১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসিন আলী

চলে গেলেন সৈয়দ মহসিন আলী- বীর মুক্তিযোদ্ধা, সমাজকল্যাণমন্ত্রী, সর্বোপরি এক উদার হৃদয় অকপট মানুষ। এটাকে অকালমৃত্যু বলাই সঙ্গত হবে। সাতষট্টি বছর চলে যাওয়ার মতো কোন বয়স নয়। প্রৌঢ়ত্বকে অতিক্রম করে তাঁর প্রাণবন্ত জীবনযাপন সতীর্থদের কাছে ছিল কৌতূহলের। কর্মপ্রিয়, সদাহাস্যোজ্জ্বল ও বন্ধুবৎসল মহসিন আলী তাঁর মন্ত্রণালয়ের কর্মীদের কাছে ছিলেন প্রিয় একজন মানুষ। মাত্র ক’দিন আগে ৩ সেপ্টেম্বর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। তাঁর অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় দুদিন পর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর তাঁর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে লাইফ সাপোর্ট খুলেও দেন চিকিৎসকরা। এ অবস্থায় সোমবার সকালে তিনি ইন্তেকাল করেন। এ সময়ে তাঁর সহধর্মিণী সৈয়দা সায়েরা মহসিনসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সৈয়দ মহসিন আলীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পীকার ও বিরোধীদলীয় নেতা শোক প্রকাশ করেছেন।

মুক্তিযোদ্ধারা হলেন দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান। মহসিন আলী ছাত্রাবস্থায় দেশের ডাকে সঠিক সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেছিলেন। মাত্র বাইশ বছর বয়সে রণাঙ্গনে যোগ দিয়ে তিনি বীরত্ব প্রদর্শন করেন, যা সহযোদ্ধাদের জন্য ছিল গর্বের ও প্রেরণার। সিলেট বিভাগ সি.এন.সি স্পেশাল ব্যাচের কমান্ডার হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন তিনি এবং একাধিকবার সম্মুখসমরে আহত হন। তিনি সেক্টরস কমান্ডার ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

মহসিন আলীর বর্ণাঢ্য জীবনের দিকে ফিরে তাকালে বিস্মিত হতে হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ছাত্র জীবনেই রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। মৌলভীবাজার পৌরসভা চেয়ারম্যান হিসেবে তিনবার নির্বাচিত হয়ে অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ করেন। ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে সংসদীয় কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার-৩ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং একই দিন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য ভারতের আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন রিসার্চ সোসাইটি তাঁকে ‘আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন স্মৃতি স্বর্ণপদক-২০১৪’ প্রদান করে এবং ‘হ্যালো কলকাতা’ নামে কলকাতাভিত্তিক একটি সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠান তাঁকে ‘নেহরু“সাম্য সম্মাননা-২০১৪’ পুরস্কারে ভূষিত করে।

খ্যাতিমান ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ মহসিন আলী ছিলেন বাংলাদেশ বেতারের শিল্পী, প্রগতিশীল, সংস্কৃতিমনা ও কাব্যানুরাগী। তিনি শুধু মন্ত্রীই ছিলেন না, তাঁর ছিল একটি কবিমন। তিনি তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের আভিজাত্য ছেড়ে প্রথাগত চিন্তাচেতনার উর্ধে উঠে মিশতে পেরেছিলেন সাধারণের সঙ্গে। গত ১ সেপ্টেম্বর তিনি শেষবারের মতো এসেছিলেন সমাজসেবা অধিদফতরে সে¦চ্ছাসেবী সংস্থার মাঝে অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠানে। তিনি সঙ্গীত ভালবাসতেন। অনুষ্ঠানে তাঁর গীত সর্বশেষ গান ছিল “ধনধান্য পুষ্পভরা/আমাদের এই বসুন্ধরা/তাহার মাঝে আছে দেশ এক /সকল দেশের সেরা... । আমরা তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক জানাই। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। প্রয়াত মন্ত্রীর শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গ ও স্বজনদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা।