২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টু কিল এ মকিংবার্ড এবং অতঃপর

  • ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর

১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালে হারপার লীর যুগান্তকারী উপন্যাস ‘টু কিল এ মকিংবার্ড’ প্রথম পড়েছিলাম। তখন থেকেই আমাদের দেশের হরবোলাকে সে দেশের মকিংবার্ডের সমগোত্রীয় কিংবা সমতুল্য বলে মনে করেছিলাম। তারপর ১৯৬৬ সালে ছায়াছবিতে দেখেছিলাম এই উপন্যাসের জীবন্ত প্রতিফলন। উপন্যাসের নায়ক আইনজীবী এটিকাসের ভূমিকায় ছিলেন খ্যাতিমান অভিনেতা গ্রেগরী পেক। দেখে অভিভূত হয়েছিলাম। কি নিপুণ, বস্তুনিষ্ঠ ও মর্মস্পর্শীভাবে গ্রেগরী পেক এটিকাসের জীবন্ত রূপ দিয়েছিলেন সে ছবিতে। মনে হয়েছিল উপন্যাস বা ছবি পড়ছি বা দেখছি না বরং এক বাস্তব ও প্রাণস্পর্শী জীবনপ্রবাহ অবলোকন করছি আমি। মনে এসেছে আমাদের সমাজের নিভৃতে এখনও ছোট গাছ-গাছালির পাতার আড়ালে প্রায় অদৃশ্য হরবোলা পাখি তার কাকলিতে জীবনের প্রাত্যহিকতায় নীরবে নিবেদিত সলাজ নতুন বধূকে ‘বউ কথা কও’ ধ্বনিতে পুরুষের সমসজীবতায় সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ‘হক্কে’ থেকে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার ডাক দেয়। বার বার ডেকে সেই হরবোলা সলাজ বধূকে সমাজের পার্থিব মদমত্ততা ও বহুদিন থেকে চলে আসা অনড় বিধিনিষেধ ও মৃতবাক মূঢ়তা থেকে মুক্তি দিতে চায়। এসবের বিরুদ্ধেই সমাজের সচেতন মানুষ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে এই উপন্যাসের কাহিনী ও কথকতায় লী সামনের দিকে এগিয়ে যেতে ডাক দিয়েছেন মকিংবার্ডে।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে ১৯৩০ দশকের সেই বর্ণবাদী যুগের পটভূমিকায় শ্বেতাঙ্গিনী হারপার লী ১৯৬০-এর দশকে এ উপন্যাস লিখেছেন। আলাবামা অঙ্গরাজ্যের মেএকম বলে এক কল্পিত শহর এই উপন্যাসের পটভূমি। সেখানে এক বিপতœীক আইনজীবী এটিকাস তার দুই সন্তান মেয়ে স্কাউট, ছেলে জেম এবং গৃহস্থালির কৃষ্ণাঙ্গিনী পরিচারিকা কালপুরনিয়াকে নিয়ে বাস করেন। মেয়ে স্কাউটের উঠতি বয়সের সহজ-সরল বা বাগাড়ম্বরবিহীন কথায় এই উপন্যাসের কাহিনী বর্ণিত। স্কাউট ও জেম তাদের এক পড়শী আর্থার রেডলী যার ডাকনাম বু এবং যে কখনও ঘর থেকে বেরোয় না তাকে তাদের আরেক বন্ধু ডিল সহযোগে ঘরের বাইরে মুক্ত আবহে নিয়ে আসার ফন্দি-ফিকির করছে। স্কাউট বাড়ন্ত মেয়ে হয়েও ছেলেদের মাঝে দস্যির মতো ঘুরে বেড়ানো পছন্দ করে। স্কুলে যেতে চায় না। তার ভাই জেম পছন্দ না করলেও স্কাউট ছেলেদের সঙ্গে মারামারিতে প্রবৃত্ত হতেও ইতস্তত করে না। একমাত্র তার বাবা এটিকাস তার সকল কাজের প্রশ্রয়দাতা। এভাবে বেড়ে ওঠার এক সময়ে স্কাউট ও জেম জানতে পারে, তার বাবা এটিকাস টম রবিনসন বলে এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে একজন শ্বেতাঙ্গিনীকে ধর্ষণের অভিযোগে আরোপণীয় শাস্তি থেকে বাঁচানোর জন্য আইনী লড়াইয়ে নেমেছেন। এর ফলশ্রুতিতে সেই শহর মেএকমে ১৯৩০ দশকের সেই বদ্ধ আবহে স্কাউট ও জেম তাদের শ্বেতাঙ্গ প্রতিবেশীদের থেকে অপমান ও গালাগালির শিকার হতে থাকে। এ সময়ে স্কাউট তার বিপক্ষে অন্যান্য অপবাদী ও গাল দেয়া বালক-বালিকাদের সঙ্গে মারামারি করা থেকে অতি কষ্টে নিজেকে নিবৃত্ত রাখে। এই অপবাদ ও গালাগালির মুখে তার ভাই জেম, যে তার চেয়ে বড় এবং শান্ত, সেও অসহিষ্ণু আচরণ করতে চায়। তাদের এক প্রতিবেশীর গালিগালাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে জেম তার সযতেœ লালিত বাগানের গাছ-গাছড়া উপড়ে ফেলে দেয়। এভাবে দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টমের বিচার চলে এবং এটিকাস শত চেষ্টা সত্ত্বেও সে যুগের শ্বেতাঙ্গ বিচারক ও জুরীর কাছে তাদের সন্তুষ্টি অনুযায়ী প্রমাণ করতে পারেন না যে, টমের বিরুদ্ধে যে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে তার জন্য টমকে দায়ী করা যায় না; বস্তুত সেই শ্বেতাঙ্গিনী অভিযোগকারীই অনৈতিক আচরণে টমকে প্রলোভিত করেছে। এতদ্সত্ত্বেও টমকে বর্ণবিদ্বেষী সমাজের বিচারে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বিচারের এক পর্যায়ে এটিকাস অনেকটা অনিচ্ছাকৃতভাবে টমের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী সেই শ্বেতাঙ্গিনী মেয়ের বাবা ববকে অপমান করেন। বব এটিকাসের মুখে থুতু ছিটিয়ে কসম কেটে এর প্রতিশোধ নিতে সংকল্পবদ্ধ হয়। স্কাউট, জেম ও ডিল টমকে শাস্তি দেয়ার এই বিচারিক সিদ্ধান্তে স্বপ্নভঙ্গের মতো হতভম্ব হয়ে যায়। এটিকাস বিদ্যমান পরিস্থিতিতে টমকে শাস্তি দেয়া অপ্রত্যাশিত নয় বলে তাদের বোঝাতে চান। বলেন, তাদের জগতে এমন কিছু আছে যা মানুষকে মতিচ্ছন্ন করে রাখে- যার ফলে তারা চেষ্টা করলেও ন্যায়পরায়ণ হতে পারে না। তাদের বিচারালয়ে যখন একজন শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গের বিরুদ্ধে কথা বলে, শ্বেতাঙ্গের কথাই বিশ্বাস করা হয়, শ্বেতাঙ্গই জিতে যায়। যদিও বিচারালয়ই সম্ভবত একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে নীতি হিসেবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে সমান ধরে নেয়া হয়।

