১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মহসিন আলী আর নেই

সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মহসিন আলী আর নেই

জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ মাত্র ক’দিন আগেই সমাজসেবা অধিদফতরের এক অনুষ্ঠানে দরাজ গলায় গেয়েছিলেন- ‘ধন্যধান্য পুষ্পভরা/ আমাদের এই বসুন্ধরা....’ এই দেশাত্মবোধক গানটি।’ কে ভেবেছিল এটাই হবে তাঁর সর্বশেষ গান! বাস্তবে তাই হলো। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সৈয়দ মহসিন আলী আর নেই। স্ত্রী ও তিন কন্যাসহ হাজারো ভক্ত, অনুরাগী, শুভাকাক্সক্ষী রেখে মাটি ও মানুষের এই নেতা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা ৫৯ মিনিটে ৬৭ বছর বয়সী সৈয়দ মহসিন আলী ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন)।

সৈয়দ মহসিন আলী শুধু মন্ত্রীই ছিলেন না, তাঁর ছিল একটি কবিমন। বাংলাদেশ বেতারের শিল্পী, গ্রগতিশীল, সংস্কৃতিমনা ও কবিতানুরাগী এই রাজনীতিক তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের আভিজাত্য ছেড়ে প্রথাগত চিন্তা-চেতনার উর্ধে উঠে মিশতে পেরেছিলেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। ছাত্রলীগের একজন সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সৈয়দ মহসিন আলী মৌলভীবাজারে অসম্ভব জনপ্রিয় মাটি ও মানুষের নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পুরোটা জীবন উৎসর্গ করে গেছেন গণমানুষের কল্যাণে।

অসম্ভব জনপ্রিয় ও ত্যাগী রাজনীতিক, প্রগতিশীল, সংস্কৃতিমনা সৈয়দ মহসিনের মৃত্যু সংবাদে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পীকার ফজলে রাব্বি মিয়া গভীর শোক প্রকাশ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে একটি শোক প্রস্তাবও গৃহীত হয়।

সৈয়দ মহসিন আলীর মেজ মেয়ে সৈয়দা সানজিদা শারমিন জানান, তাঁর বাবার মরদেহ আজ মঙ্গলবার রাতে দেশে আনা হবে। আগামীকাল বুধবার মৌলভীবাজারে জানাজা শেষে সৈয়দ শাহ মোস্তফা (রহ) মাজার শরিফ প্রাঙ্গণে কবরস্থনে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সৈয়দ মহসিন আলীকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে।

নিউমোনিয়া ও কিডনি সমস্যাসহ নানা জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে বারডেম হাসপাতালে ভর্তি হন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী। সেখানে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা চলাকালে ৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে হƒদরোগে আক্রান্ত হন মন্ত্রী। এরপর থেকে তাঁকে কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস (মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন) দেয়া হচ্ছিল। উন্নত চিকিৎসার জন্য ৫ সেপ্টেম্বর মহসিন আলীকে এয়ার এ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ছোট মেয়ে সৈয়দা সাবরিনা শারমীন এবং স্ত্রী সৈয়দা সায়রা মহসিনও তাঁর সঙ্গে যান। এর আগে একবার বাইপাস সার্জারি করা হয়েছিল মহসিন আলীর। এছাড়া ডায়াবেটিসের কারণে দিনে দুই বেলা ইনস্যুলিন নিতে হতো তাঁকে।

সৈয়দ মহসিন আলীর মৃত্যুর খবর জানার পর দুপুরে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে যান জাতীয় সংসদের চীফ হুইফ আসম ফিরোজ। এ সময় তিনি মহসিন আলীর দুই মেয়ের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিবারের সদস্যদের সান্ত¡না দেন। এর আগে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব, মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অধিদফরের উর্ধতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা মহসিন আলীর বাসভবনে ভিড় জমান।

রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ এক শোকবার্তায় সৈয়দ মহসিন আলীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সাহসী মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসিন আলীর মৃত্যুতে জাতি একজন ত্যাগী রাজনীতিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হারাল। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি হলো। রাষ্ট্রপতি মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৈয়দ মহসিন আলীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। এক শোক বার্তায় তিনি সৈয়দ মহসিন আলীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কথা স্মরণ করে বলেন, সৈয়দ মহসিন আলীর মৃত্যুতে জাতি একজন সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতাকে হারাল। সৈয়দ মহসিন আলী গণমানুষের জন্য তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

সৈয়দ মহসিন আলী মৌলভীবাজার-৩ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ১২ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জš§গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ আশরাফ আলী এবং মা আছকিরুন্নেছা খানম। রাজনীতি করার আগে তিনি পেশায় আইনজীবী ছিলেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১২ জানুয়ারি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ছাত্রজীবনেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন সৈয়দ মহসিন আলী। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। সিলেট বিভাগ সিএনসি স্পেশাল ব্যাচের কমান্ডার হিসেবে তিনি সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। সম্মুখসমরে আহতও হন। সৈয়দ মহসিন আলী আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি ছিলেন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সদস্য। সিলেট জেলা ও বিভাগীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

সৈয়দ মহসিন আলী ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি সেক্টরস কমান্ডার ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সৈয়দ মহসিন আলী আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই মেয়াদে তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।

সৈয়দ মহসিন আলী তিন বার মৌলভীবাজার পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে শ্রেষ্ঠ পৌরসভা চেয়ারম্যান হন। মৌলভীবাজার পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকার সময় তিনি স্থানীয় সরকারের আওতায় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নেন। তিনি বাংলা, ইংরেজী, উর্দু ও হিন্দি ভাষায় বলা ও লেখায় সুদক্ষ। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের সঙ্গে সৈয়দ মহসিন আলী জড়িত ছিলেন। তিনি একজন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব। তাঁর সঙ্গীত প্রীতি সর্বজনবিদীত। খেলাধুলা, সঙ্গীত, বইপড়া ও শরীরচর্চা তাঁর প্রিয় শখ। মুক্তিযুদ্ধ ও সমাজসেবায় অবদান রাখার জন্য ভারতের আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন রিসার্চ সোসাইটি সৈয়দ মহসিন আলীকে ‘আচার্য দীনেশ চন্দ্র সেন স্মৃতি স্বর্ণপদক ২০১৪’ প্রদান করে। ‘হ্যালো কলকাতা’ নামে কলকাতাভিত্তিক একটি সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠান তাঁকে ‘নেহেরু সাম্য সম্মাননা ২০১৪’ পুরস্কারে ভূষিত করে।

সৈয়দ মহসিন আলীর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে আরও বিবৃতি দিয়েছেনÑ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, ভূমি মন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলু, প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙা, প্রমোদ মানকিন, ইসমাত আরা সাদেক, জাতীয় পার্টির (জেপি) মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, শেখ শহীদুল ইসলাম, জাসদের মইন উদ্দিন খান বাদল, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) হেলাল মোর্শেদ বীরবিক্রম, ভাইস চেয়ারম্যান ইসমত কাদের গামা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মোঃ সালাউদ্দিনসহ অসংখ্য নেতা ও সংগঠন।

এদিকে মৌলভীবাজার থেকে আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, সৈয়দ মহসিন আলীর মৃত্যুতে মৌলভীবাজার জেলার সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। শহরের দর্জিরহল মন্ত্রির বাসায় সর্বস্তরের মানুষ ভিড় জমান। মন্ত্রীর ছোট ভাই সৈয়দ নওশের আলী খোকন জানান, বুধবার সকাল ১১টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনে তাঁর প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে প্রথম নামাজে জানাজা শেষে মন্ত্রীর মরদেহ মৌলভীবাজার শহরের দর্জিরমহল এলাকার বাড়িতে আনা হবে। সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে স্থানীয় শাহ মোস্তফা মাজার প্রাঙ্গণে তাঁর মরদেহ দাফন করা হবে। তাঁর মৃত্যুতে সাবেক চীফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, হুইপ শাহাবুদ্দিন আহমেদ, জেলা পরিষদ প্রশাসক আজিজুর রহমান, সিলেটের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন কামরানসহ নেতাকর্মী শোক জানিয়েছেন।