোয়ারাতে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামীতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের জন্য সংযোগ স্থাপনে কর্ণফুলী টানেল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার জন্য মহেশখালীর সোনাদিয়াতে প্রতিষ্ঠা করার প্রাক-জরিপ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এটি একটি ব্যয়বহুল ও সময়বহুল বিধায় প্রক্রিয়াটি চলছে ধীরগতিতে। এছাড়া চট্টগ্রামে গড়ে উঠেছে বেসরকারী পর্যায়ে আরও বিভিন্ন শ্রেণীর শিল্প কারখানা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ট্যানারি শিল্পের জন্য এ নগরীতে নেমে এসেছে মারাত্মক বিপর্যয়। অথচ বৃহত্তর চট্টগ্রামে পশুর চামড়ার সরবরাহের প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে ব্যাপক। কোরবানির পশু জবাই চট্টগ্রামেই সবচেয়ে বেশি হয়। কিন্তু সেই পাকিস্তান আমল থেকে প্রতিষ্ঠিত ট্যানারিগুলো ধুঁকতে ধুঁকতে একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে। সর্বশেষ যে দুটি চালু ছিল সেগুলোও পরিবেশ দূষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে পরিবেশ অধিদফতরের নির্দেশে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া সরকার ঢাকায় বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত ট্যানারিগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামে এ শিল্পের বিকাশে আরও বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্যানারি শিল্প মালিক ও চামড়া ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার অভাবে এ শিল্পে ধস নেমেছে চট্টগ্রামে। ব্যাংক ঋণ সুবিধার ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ততা, পরিবেশ দূষণের অভিযোগ এবং মৌসুমে প্রয়োজনীয় চামড়ার সরবরাহ না থাকাসহ বাজারমূল্য এবং রফতানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা আবর্তিত হওয়ায় এ শিল্পের দুর্দশার অন্যতম কারণ। চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী ও কালুরঘাট এলাকায় এক সময় ট্যানারি শিল্পের যে জমজমাট কর্মকা- গড়ে উঠেছিল এখন তা কেবলই অতীত। অথচ প্রতিবছর বৃহত্তর চট্টগ্রামে পশুর চামড়ার পরিমাণ বাড়ছে। এ সব চামড়া বিভিন্নভাবে ঢাকায় যেমন চলে যায়, তেমনি চোরাপথে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে পাচার হয়ে যায়। এবারও ধারণা করা হচ্ছে ভারত এবং মিয়ানমারে বিপুল চামড়া পাচার হয়ে যেতে পারে। কেননা রাজধানী ঢাকায় ট্যানারি শিল্পগুলোর অবস্থানও তেমন সুখকর নয়। প্রতিবেশী দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে চামড়া পেয়ে যেখানে তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠান আধুনিকতার সংস্পর্শে চলে যাচ্ছে সেখানে এ শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশ হিসেবে এর করুণ হাল নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে। ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে, ট্যানারি শিল্প বছরের পর বছরজুড়ে এক ধরনের অবহেলা ও প্রশাসনের মাত্রাতিরিক্ত নজরদারির কবলে পড়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পর তা লাভজনক না হলে এমনিতেই মালিকরা হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এরপর প্রশাসনের অহেতুক নজরদারি ও নানা ধরনের বাধা ধরা নিয়মের গ্যাঁড়াকলে পড়ে ট্যানারি শিল্প চট্টগ্রামে বিপর্যয়কর অবস্থায় নিপতিত হয়েছে। এ থেকে পরিত্রাণের সুযোগ এখনও বিদ্যমান। তবে এর জন্য সরকারকে যেমন এগিয়ে আসতে হবে, তেমনি এগিয়ে আসতে হবে অর্থলগ্নি সংস্থাগুলোকেও। ঢাকায় ট্যানারি শিল্প একই জায়গায় করার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ওই ধরনের কোন উদ্যোগ চট্টগ্রামে নেই। ফলে ট্যানারি শিল্পের অস্তিত্ব এই বাণিজ্যনগরী থেকে এক প্রকার বিলীন হওয়ার পথে। অথচ কাঁচামালের সরবরাহ এই চট্টগ্রামে বেশি হলেও তা যোগানের জন্য প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব আর থাকছে না।