১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আগামী পাঁচসালা পরিকল্পনার খসড়া চূড়ান্ত

  • আজ প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন;###;গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৭.২ শতাংশ;###;শিল্প খাতে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ বিশ্ব অর্থনীতি যখন আশা-নিরাশার দোলাচলে দোল খাচ্ছিল, সে সময় বাংলাদেশ অর্থনীতি ছিল শক্ত অবস্থানে। গত কয়েক বছর টানা ৬ শতাংশে ঘরে অর্জিত হয়েছে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি। এটি ছিল দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে সাফল্যের দিক। এমনকি বিশ্বব্যাংকও এ অবস্থার প্রশংসা করেছিল। কিন্তু মধ্য আয়ের দেশে যাওয়া স্বপ্ন পূরণে এখানেই আত্মতুষ্টিতে ভুগতে চায় না সরকার। ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিতে চায় এই উন্নয়ন। আর সেজন্য ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বৃত্ত ভাঙ্গার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরের (২০১৬-২০) জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (এনইসি) চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে আজ মঙ্গলবার এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে। তিনি সম্মতি দিলেই শেষ ধাপে পৌঁছে যাবে অনুমোদনের।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় প্রধানমন্ত্রীকে অবগতি ও পরামর্শ গ্রহণ সম্পর্কিত সভায় উপস্থিত থাকবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন, পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান ও পরিকল্পনা তৈরির দায়িত্বে নিয়োজিত পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলমসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবরা।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, এই সভাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা আমরা দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিকল্পনাটির খসড়া তৈরি করেছি। সর্বশেষ বিভাগীয় পর্যায়ে মতামত গ্রহণের জন্য বৈঠক করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পেলে আগামী অক্টোবরের প্রথমার্ধেই এই পরিকল্পনাটির চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এনইসিতে উপস্থাপন করা হবে।

জিইডি সূত্র জানায়, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন শুরুর বছরে অর্থবছর ২০১৬ তে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য হচ্ছে সাত শতাংশ, ২০১৭ অর্থবছরে সাত দশমিক দুই শতাংশ, ২০১৮ অর্থবছরে সাত দশমিক চার শতাংশ এবং ২০১৯ অর্থবছরে সাত দশমিক ছয় শতাংশ এবং অর্থবছর ২০ এ ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়ে শিল্প খাতে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল নেয়া হয়েছে। কেননা আগামী পাঁচ বছরে (২০১৬ থেকে ২০ সাল পর্যন্ত) গড় প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্জন করতে হলে এ বিষয়ে ড. আলম বলেন, গত পাঁচ বছরে চলমান ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ করতে অবশ্যই শিল্পের দিকে ঝুঁকতে হয়েছে। তার মানে এই নয় যে, কৃষিকে অবহেলা করা হয়েছে। কৃষি তার অবস্থানেই ছিল। কিন্তু শিল্প এগিয়ে গেছে দ্রুত, যা কৃষির পক্ষে সম্ভব নয়। তবে কৃষির বহুমুখীকরণের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়, যাতে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

আগামী পাঁচ বছরে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শিল্প (ম্যানুফেকচারিং) খাতে গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য হচ্ছে ১০ দশমিক আট শতাংশ। সেবা খাতে গড় প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ছয় দশমিক তিন শতাংশ। পাঁচ বছরে কৃষি খাতে গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে তিন দশমিক তিন শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প, সেবা ও কৃষি এই তিন খাত মিলে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগামী পাঁচ বছরে গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে সাত দশমিক দুই শতাংশ।

