২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঈদ-উল-আযহা সামনে, নির্ঘুম কামারপাড়া

ঈদ-উল-আযহা সামনে, নির্ঘুম কামারপাড়া
  • দা বঁটি ছুরি বানানোর ব্যস্ততা

এস এম জসিম উদ্দিন ॥ কোরবানির ঈদের আর বেশিদিন বাকি নেই। ঈদ-উল-আযহার বাকি মাত্র ৯ দিন। ঈদ সামনে রেখে বিভিন্ন জেলার কামাররা এখন খুবই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। অনুরূপভাবে ব্যস্ত সমস্ত কামারপাড়ার কর্মকাররাও। তাই সারাদেশে একই অবস্থা। ফলে পাল্টে গেছে উত্তরবঙ্গের ঠাকুরগাঁওয়ের কামারপাড়ার চিত্রও। এখানে কেউ ভারি হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে দগদগে লাল লোহার খ-, কেউবা দিচ্ছে পশু জবাই করার যন্ত্রে শাণ, কেউ আবার আইতনা দিয়ে কয়লার আগুনে বাতাস দিয়ে সাহায্য করছে সহকর্মীদের। সবারই হাত, মুখ, পা কালিতে থাকছে ভরা। তীব্র গরমে শরীর ঘামছে দরদরিয়ে। কিন্তু বৈদ্যুতিক কিংবা হাতপাখার বাতাস নেয়ারও কোন সুযোগ মিলছে না। বেশির ভাগেরই কাপড় অর্ধাঙ্গজুড়ে, পরনের লুঙ্গির চেহারা ময়লায় বেশ ভারি হয়ে থাকছে। তার ওপর গায়ের পরিধান অগোছালভাবে থাকলেও কাউকেই যেন ক্লান্ত করতে পারছে না কাজ। তীব্র ব্যস্ততার চাপে ‘ক্লান্তি’ কারও কাছেই যেন ঠাঁই পায় না। এমনই অবস্থা চলছে এখন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শিবগঞ্জ এলাকার কামারপাড়াসহ অন্য কামারপাড়াগুলোতেও। দিনরাত ওঠানামা করছে কামারের হাঁপর।

ঈদের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কামারপাড়ার ব্যস্ততা। আরাম-আয়েশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সময়মতো খাদ্যগ্রহণ, সহকর্মীদের সঙ্গে গল্পগুজব, সবই এখন বন্ধ। কেবল সহকর্মীর সঙ্গেই চলছে একটু-আধটু কথা, তাও কাজের ফাঁকে। আর কিছু কথা হয় ক্রেতার সঙ্গে। কোন ক্রেতা দিয়ে যাচ্ছেন অর্ডার, কেউ কিনছেন রেডিমেট। আর কারোবা দাম-দরে না মেলায় নিচ্ছেন বিদায়। কিন্তু কামাররা কাজ করছেন অবিরাম।

ঠাকুরগাঁও শহরের বিভিন্ন কামারদের সঙ্গে কথা হয়; সবাই প্রচুর ব্যস্ততার কথা জানালেন। তারা বললেন, সারাবছরই কামারদের তৈরি সামগ্রীর চাহিদা থাকে। তবে কোরবানি ঈদের সময় চাহিদা থাকে খুব বেশি। তাই সে অনুযায়ী কাজ করতে হয় দীর্ঘ সময়। কোন কোন সময় ১৬-১৮ ঘণ্টা টানা পরিশ্রম করেও অর্ডারের সময় অনুযায়ী মাল দিতে হিমশিম খেতে হয়।