টম শাস্তি পেয়ে জেলে যায়। সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় শ্বেতাঙ্গ কারারক্ষীরা তাকে গুলি করে খুন করে। এই ঘটনার কথা এক মিশনারিদের সভায় শুনতে পেয়ে কিশোরী স্কাউট নারীত্বের আদর্শ অনুধাবন এবং সমসাময়িক বিরূপ পরিস্থিতিতে সচেতন মানুষ হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্পবোধ অর্জন করে।

সময় এগিয়ে যায়। বব তার প্রতিহিংসা নিয়ে এটিকাস ও তার পরিবারের ওপর প্রতিশোধ নিতে চায়। এক সন্ধ্যায় স্কুল থেকে ফেরার সময় স্কাউটকে বব আক্রমণ করে। তাকে বাঁচাতে সেই চুপ করে থাকা ঘরকুনো পুরুষ প্রতিবেশী বু এগিয়ে আসে। ফলত ববকে পাওয়া যায় তার নিজের ছুরির ওপর পড়ে যাওয়া মৃত শব হিসেবে। পরে শহরের শেরিফ সম্ভবত সবকিছু জেনেও অন্যায়ের প্রতিকূলে বদ্ধ ঘর থেকে মুক্তির আবহে হঠাৎ বাইরে আসা বুর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে অস্বীকার করেন। সে সন্ধ্যায় স্কাউট মেয়ে হয়েও ঘরকুনো পুরুষ প্রতিবেশী বুকে তার এতদিনের বদ্ধ ঘরে পৌঁছে দেয়। তারপর সে তার বাড়িতে ফিরে এসে দেখে তার বাবা এটিকাস তার জন্য অপেক্ষা করছেন। এটিকাস গল্প পড়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেন এবং তারপর তার ছেলে জেমের ঘুম থেকে জেগে ওঠার প্রত্যাশায় অপেক্ষা করতে থাকেন। এই প্রত্যাশা এক নতুন প্রভাতের পরিবর্তিত মানসিকতাসম্পন্ন আরও বেগে দুর্দম গতিতে এগিয়ে যাওয়ার সময়ের।

