২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বই পড়া এক বিবর্ণ অধ্যায়

  • শাফাত রেজা অন্তু

ফেলে আসা মধুর অতীত প্রতিটি মানুষের মনেই এক অন্যরকম অনুভূতির সঞ্চার করে। সেই অনুভূতি পলঅনুপলে জমে থাকা ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে যখন ভোরের আলোর মতো স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি জীবনের অনুষঙ্গ এসে ভিড় জমায় স্মৃতির আয়নায়, তখন কখনও কখনও মন হয়ে যায় বিষন্ন। আবার আনন্দেও ভরে ওঠে হৃদয়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মধুরিমা বিজড়িত অবগাহনের অতলচারী স্পন্দন। অতীত মানেই ভিন্ন আবেশ আর আমেজের মোড়কে ছাওয়া এক অনাবিল প্রিয়তম মুহূর্তের অনিঃশেষ জ্যোৎ¯œাঙ্কিত ধু ধু প্রান্তর। যে প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকে প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভুবন। তেমনি এক ভুবন হলো পাঠচক্রের ভুবন। যে ভুবনের দিগন্তে আজও জ্বলজ্বল করে জ্বলছে ছাত্র জীবনে নবেল, উপন্যাস, থ্রিল, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ পাঠের এক অমোঘ প্রহর। কিন্তু সেই পাঠচক্র কিংবা বই পড়ার অভ্যেসটা আজ আর আগের মতো জমাট বাঁধা ভালো লাগার নক্ষত্রপুঞ্জের আদলে হৃদয়ের গহীনে তরঙ্গ তুলে উদ্বেল করে না। এক সয়ম- অর্থাৎ গত দুই দশক আগেও দৈনন্দিন জীবনে- বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে বই- ম্যাগাজিন পড়ার একটা প্রচলন ছিল অত্যন্ত গভীরভাবে। পড়ার তালিকায় ছিল মাইকেল মধুসুধন, রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে কাজী নজরুল, জীবনানন্দ, জসীমউদ্দীন, তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকুমার রায়, বুদ্ধদেব বসু, সমরেশ বসু, সত্যজিৎ রায়, আহ্সান হাবীব, শামসুর রাহমান, আল মাহ্মুদ, রশীদ করিম, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, বিমল মিত্র, সৈয়দ শামসুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী, মাহমুদুল হক, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, আশাপূর্ণা দেবী, শীর্ষেন্দু মুখপাধ্যায়, সুনীল গাঙ্গুলি, শক্তি চট্যোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথসহ কত শত লেখক-লেখিকার কবিতা, গল্প, উপন্যাস। একটা সময় ছিল যখন সাধারণ পাঠকের কাছে রোমেনা আফাজের ‘দস্যু বনহুর’ ছিল এক অমৃত সিরিজ উপন্যাস। তেমনি কাজী আনোয়ার হোসেনের গোয়েন্দা সিরিজ ‘মাসুদ রানার’ জনপ্রিয়তার কথা তো এক প্রজন্ম আগেও ছিল কিংবদন্তি তুল্য। কবিতাসাহিত্য, কথাসাহিত্য, নাট্যসাহিত্যের প্রতি যে টান অনুভব করত এক প্রজন্ম পূর্বের তারুণ্য ও যুব সমাজ। সেখানে আজ যায়গা করে নিয়েছে কম্পিউটার, মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেস্বুক, টুইটার, ইউটিউবের মতো সোস্যাল মিডিয়া। এই প্রজন্মের তারুণ্যের কাছে বইয়ের চেয়ে একরত্রি মোবাইল মনিটরই হয়ে উঠেছে সর্বাধিক জনপ্রিয়। সঙ্গে আছে বিদেশী অসংখ্য টিভি চ্যানেল। বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজে গত তিনদশক আগেও যে ব্যক্তিগত লাইব্রেরি গড়ে তোলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যেত। সেখানে ঠাঁই পেয়েছে কম্পিউটার আইটেম, প্যাডসহ প্রযুক্তির উৎকর্ষের সর্বশেষ সংযোজন। সময়ের প্রয়োজনেই আজ সবার কাছেই হাইটেক সিস্টেমের গ্রহণযোগ্যতা অপরিসীম। কিন্তু এর প্রেক্ষিতে কী মনটা ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে উঠছে না। প্রকৃতি, নদী, নৌকো, জোনাক-পোকার স্বর্ণালী ছোঁয়া, জ্যোৎ¯œা ভেজা কুয়াশাচ্ছন্ন রাত্রির মায়াবী জাদুকরী দৃশ্যের বর্ণনা, নিসর্গের গভীর ব্যাঞ্জনা কবিতা-উপন্যাসে যেভাবে স্বমহিমায় ফুটে ওঠে।

