১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অর্থনৈতিক উন্নতি সামাজিক অবক্ষয় রোধের গ্যারান্টি নয়

  • আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

শরীরটা আজকাল ভাল যাচ্ছে না। দু’দিন সুস্থ থাকি তো চারদিন অসুস্থ রই। বয়স আশি পেরিয়েছে। এখন সুস্থ থাকার কথা নয়। তবু কিছুটা সুস্থ আছি, এখনও লেখালেখি করতে পারছি এটাই বড় সান্ত¡না। আমার এক প্রিয় সাহিত্যিক ছিলেন কলকাতায় প্রয়াত হেমেন্দ্র কুমার রায়। শেষ বয়সে তার এক বন্ধু তাকে চিঠি লিখে জানতে চেয়েছিলেন তিনি কেমন আছেন? তার জবাবে হেমেন্দ্র কুমার রায় দু’লাইন কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন।

‘তৈরি করে রেখেছি ভাই মনটা,

বিদায় নেব বাজলে ছুটির ঘণ্টা।’

আমিও আমার বন্ধুদের এ দু’লাইন কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে নিজের শরীরের অবস্থা জানাই।

পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে লিখছি। এতো লিখে লাভ কি হলো, তা মাঝে মাঝে ভাবি। দেশটা এগুলো, না পেছুল? জন্ম নিয়েছিলাম ব্রিটিশ বাংলায়। একটা উদারনৈতিক সামাজিক পরিবেশ ছিল দেশটিতে। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ছিল। কিন্তু মৌলবাদের এমন অবাধ উত্থান ছিল না। দেশে আইনের শাসন ছিল। সুষ্ঠু নির্বাচন হতো। ভোট ডাকাতি কথাটা অশ্রুতপূর্ব ছিল। দারিদ্র্য ছিল। মূল্যবোধের ঘাটতি ছিল না।

তারপর এলো পাকিস্তান। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি প্রসারিত হলো, কিন্তু আইনের শাসন একেবারে লোপ পায়নি। দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থায় যে ভারসাম্য ছিল, তা ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছিল; অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্য আরও বাড়ছিল। কিন্তু পাশাপাশি সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনা ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের শক্তি বাড়ছিল। পূর্ণতা পাচ্ছিল স্বাধিকার চেতনাও।

তারপর এলো স্বাধীনতা। বহু আকাক্সিক্ষত, সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি রহিত সোনার বাংলা গড়ার স্বাধীনতা। কিন্তু সেই সোনার বাংলা গড়ার সোনার মানুষ পাওয়া গেল না। যিনি দেশটা বহু সংগ্রাম করে স্বাধীন করেছিলেন, তাঁকে সবংশে নিপাত করা হলো। দেখা গেল, মাত্র ২৪ বছরের পাকিস্তানী জমানার গর্ভ থেকে বাঙালী অথবা বাংলাদেশী নামের একদল মানুষ উঠে এসেছে, যাদের একটা অংশই হচ্ছে চরিত্রহীন, দেশপ্রেমহীন লুটেরা শোষক। তারা পরিচয়ে বাংলাদেশী; কিন্তু তাদের আসল পরিচয় চিলড্রেন অব পাকিস্তান।

তারা বাংলাদেশকে ছায়া পাকিস্তান (ঝযধফড়ি চধশরংঃধহ) বানাতে চেয়েছে। তা বানিয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে যে সিভিল ও সেক্যুলার কালচার ছিল রাজনীতির ভিত্তি; তাকে সামরিক ও সাম্প্রদায়িক কালচার দ্বারা প্রভাবিত করেছে।

এমনকি বাংলাদেশের সেক্যুলার রাজনৈতিক দলগুলোও এখন এই কালচারের অনুকরণ করে। দেশে আইনের শাসন আছে কি? যদি থাকেও তার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করেছে ধর্মীয় বিধান, ফতোয়াবাজি। সামাজিক সাম্য ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর এখন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক বৈষম্য এবং অমানবিক লোভ ও হিংসা। শিশু হত্যা, নারী ধর্ষণ, চোর সন্দেহে অসহায় কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা এখন নিত্যদিনের গা-সহা প্রথা। আমরা র‌্যাবকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের জন্য সমালোচনা করি। কিন্তু আমাদের চারপাশে অহরহ ঘটছে বিচারবহির্ভূত, বেআইনী এবং অমানবিক হত্যা। তার বিরুদ্ধে সামাজিক ক্রোধ ও প্রতিরোধ কোথায়?