এ বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, যে সমস্ত পশ্চিমা দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি লাভ করেছে সব অর্থনীতির একই ধরনের কাঠামো ছিল। প্রথম দিকে অর্থনীতি ছিল কৃষি নির্ভর, তারপর শিল্পের দিকে যাত্রা করেছে। বিশেষ করে শিল্পের অগ্রগতির শুরুটা আবার বস্ত্র খাতের উন্নতি দিয়ে হয়। যেমন ইংল্যান্ডে হয়েছিল। বাংলাদেশও সেই পথেই যাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন অগ্রগতির সিড়িতে উঠেছে। কিন্তু এ সময় যতটা দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা ছিল তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ নানা পিছুটানের কারণে। তবে এখন শিল্পের ক্ষেত্রে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে তা কাজে লাগাতে অবকাঠামোর উন্নতি করতে হবে। এজন্য বিশেষ কিছু করার দরকার নেই। সরকার যেগুলো প্রকল্প হাতে নিয়েছে সেগুলো শেষ করতে পারলেই আপাতত হয়। যেমন চট্টগ্রাম বন্দরের পুরোপুরি ব্যবহার, ঢাকা-চিটাগাং চার লেনের কাজ শেষ করা এবং যে চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেগুলো দ্রুত শেষ করলেই কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অন্যান্য লক্ষ্যগুলো হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি বর্তমানের (২০১৫ সাল) ছয় দশমিক পাঁচ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে পাঁচ দশমিক পাঁচ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। মোট বিনিয়োগ বর্তমানে জিডিপির ২৭ দশমিক ছয় শতাংশ থেকে আগামী পাঁচ বছরে জিডিপির ৩৪ দশমিক চার শতাংশে নিয়ে যাওয়া। জাতীয় সঞ্চয় বর্তমানে জিডিপির ২৯ দশমিক এক শতাংশ থেকে ২০২০ সালে জিডিপির ৩২ দশমিক এক শতাংশে নিয়ে যাওয়া। ভোগ বর্তমানে জিডিপির ৭৭ দশমিক ৭০ শতাংশ থেকে পাঁচ বছরে জিডিপির ৭৩ দশমিক পাঁচ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। আগামী পাঁচ বছরে নতুন ১ কোটি ৬২ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশী ও বিদেশী মিলে এ পরিমাণ কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, দেশকে মধ্যম আয়ে নিয়ে যাওয়া, দারিদ্র্য কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নামিয়ে আনা, ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বৃত্ত ভেঙ্গে আগামী ৫ বছরে ৮ শতাংশে উত্তরণ, কৃষি থেকে শিল্প নির্ভর অর্থনীতি, ব্যাপক কর্মসংস্থান এবং মূল্যস্ফীতি হাতের মুঠোয় ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে বাস্তবায়ন করা হবে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জন্য (২০১৬-২০ সাল পর্যন্ত) ব্যয়ের লক্ষ্য চূড়ান্ত করা হয়েছে ৩১ লাখ ৯০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। যা এ যাবতকালের সর্বোচ্চ ব্যয়ের লক্ষ্য। অন্যদিকে শেষ হতে যাওয়া ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গত পাঁচ বছরে ব্যয়ের যা লক্ষ্য ছিল তার চেয়ে আগামী পাঁচ বছরে ব্যয় হবে দিগুণেরও বেশি। এই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মোট ব্যয় যেটি ধরা হয়েছে তার মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ৪৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ৩ লাখ ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে ড. শামসুল আলম বলেন, পরিকল্পনার বছর শেষে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে এই ধরনের ব্যয়ই প্রয়োজন হবে। কারণ আমরা মধ্য আয়ের দেশে যেতে যাচ্ছি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ছয়টি বিষয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে-কারিগরি ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ গঠন, বিদ্যুত উন্নয়ন, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূরীকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ, আইসিটি-স্বাস্থ্য-শিক্ষা সংক্রান্ত সেবা রফতানিতে সুনির্দিষ্ট নীতিকৌশল প্রণয়ন, সরকারী-বেসরকারী বিনিয়োগে গতিশীলতা আনয়ন এবং রফতানির গতিশীলতা আনতে পণ্যের বৈচিত্রায়ণ।

সূত্র জানায়, আগামী পাঁচ বছরে মধ্য আয়ের দেশে যেতে কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো হলো, বিনিয়োগকারীদের দ্বারা চিহ্নিত সীমাবদ্ধতা দূরীকরণের মাধ্যমে বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা, পাবলিক বিনিয়োগ ঘাটতি দূর করতে আধুনিকায়ন পরিকল্পনা তৈরি, বিদ্যুত ও জ্বালানির সঠিক মূল্য নির্ধারণ ও ভর্তুকির পরিমাণ যুক্তিযুক্তকরণ, সরকারী-বেসরকারী বিনিয়োগ অংশীদারিত্ব পুনর্গঠন ও গতিশীলতা আনয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ, পোশাক খাত থেকে লব্দ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অ-পোশাক রফতানি খাতের জন্য উদ্দীপক কাঠামোর উন্নতিকরণ, রফতানি সম্ভাবনাসহ কৃষি কৌশল পুনর্বিবেচনা করা, কৃষকদের ভাল প্রণোদনা প্রদানে মূল্য নীতি প্রণয়ন ও গ্রামীণ অবকাঠামোর ওপর বেশি জোর প্রদান করা, পশু ও মৎস্য ক্ষেত্রে মনোযোগ সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে প্রমাণ ভিত্তিক নিরুপণ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের সাহায্যে সঠিক কৌশল নির্ধারণ করা এবং আইসিটি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সংক্রান্ত সেবা রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট বিধিগত এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা ও এর সুনির্দিষ্ট সমাধানের জন্য একটি সমীক্ষা পরিচালনা করা।