তা-কি প্রযুক্তির নীল মনিটরে জীবন্তরূপে পাওয়া যাবে। বাংলার অপরূপ সবুজ গ্রামের মেঠো পথ, খোলা প্রান্তÍর, বিল, মাঠ, দেবদারু, শিরিষ, বট, সেগুন, হিজলের সুবিশাল ছায়া আর বুনো ফুলের ছবিটা যে উপন্যাস, গল্প, কবিতার ক্যান্ভাসে লেখকরা সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন- এই প্রজন্ম দিন-দিন সেসব বর্ণিল আনন্দঘন ক্যান্ভাস থেকে দূরে, বহুদূরে অবস্থান করছে। শুধুমাত্র একুশের বইমেলাতেই নগর কেন্দ্রিক পাঠকের দেখা মেলে বছরে একবার ফেব্রুয়ারিতে। এরপর তারুণ্য ফিরে যায় সেই ছোট্ট পরিসরের ফাইবারের স্ক্রিনে। আর অবসরে টিভি চ্যানেলে। বই সেখানে অনুপস্থিত। একটি জাতির জন্য বই পড়ার অভ্যেস এক মৌলিক বিষয়। কোন কোন পাঠক অনলাইনে, ইন্টারনেটে কবিতা, গল্প, উপন্যাস পড়েন না-তা-নয়। কিন্তু ছাপার অক্ষরে একটা বই বুকের ওপর ফেলে কিংবা কোলের ওপর রেখে পড়ার মজাটাই যে আলাদা- সে কথা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। সেটা বোঝেন তারা-যারা তাদের ছাত্রজীবনে অভিভাকের চোখ ফাঁকি দিয়ে-গভীর রাত পর্যন্ত চুপি চুপি শরৎচন্দ্রের দেবদাস, গৃহদাহ, চরিত্রহীন পড়তে পড়তে বেদনায় নিমজ্জিত হয়েছেন। পকেটে দশটা টাকা হলেই একটা প্রিয় বই কেনার আকাক্সক্ষা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গোনার ধারা আজ একেবারেই বিলুপ্ত। একসময় শহর-গ্রামে-গঞ্জের বইয়ের দোকানের চেয়ে এখন সেলফোন, সিম, মোবাইল অপারেটর, বিকাশ কেন্দ্র, ফ্ল্যাক্সিলোডের দোকানের সংখ্যাই বেশি। জ্ঞান আহরণের যায়গাগুলো এত সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে দিনে দিনে। যা নিয়ে অভিভাবকরাও আজ শঙ্কিত। একসময় রেলস্টেশন, টার্মিনালে একাধিক বুকস্টলের ছবির কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। সে সব বুকস্টলের ধারে কাছেও আজকাল কেউ ঘেঁষে না। দূরপাল্লার জার্নিতে অবসরের সঙ্গী যেখানে ছিল বই, সেখানে এখন মোবাইলের অবস্থান সহস্রগুণ বেশি। বই পড়াটা ক্রমাগত স্মৃতির অনুষঙ্গ হয়ে পড়ছে। হয়ে পড়ছে স্মৃতি রোমন্থনের বিবর্ণ অধ্যায়।

মডেল: মনির