সুতরাং পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে লিখে দেশটাকে আমরা কেউ যে এগিয়ে দিতে পেরেছি, তা নয়। দেশ পিছিয়েছে। মনে হয়, বিদেশী শাসনে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেনি। কিন্তু সামাজিক অগ্রগতি ঘটছিল। স্বাধীনতা পাওয়ার পর আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছে, কিন্তু সামাজিক অবক্ষয় চূড়ান্ত আকার ধারণ করতে চলেছে। তার অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি যদি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি না ঘটে, তাহলে সেই অর্থনৈতিক উন্নতি তলাবিহীন ঝুড়ির মতো। সে উন্নতি টেকসই হয় না।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দেশের অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটিয়েছে একথা সত্য। একদিন বাংলাদেশের ইতিহাসে যদি শায়েস্তা খানের আমলের মতো হাসিনা সরকারের আমলের কথা উল্লেখিত হয়, তাহলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। রাজনৈতিক অস্থিরতাও হাসিনা সরকার প্রশংসনীয়ভাবে হ্রাস করেছে। কিন্তু যেটা পারেনি, সেটা হলো সামাজিক অবক্ষয় ও মানবিক মূল্যবোধের দ্রুত অবক্ষয় রোধ করা। এটা না পারলে অর্থনৈতিক উন্নতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা যাবে না।

সামান্য কারণেও বর্তমানের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। বিরোধী দলগুলোর দুর্বলতা ও নিষ্ক্রিয়তা সত্ত্বেও সরকার জনবিরোধিতার সম্মুখীন হতে পারে। তার প্রমাণ, সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পর্কে অর্থমন্ত্রীর একটি উক্তি এবং বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার ওপর ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন। বিএনপি জোট এই আন্দোলন গড়ে তোলেনি বা গড়ে তুলতে পারেনি। এটা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। সরকারকে দোষারোপ করব এ জন্যে যে, তারা তাদের সুসময়ে অহেতুক এমন একটি আন্দোলন গড়ে ওঠার মতো অবস্থা সৃষ্টি করেছিলেন। আর ধন্যবাদ জানাই এ জন্যে যে, একটি গণতান্ত্রিক চরিত্রের সরকার বলেই তারা সময় থাকতে জনমনের ক্ষোভের কথা বুঝতে পেরেছেন এবং অর্থমন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়া এবং ভ্যাট প্রত্যাহার দ্বারা নিজেদের ভুল দ্রুত সংশোধন করেছে।

অর্থমন্ত্রী শিক্ষকদের সম্পর্কে তার উক্তিটি প্রত্যাহার করায় এবং বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত ভ্যাটও আর না থাকায় এর ভালোমন্দ দিক সম্পর্কে আলোচনার অবকাশ অথবা প্রয়োজন আর নেই। আগেই বলেছি এই সরকার গণতান্ত্রিক চরিত্রের বলেই শিক্ষক ও ছাত্রদের তথা গণদাবিকে সম্মান জানিয়ে সে দাবিকে মেনে নিয়েছে। এই গণতান্ত্রিক চরিত্রের প্রমাণ তারা আগেও দিয়েছে। দেশে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি নতুন বিমানবন্দর তৈরির জরুরী প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে একটি এলাকা ওই বিমানবন্দর তৈরির জন্য নির্দিষ্ট করার পর গণঅসন্তোষের মুখে সরকার ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে সরে এসেছিল। অন্যদিকে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে সারের মূল্য হ্রাস করার দাবি জানাতে কৃষকরা ঢাকায় এলে তাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালিয়ে ১৮ জন কৃষককে হত্যা করা হয়েছিল।

ব্রিটেনে মার্গারেট থ্যাচার অসম্ভব শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। উপর্যুপরি তিনবার তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। দলের ভেতর এবং দেশে যখন তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা, তার সরকারের কোনো বিরোধিতা নেই, তখন তিনি হঠাৎ নাগরিকদের ওপর পোল ট্যাক্স নামে একটি নতুন ট্যাক্স প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। সাধারণ নাগরিকরা এর প্রতিবাদ জানায়। তিনি সেই প্রতিবাদকে পাত্তা দেননি। বিস্ময়ের ব্যাপার, এই সামান্য পোল ট্যাক্স নিয়ে ব্রিটেনে থ্যাচার বিরোধিতা গড়ে ওঠে। এমনকি তার দলের ভেতরেও। তিনি নিজেকে ‘লৌহমানবী’ প্রমাণ করার জন্য পোল ট্যাক্স প্রত্যাহার না করার প্রশ্নে অনমনীয় থাকেন। এই অনমনীয়তাই লৌহমানবীর পতন ঘটায়। নিজের দলের বিদ্রোহেই তাঁকে প্রধানমন্ত্রিত্ব ত্যাগ করতে হয়।

