১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত খুনীদের প্রত্যাবর্তন প্রেক্ষিত কানাডা সুপ্রীমকোর্টের আদেশ

  • মোজাম্মেল খান

জাতীয় শোক দিবসের বিভিন্ন আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতম আসামি, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে বিভিন্নজন বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে কানাডায় প্রচলিত আইন সম্পর্কে ধারণা দিতেই এ লেখার আয়োজন।

কয়েক বছর আগে ঢাকার ইংরেজী দৈনিকের কয়েকটি সংখ্যায় কানাডা থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত খুনীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। পরবর্তীতে বাংলাদেশের তদানীন্তন আইনমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কানাডা সফরের পর এদেশের কিছু পত্রিকায় টরেন্টোতে পালিয়ে থাকা আত্মস্বীকৃত খুনী নূর চৌধুরীকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তরের আইনী জটিলতা নিয়ে কয়েকটা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। একইভাবে বছরখানেক আগে ঢাকায় কানাডীয় হাইকমিশনার বাংলাদেশের তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে যে দেশে মৃত্যুদ- প্রচলিত আছে সেখানে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত কোন অপরাধীকে ফেরত পাঠনোর অনুরোধ নাকচ করে দিয়েছেন।

নিবন্ধগুলোতে যে দেশে মৃত্যুদ- প্রচলন আছে সেদেশে কানাডা থেকে কোন ফেরারিকে বহিষ্কারের আইনগত জটিলতা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নিবন্ধগুলোতে মূলত দুটি প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, কানাডা ইমিগ্রেশন ও রিফুজি বোর্ডের একটা আদেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেটাতে বলা হয়েছে, ‘যে সব দেশে বিচারে সম্ভাব্য মৃত্যুদ- দেয়া হতে পারে সে সব দেশে কোন অভিযুক্তকে ফেরত পাঠানোর পূর্বে ঐ সরকারের কাছ থেকে আশ্বাস নিতে হবে যে, বিচারে মৃত্যুদ- দেয়া হলেও সেটা কার্যকর করা হবে না।’ দ্বিতীয়ত, ২০০১ সালে দেয়া কানাডার সুপ্রীমকোর্টের একটা আদেশের উল্লেখ করা হয়েছে, যেটাতে ‘সরকারকে, বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া, কোন সন্দেহভাজন খুনীকে যে সব দেশে মৃত্যুদ-ের আইনী ব্যবস্থা বিদ্যমান, সে সব দেশে বহিষ্কার না করা।’

বর্তমান নিবন্ধ উপরোক্ত দুটি আদেশের আওতা এবং প্রেক্ষিত এবং সেগুলো কতটুকু সংশ্লিষ্ট ফেরারির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সেটা বিশ্লেষণেরই এক প্রচেষ্টা। প্রথমত, ইমিগ্রেশন ও রিফুজি বোর্ড একটা স্বাধীন প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল। ইমিগ্রেশন এবং রিফুজি সংক্রান্ত ব্যাপারে এই বোর্ড সাধারণত যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এই বোর্ডে রিফুজি মর্যাদার জন্য নূর চৌধুরীর আবেদন পর পর চারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এইদিক দিয়ে বিচার করলে ইমিগ্রেশন ও রিফুজি বোর্ডের বহিষ্কার না করার আদেশটা অনেকটা স্ববিরোধী, যেহেতু আইনগত বৈধতা ছাড়া এদেশে কারুরই বাস করার অধিকার নেই। উপরন্তু ইমিগ্রেশন ও রিফুজি বোর্ড কোন বিচারিক আদালত নয়; তাই এর দেয়া আদেশ বা পর্যবেক্ষণ সরকারের জন্য অবশ্য পালনীয় নয়। এর যে কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশনমন্ত্রী, জননিরাপত্তামন্ত্রী বা আবেদনকারী ফেডারেল কোর্টে বিচারিক পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবেন।