শিবগঞ্জ বাজারের কারিগর নজরুল ইসলাম জানান, প্রতিবছর কোরবানির ঈদ-ই থাকে মূল টার্গেট। সারাবছর ব্যবসার বড় লভ্যাংশটা এ সময়ই উঠে আসে। তবে তিনি বেশ হতাশার কথা শোনালেন কয়লা নিয়ে। ‘লোহার দাম সহনশীল পর্যায়ে থাকলেও, কয়লার দাম বেগতিক। গতবছর প্রতিকেজি কয়লা ৪৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকায় কিনলেও এবার ৮শ’ থেকে ৮শ’ পঞ্চাশ টাকায় কিনতে হচ্ছে।’ গড়েয়া বাজারের কারিগর নুরুল আমিন বলেন, এখনও দা-ছুরি বিক্রির ধুম পড়েনি। তবে আমেজ পড়েছে। কিছু দিনের মধ্যেই কেনাবেচার বাজার পুরোপুরি জমে উঠবে বলে তিনি জানালেন।

এখন কামারপাড়ায় গেলেই দেখা যায়, কোরবানির পশু জবাই ও মাংস-হাড় কাটার জন্য হরেক রকমের বিভিন্ন দামের লৌহজাত সামগ্রী। কেউবা কারখানার পাশে বসিয়েছেন ছোট্ট দোকান। এসব দোকানে আকারভেদে বিভিন্ন দামের ছুরি, দা, চাপাতি, চাইনিজ কুড়াল বিক্রি হচ্ছে। এসব ইস্পাত ও কাঁচা লোহা দিয়ে তৈরি।

জানা গেছে, জবাইয়ের জন্য মাঝারি আকারের ছুরি ২শ’ থেকে ৫৫০ টাকা, বড় ছুরি ৫শ’ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত দাম ধরা রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে মাংস কাটার কিংবা চামড়া ছাড়ানোর ছোট ছোট ছুরি। এসব ছুরির আবার বিভিন্ন নামও রয়েছে।

খোচাবাড়ি হাটের কারিগর নলিনী মোহন্ত জানান, কস্তুরি ছুরি বিক্রি হয় ৩শ’ থেকে ৩শ’ ৫০ টাকা, কামেলা ১১০ থেকে ১৫০ টাকা এবং স্টিলের ছুরি ৫০ টাকা থেকে ৬০ টাকায়। এছাড়া যাঁদার ছুরিও রয়েছে। দাম ৫শ’ থেকে ৬ শ’ টাকা। বিভিন্ন আকারের পা যুক্ত দায়ের দাম ২শ’ থেকে ১ হাজার টাকা। আবার পা ছাড়া ২৫০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা। তবে বেশির ভাগ ব্যবসায়ীই চাপাতি বিক্রি করছেন কেজি দরে।

তিনি আরও জানান, চাপাতিতে লোহা বেশি লাগে। জানা যায়, কাঁচা লোহার তৈরি চাপাতির কেজি ২শ’ থেকে ৩৫০ টাকা, ইস্পাতের ৫শ’ থেকে ৬শ’ ৫০ টাকা। এছাড়া দেশীয় তৈরি চাইনিজ কুড়ালের দাম ৫৫০ টাকা থেকে ৭৫০ টাকার মধ্যে। কেবল রেডিমেট নয়, ক্রেতাদের চাহিদা অনুসারে অর্ডারের মাল সরবরাহ করেন কামাররা।

জয়নাল মিয়া নামে আরেক কারিগর বলেন, ‘কাস্টমার লোহা দিলে খালি মজুরিডা লই। আর আমরা লোহা দিলে মজুরির লগে লোহার দামডা যোগ দেই।’ এদিকে কামাররা রেডিমেট বিক্রি ও অর্ডারের পাশাপাশি করছেন মেরামতের কাজও। কাজ ভেদে মেরামত খরচ পড়ে ৩০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এসব বাজার ভেদে কোরবানির পশু জবাই করার সামগ্রীর দামের তারতম্যও রয়েছে। ব্যবসায়ী সামশুল আলম বলেন, সব এলাকার দর সমান না। কিছু এলাকার বাজারগুলোয় খরচ একটু বেশিই পড়ে।