বাংলাদেশে হাসিনা চরিত্রে অনমনীয়তা আছে; কিন্তু তা গণদাবির ব্যাপারে নয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর চরিত্র-বৈশিষ্ট্য হলো তিনি সব সময় গণদাবি মেনে নেন। গণদাবির মুখে অনমনীয়তা দেখান না। দেখান বিএনপি-জামায়াতের অন্যায় দাবি-দাওয়ার মুখে। বিতর্কিত এবং ঘুণে ধরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবেই বাতিল হয়ে গেছে। তিনি এই ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের উদ্দেশ্যমূলক দাবির কাছে প্রবল চাপের মুখেও নতিস্বীকার করেননি। বিএনপি জনগণের কাছ থেকেও এই দাবিতে সমর্থন আদায় করতে পারেনি।

প্রশ্নটা এখানেই, হাসিনা সরকার গণতান্ত্রিক চরিত্রের সরকার এবং জনগণের দাবি-দাওয়া সম্পর্কে সংবেদনশীল হওয়া সত্ত্বেও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানোর পাশাপাশি কেন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয় রোধ করতে পারছে না? ধর্মান্ধতা এবং মৌলবাদী রাজনীতির কালচার থেকে দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশকে মুক্ত করতে না পারলে বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো যাবে মনে হয় না। আওয়ামী লীগসহ দেশের সেক্যুলার দলগুলো এই অবস্থার সঙ্গে আপোস করে চলার নীতি গ্রহণ করেছে। এই আপোস দেশের সামাজিক অবক্ষয়ের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নতির কোনো মানবিক মূল্যবোধ এই অবক্ষয় গড়ে উঠতে দিচ্ছে না। কালক্রমে এমন হতে পারে সামাজিক অবক্ষয় অর্থনৈতিক উন্নতির সাফল্যগুলো ধ্বংস করে দেবে।

১৯৭১ সালে দেশে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল। কিন্তু সেই পরিবর্তন আমরা ধরে রাখতে পারিনি। কারণ, ওই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিপূরক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আমরা ঘটাতে পারিনি। ’৭১-এর স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলো তখন রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু সামাজিক শক্তি হারায়নি। বরং মসজিদ, মাদ্রাসাগুলো দখল করে তাদের সামাজিক অবস্থান ও শক্তি বাড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা দখলও করেছিল।

বহু আন্দোলন ও সংগ্রামের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক মোর্চা ক্ষমতায় এসেছে বটে, কিন্তু এবারেও তারা রাজনৈতিক জয়ে সন্তুষ্ট এবং এই রাজনৈতিক জয় ধরে রাখার কাজে ব্যস্ত। এজন্যে মৌলবাদী রাজনীতির কালচারের সঙ্গে আপোস করে চলার নীতি গ্রহণ করেছে। সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা এবং সেক্যুলার সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনের প্রশ্নে কোনো বাস্তব কর্মসূচী গ্রহণ করেনি এবং এ ধরনের কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কোনো আগ্রহও তাদের মধ্যে নেই। একমাত্র অর্থনৈতিক উন্নতির ভেল্কি দেখিয়ে তারা তাদের ক্ষমতার ভোট বাক্স নিরাপদ রাখতে চায়।

ফলে দেশে সামাজিক অবক্ষয় এবং মানবিক মূল্যবোধহীনতা দ্রুত বেড়ে চলেছে। এক অর্থনীতিবিদই বলেছেন, অর্থনৈতিক উন্নতির ভিত্তি যদি মানবিক হিতৈষণা না হয়, তাহলে সে উন্নতি ভোগবাদের উন্নতি। ভোগবাদ সমাজে কেবল লোভ লালসা, হিংসা ও দুর্নীতি বাড়ায়।

পঞ্চাশ বছর কলম চালিয়েও যখন দেখি, সমাজ কেবল পেছনে হটছে, মানবিক মূল্যবোধের ক্রমাবনতি ঘটছে, এমনকি রাজনৈতিক স্বাধীনতাও সেই অবক্ষয় রোধ করতে পারছে না, তখন হতাশা বোধ করি। এটাই সম্ভবত উপযুক্ত সময়, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক উন্নতিকে দেশের মানুষের জন্য অর্থবহ করে তোলার এবং আমাদের লোকায়ত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পুনরুজ্জীবনও দরকার। মৌলবাদের খপ্পর থেকে জাতির মন ও মানসকে মুক্ত করা আবশ্যক।

আওয়ামী লীগ দেশকে স্বাধীনতা দিয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নতিও এসেছে। কিন্তু পারবে কি তার স্থায়ী ভিত্তি হিসেবে সেক্যুলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির পুনরুজ্জীবন ঘটাতে?

[লন্ডন, ১৫ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার, ২০১৫

নির্বাচিত সংবাদ