দ্বিতীয়ত, ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেয়া কানাডিয়ান সুপ্রীমকোর্ট আদেশ (এসসিআর ২৮৩) কোন নিঃশর্ত আদেশ নয়; এটা প্রকৃত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করতে হবে। এ মামলার একদিকে ছিলেন কানাডার বিচারমন্ত্রী এবং অন্যদিকে ছিলেন বার্নস এবং রাফে, যাদের সঙ্গে ইন্টারভেনর হিসেবে ছিল এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ঐ দুই ব্যক্তিকেই থ্রি কাউন্টস অব এ্যাগ্রিভেটেড ফার্স্ট ডিগ্রী মার্ডারের অভিযোগে বিচার করার জন্য ওয়াশিংটন স্টেটে ফেরত দেয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে এদের মৃত্যুদ- বা প্যারোল ছাড়া যাবজ্জীবন সাজা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ওরা দু’জনই ছিলেন কানাডার নাগরিক এবং তাদের বিরুদ্ধে রাফের নিজের বাবা, মা এবং বোনকে তাদের নিজস্ব বাড়িতে হত্যা করার অভিযোগ আনা হয়েছিল। ১৯৯৪ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এদের ওয়াশিংটন স্টেটে ফিরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে।

কানাডার বিচারমন্ত্রী অভিযুক্তদের বিশেষ অবস্থা এবং ক্রাইমের গুরুত্ব বিবেচনায় এনে প্রত্যাবর্তন আইনের ২৫ অধ্যায়ে দেয়া ক্ষমতাবলে আমেরিকার সঙ্গে কানাডার প্রত্যাবর্তন চুক্তির ৬ নম্বর ধারা, যাতে মৃত্যুদ- দেয়া যাবে না কিংবা দেয়া হলেও সেটা কার্যকর করা হবে না ধরনের আশ্বাসের কথা বলা হয়েছে, উপেক্ষা করে দুই অভিযুক্তকে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের আদেশ দেন। প্রত্যাবর্তন আইনের ২৫ অধ্যায়ে বিচারমন্ত্রীর নিজস্ব বিচার-বিবেচনাকে বিরাটভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে- তিনি কিভাবে বা কোন্্ শর্তে কোন্্ ফেরারিকে সমর্পণ করতে পারবেন। প্রত্যাবর্তন চুক্তির ৬ নম্বর ধারা মোতাবেক আশ্বাস চাওয়া বা না চাওয়ার ব্যাপারে বিচারমন্ত্রীর অবস্থানের ব্যাখ্যা হলো- নিয়মিতভাবে সব ক্ষেত্রেই মৃত্যুদণ্ড রহিত করার আশ্বাস চাওয়ার প্রয়োজন নেই, শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রেই সেটা করা উচিত এবং কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে সেটা করা উচিত সেটা নির্ধারণের এখতিয়ার রয়েছে বিচারমন্ত্রীর।

সুপ্রীমকোর্টের মতানুসারে যদিও এটা সাধারণভাবে মন্ত্রীর আওতায়, আদালতের নয়, প্রত্যাবর্তন চুক্তির বিদ্যমান কোন্ বিবেচনার গুরুত্ব কতটুকু, সম্ভাব্য মৃত্যুদ-ের বিধান এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। যার ফলে সুপ্রীমকোর্টের পর্যবেক্ষণ হলো, ‘মৃত্যুদ- একটা বিচারিক ইস্যু, এটা খুব কমই চলিঞ্চু এবং আধিকারিক ব্যাপার’। চার্টার অব রাইটস এ্যান্ড ফ্রিডমসের ৬ নম্বর অধ্যায়ের উল্লেখ টেনে সুপ্রীমকোর্টের অভিমত হলো, ‘বিশেষ ব্যতিক্রম’ ব্যতীত, নিঃশর্ত হস্তান্তরে মৃত্যুদ- কার্যকর না করার আশ্বাস নেয়া সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।

অবশ্য ‘বিশেষ ব্যতিক্রম’ বলতে কোন্ অবস্থা বোঝায় সেটার কোন ব্যাখ্যা সুপ্রীমকোর্ট প্রদান করেননি। সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী এটাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বোঝানো হয়েছে। অধিকন্তু চার্টারের ৬ (১) নম্বর ধারা অবশ্য শুধু কানাডার নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেটাতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ‘কানাডার প্রত্যেক নাগরিকের কানাডাতে প্রবেশের, অবস্থানের এবং ত্যাগের অধিকার রয়েছে।’ সম্ভবত সে বিধান বিবেচনায় রেখে ১৯৯১ সালে সুপ্রীমকোর্ট মৃত্যুদ- মওকুফের আশ্বাস ছাড়াই নন-কানাডিয়ান কাইন্ডলার এবং উঁ নামক দু’জন অভিযুক্তের হস্তান্তরকে বৈধ ঘোষণা করেন (এসসিআর ৭৭৯ এবং এসসিআর ৮৫৮)। সেক্ষেত্রে সুপ্রীমকোর্টের অভিমত ছিল, ‘যদিও কানাডা নিজে মৃত্যুদ-ের বিধান রহিত করেছে; কিন্তু অন্য সমস্ত দেশের বিধানকে কানাডার অবশ্যই সম্মান করা উচিত।’

