১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ বিশ্বায়নে নারী সমাজ

  • আবুল হাসান ;###;খন রঞ্জন রায়

আমাদের পরিবারগুলোতে নারী-পুরুষের বৈষম্য দেখা যায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, বিজ্ঞান, বিনোদনের ক্ষেত্রে পুরুষের অগ্রাধিকার থাকে এবং নারীরা বরাবরই এসব বিষয়ে অগ্রাহ্যের শিকার হয়। বাংলাদেশের নারীদের বলা হয় দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতম। জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দারিদ্র্যের বিভিন্ন মাত্রা নির্ধারণের ভিত্তিতে নারী-পুরুষের সমতা, শিক্ষা ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে।

বিশ্বের সামগ্রিক উন্নতি ও অগ্রগতি সাধিত হয়েছে নারী-পুরুষের সমানুপাতিক ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে। সমাজ একটি দ্বিচক্রযানের মতো, যার পৃথক দুটি চাকা নারী ও পুরুষ। নারীরা শুধু সভ্যতাই নির্মাণ করেনি, তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় প্রেরণা ও সমর্থন পেয়ে পুরুষরা তাদের কাজে সফলতা অর্জন করেছে।

ব্যয়বহুল এই সময়ে সংসারের খরচ একার পক্ষে চালানো কঠিন। তাই পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ঘরের কাজের পাশাপাশি চাকরি করে বাড়তি উপার্জনের জন্য নানা কাজে যুক্ত হচ্ছেন নারীরা। এতে সংসারে আসছে উন্নতি আর নারীরা হচ্ছেন স্বাবলম্বী। উভয়ের যৌথ প্রচেষ্টার ফলেই পৃথিবী ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে ধাবিত হয়েছে। কোনকিছুই কারও একক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠেনি বরং সৃষ্টির প্রথম থেকে আজ অবধি প্রত্যেকে একে অন্যের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

গার্মেন্টসসহ অন্যান্য শিল্পে এখনও মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপনাকর্মীর অধিকাংশই বিদেশী। যে ধরনের জ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক সমাজ এখন তৈরি হচ্ছে সে ধরনের মানুষ আমাদের দেশে পাওয়া যায় না বলে বাইরে থেকে দক্ষ জনশক্তি আমদানি করতে হয়। একইভাবে চাহিদামতো শিক্ষা প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির যোগান যদি আমাদের হাতে থাকত, তাহলে আরমাও বিশ্বপরিম-লের মতো নারীদের প্রত্যাশিত কাজ খুঁজে পাওয়া সহজ হতো। কর্মময় জীবনের বাইরেও পরিবারের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করার ক্ষেত্রে একজন নারীকে একজন গবেষক, প্রশিক্ষক, সুষ্ঠু ক্রেতা, পথ প্রদর্শক ও সুষ্ঠু নাগরিকের ভূমিকা পালন করতে হয়। এজন্য তার যেসব গুণ থাকা প্রয়োজন তা হলো- কাজের ক্ষমতা ও ইচ্ছে, মিতব্যয়িতা, ধর্মশীলতা, শিক্ষা, সুরুচি, দূরদর্শিতা, প্রফুল্লতা এবং নিষ্ঠা ও উদারতা। গবেষণায় দেখা গেছে পেশা ও পণ্যভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা কোর্স অর্জনকারী নারীরা এসব গুণে গুণান্বিতা হন অধিক হারে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত, অবহেলিত গ্রামীণ মেয়েদের তাই এখন এক শ’ একটা সমস্যা নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। মেয়েরা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, মানবিক সবদিক থেকে শোষিত হচ্ছে, শাসিত হচ্ছে ও অসভ্যতার শিকার হচ্ছে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবকিছু শোষণ করছে গ্রামীণ মহিলাদের। শিক্ষা প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে গ্রামীণ নারীদের এগিয়ে চলার পথ দেখাতে হবে। দার্শনিকরা বলে গেছেন, গ্রাম না বাঁচলে শহর বাঁচবে না, রক্ষা পাবে না আমাদের সভ্যতা। আর এজন্য বিশ্বজুড়ে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছিলেন কিভাবে বাঁচানো যায় গ্রামকে। গ্রামীণ নারীরা গ্রাম বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম শক্তি।

সমাজের সব প্রতিবন্ধী শিশু রাজধানী শহর ঢাকা ও বিভাগীয় শহরের বাইরে শিক্ষা প্রশিক্ষণ গ্রহণের ক্ষেত্রে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। নানাভাবে ব্যাহত হচ্ছে তাদের শিক্ষার অধিকার। শিশু ও কিশোরী, বয়োবৃদ্ধ, প্রতিবন্ধীদের রক্ষণাবেক্ষণ, ভরণপোষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা প্রদানে রয়েছে মারাত্মক অনিশ্চয়তা। প্রতিযোগিতাপূর্ণ এ বিশ্বে নারী শিক্ষায় কোন বৈষম্য থাকা বাঞ্ছনীয় নয়, যাবতীয় অর্থনৈতিক বিধি ব্যবস্থা ও কর্মকা-ে নারীদের যত বেশি সম্পৃক্ত করা যাবে পরিবার, দেশ ও জাতি তত বেশি তার সুফল পাবে। উন্নত দেশগুলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির বৈপ্লবিক বিকাশে নারীদের সম্পৃক্ততা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। পরিবার, সমাজ ও সভ্যতা সৃজনে নর-নারীদের সম্পৃক্ত করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

বিশ্ব এবং বাংলাদেশ সবখানেই অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। দেশের যথাযথ উন্নয়নে নারীর মেধা ও শ্রমশক্তির প্রয়োগ আবশ্যক। দেশের অর্ধেক মানুষের মেধা ও শ্রম অলস পড়ে থাকলে বা অব্যবহৃত থাকলে দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারীর আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন ও দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নারীর মেধা ও শ্রম ব্যবহারের জন্যই নারী উদ্যোক্তা শিক্ষা প্রয়োজন। যেখানে অধিকাংশ নারী আধুনিক প্রয়োজনভিত্তিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবে।

দেশের শ্রমবাজারে ১৯৮৩ সালে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল শতকরা ৮ ভাগ। বর্তমানে তা ৩৬ ভাগের বেশি। শ্রমবাজারে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ ও প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী নিশ্চিত করা গেলে দেশের জিডিপি কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।