২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুর্জনেরে হানো

ইউনিসেফ যখন পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলছে, বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর হার কমছে, তখন দেশে উন্মত্তদের হাতে নির্যাতন চালিয়ে শিশু হত্যার মোচ্ছব চলছে যেন। পিটিয়ে হত্যাসহ শিশুদের অভিনব পন্থায় জীবন হরণ করার কাজটি নিরূপদ্রবভাবেই চলছে। তবে এদের প্রতিরোধ করার কাজটিও স্থবির। উল্লাসে মত্ত হয়ে দল বেঁধে শিশুর ওপর নির্যাতন চালিয়ে হত্যার ভিডিও দৃশ্য ইন্টারনেটে জুড়ে আছে। মানুষ নামধারীদের উদ্দাম উদ্যত ব্যবহার, আগ্রাসী মনোভাব কোন্ স্তরে পৌঁছালে সমাজে খুনীর উৎপাদন হচ্ছে, তা ভাববার বিষয়। এই নরাধমরা সমাজের শান্তি বিঘিœত করছে, আতঙ্কের বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে। দেশকে উচ্ছন্নে নিয়ে যেতে চায় ওরা। বহাল করতে যায় অন্ধকারের কালো ছায়া। শিশুদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা শুধু নয়, একেবারেই জীবননাশ করাই ওদের লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। শিশু হত্যার ঘটনা হিস্টিরিয়ার মতো ছড়িয়ে পড়ছে। আর তাতে আক্রান্ত হচ্ছে দেশবাসী। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজধানীসহ দুর্গম গ্রামাঞ্চলেও নির্যাতন চালিয়ে শিশুকে অবলীলায় মেরে ফেলার ঘটনা ঘটছে। যার কিছু গণমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত হলেও অনেক ঘটনাই রয়ে যায় অজানা ও অপ্রকাশিত। শিশুদের ওপর এই যে নৃশংস কায়দায় নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, তা সকল নির্যাতনের চিত্র ও মাত্রাকে হার মানিয়ে দিচ্ছে। সামান্য এবং তুচ্ছ কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের ওপর ঘটছে নৃশংস হত্যাকা-। আকস্মিকভাবে দেশে শিশু হত্যার ঘটনা এমনভাবে বেড়ে গেছে যে, কে কিভাবে, কত পদ্ধতি বা কায়দায় নির্যাতন চালিয়ে শিশুকে হত্যা করবে, তার অমানবিক বিকারগ্রস্থতার প্রতিযোগিতায় নেমেছে কথিত মনুষ্যরূপী নরাধমরা। এক একটি ঘটনা যেমন লোমহর্ষক, তেমনি ভয়ঙ্কর। এসব লিপিবদ্ধ হচ্ছে নিষ্ঠুর সময়ের খেরোখাতায়। অমানবিকতার ও মনোবিকারের চূড়ান্ত নিদর্শন এই ধারাবাহিক শিশু হত্যার কাল। নিষ্ঠুরতামূলক অপরাধের মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে যেভাবে, তা উদ্বেগজনক, চরমাঘাত। সমাজ, মনুষ্যত্ব ও মানবতার ওপর চরমাঘাত। সমাজে কেউ যদি কারও প্রতি সহমর্মিতার হাত আর না বাড়ায়, অন্যায়-অবিচার প্রতিরোধ না করে সহ্য করে যায়, তবে সমাজ কলুষিত হতে ও ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য। সমাজের সংহতি এবং ঐক্য অটুট রাখা ও মনুষ্যত্ববোধকে সবসময় জাগ্রত রেখে শিশু হত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই। সামাজিক অবক্ষয় যেমন, তেমনি নিষ্ঠুরতায় আক্রান্ত হচ্ছে সমাজ। অবস্থা যেমনই হোক, বাস্তবতা হচ্ছে, নিষ্ঠুরতাসম্পন্ন মানুুুুষের মানসিক গঠন তৈরি হয় এই সমাজের অন্দরেই। নিষ্ঠুরতার পেছনের কারণ অনেকটাই অনুধাবন করা যায়। নিষ্ঠুরতা হলো সহমর্মিতার অবক্ষয়। মানুষ তো নিষ্ঠুর হয়ে জন্মায় না। কিন্তু পরিবেশ তাকে নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে। সমাজে যেখানে অপরাধকে বিবেচনা করা হয়, ‘সাহস’ হিসেবে এবং অত্যাচারকে কখনও কখনও ‘পৌরুষ’ বলে প্রশংসিতও করা হয়। এই আত্মঘাতীমূলক মানসিকতা হতে বেরিয়ে আসার পথের সন্ধান দেবে কে। শিশু হত্যার বিচার না হওয়ায় এ ধরনের ভয়ঙ্কর হত্যাকা- দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। শিশুদের ওপর নৃশংস ঘটনাগুলো কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সংবিধানে শিশুর নিরাপত্তার কথা উল্লেখ রয়েছে। তাই রাষ্ট্র ও সরকারকে চুপ থাকলে চলবে না। দোষীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তির বিধান করা দরকার। একই সঙ্গে সামাজিক আন্দোলন ও গণমাধ্যমের ব্যাপক সচেতনতা দরকার। এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করতে হলে দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মকে সুন্দর একটি দেশ তথা পৃথিবী উপহার দিতে হবে। তাই রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়, ‘দুর্বলেরে রক্ষা কর, দুর্জনেরে হানো’। দেশকে দুর্জনমুক্ত করতে চাই দৃঢ় অঙ্গীকার।