বিচারমন্ত্রীকে প্রত্যাবর্তন আইনের ২৫ অধ্যায়ে নিজস্ব বিচার-বিবেচনা অনুসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার যে অবাধ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সেটা শুধু প্রত্যাবর্তন চুক্তির বিদ্যমানতার ওপরই নির্ভর করে এবং সে ধরনের চুক্তি নেই এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সঙ্গে কানাডার। অবশ্য প্রত্যাবর্তন ত্বরান্বিত করার জন্য বাংলাদেশ হয় কোন দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা বা ব্যক্তি-নির্দিষ্ট কোন চুক্তি করতে পারে, যেটা ১৯৯৯ সালে কানাডার প্রত্যাবর্তন আইনের সংশোধনীতে সন্নিবেশিত হয়েছে। উপরোক্ত চুক্তিতে ‘আশ্বাসের ধারা’ সন্নিবেশিত করার কোন বাধ্যবাধকতা নেই, যেহেতু ১৯৯১ সালের দুটি পৃথক সুপ্রীমকোর্ট আদেশে নন-কানাডিয়ান ফেরারিদের প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে এটাকে পরোক্ষভাবে অপ্রয়োজনীয় হিসেবেই স্বীকার করা হয়েছে। উপরন্তু কানাডিয়ান ফেডারেল কোর্ট নূর চৌধুরীর আপীল প্রত্যাখ্যান করে যে রায় দিয়েছে সেটাতে সুস্পষ্টভাবে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের শিশু এবং নারী সদস্যদের নৃশংস হত্যাকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে লিপিবদ্ধ করেছে। ২০০১ সালের সুপ্রীমকোর্ট আদেশে যাকে ‘বিশেষ ব্যতিক্রম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিশেষে এটা সম্পূর্ণভাবে বিচারমন্ত্রীর বিচার-বিবেচনা-সিদ্ধান্তের ওপরই বেশিরভাগ নির্ভরশীল, যেটা বেশিরভাগই রাজনীতিনির্ভর, সুপ্রীমকোর্টের নতুন কোন আদেশের ওপর নয়। বিচারমন্ত্রীর বিচার-বিবেচনা-সিদ্ধান্ত এই মহান অনুকরণীয় গণতন্ত্রের নাগরিকেরা, বিশেষ করে যারা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত, বহুলাংশে প্রভাবান্বিত করার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশের যে সব কর্মকর্তা এ উদ্দেশ্যে কানাডায় এসেছেন তারা কেউই কোন বাংলাদেশী কানাডিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। অথচ এই বাংলাদেশী কানাডিয়ানরাই ২০০৭ সালে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত মহিউদ্দিনের এদেশে আশ্রয় পাওয়ার প্রচেষ্টাকে নস্যাত করে দিয়েছিল, কোন সরকারী প্রচেষ্টা নয়। এমনকি যে ব্যক্তি (এ নিবন্ধকার নিজে) নূর চৌধুরীকে হস্তান্তর করায় আইনী সহায়তা দেয়ার জন্য ল’ফার্ম নিয়োগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে তার সঙ্গেও সফরকালে কোন কর্তাব্যক্তি যোগাযোগ করেননি। এ সব কর্তাব্যক্তি দেশে বসে যে সব বক্তব্য দিয়ে চলেছেন তার সঙ্গে বাস্তবতার কোন সম্পর্ক নেই। আইনী প্রক্রিয়া চালু করার জন্য যে প্রাসঙ্গিক পূর্ব অবস্থার প্রয়োজন (যেটা আমি সবিস্তারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বস্ত চ্যানেলে জানিয়েছিলাম এবং আর একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে গত বছরের জুলাই মাসে ঢাকায় তারই অনুরোধে সাক্ষাত করে সবিস্তারে উপস্থাপন করেছিলাম) সে অবস্থার সৃষ্টিও করা হয়নি, অগ্রসর তো দূরের কথা। মনে হয় মন্ত্রী মহোদয় এবং নেতা-নেত্রীরা হাওয়া থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সমন্বয়হীন বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। এ প্রেক্ষিতেই বলব, নূর চৌধুরীকে ফেরত পাওয়ার বিষয়ে সরকারের সঠিক কোন পদক্ষেপের অভাবে আমরা ক্রমশই লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।

লেখক : কানাডা প্রবাসী অধ্যাপক