এই উপন্যাসে লী দুরন্তভাবে বেড়ে ওঠা কিশোরীর কথা ও ভাবনায় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন দক্ষিণাঞ্চলের সামাজিক মানস ও ব্যত্যয়াদি তুলে ধরেছেন এবং পাঠকের অবচেতন মনে বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে সমতা ও ন্যায়বিচারের প্রয়োজন এবং তার জন্য সংগ্রাম করার অবিনাশী আহ্বান জানিয়েছেন। এখানে দৃশ্যত আবেগ ও অতিকথন কিংবা প্রত্যক্ষ উপদেশ বা অনুশাসন স্থান পায়নি, মানুষ হিসেবে অন্তরের উপলব্ধি, মানবিক মর্যাদা ও অধিকারের অনুকূলে কোন শোরগোল বা সেøাগানের ধারক না হয়ে হৃদয়ের গ্রন্থিতে অবিচ্ছেদ্য ও অবিনাশীভাবে সংযোজিত হওয়ার এক কোমল অথচ নিবিড় গাথা স্থান পেয়েছে। তখনকার পরিস্থিতিতে এই গাথা সকল সচেতন মানুষকে অধিকতর সজাগ করেছে।

পৃথিবীর এই প্রান্তেও আমাদের জানা- বিহারের এক খ্যাতনামা সমাজসেবী দেওয়ান সমাজসেবায় আত্মনিয়োজিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় লীর এই উপন্যাস পড়ে দৃশ্যত অসার জীবনযাপনের মাঝে নতুন ও সতেজ তাৎপর্য খুঁজে পেয়েছেন, আত্মহত্যা করার হতাশ মনোভাব নিয়ে রেললাইনের ওপর থেকে রেল আসার আগেই সরে এসেছেন মানুষের সেবায় নিবেদিত হওয়ার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে। ফলত ঔপন্যাসিক হিসেবে লী পৃথিবীব্যাপী বিশাল ও বিপুল স্বীকৃতি পেয়েছেন। ১৯৬১ সালে তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন। তার উপন্যাসটির ছাপানো সংখ্যা ৩০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। পৃথিবীর ১৭টি ভাষায় এটি অনুবাদিত হয়েছে। ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি জার্নাল এই উপন্যাসটিকে শতাব্দীর সেরা উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জনসন লীকে জাতীয় কলা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে নিযুক্তি দেন। ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ লীকে প্রেসিডেন্টের স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করেন এবং ২০১০ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা লীকে তার সরকারের শ্রেষ্ঠতম পদক জাতীয় কলা মেডেলে (ন্যাশনাল মেডেল অব আর্টস) ভূষিত করেন। ১৯৬২ সালে এই উপন্যাসের ওপর নির্মিত ছবি অস্কার পুরস্কার পেয়েছে এবং এর নাম চরিত্রের অভিনেতা গ্রেগরী পেকও শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে অস্কারে ভূষিত হন; এর চিত্রনাট্যকার হর্টন ফুটেও শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার হিসেবে সেই বছরে সম্মানিত হন। লী নিজেই হর্টনের চিত্রনাট্যকে তার উপন্যাসের চিত্রনাট্যায়নকে সকল যুগের অন্যতম সেরা কর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

মকিংবার্ড প্রকাশিত হওয়ার পর লীর অন্য কোন উপন্যাস ২০১৫ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। লীও অন্য কোন উপন্যাস লিখেছেন বলে জানা যায়নি। ২০১৫-এর জুলাই মাসের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যামব্রিজের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বইয়ের দোকানে (হার্ভার্ড কুপ) শেলফ ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ নজরে এলো হারপার লীর সেই সালেই প্রকাশিত দ্বিতীয় উপন্যাস ‘গো সেট এ ওয়াচম্যান’। প্রচ- আগ্রহ নিয়ে কিনলাম। কেনেডি ও হার্ভার্ড স্ট্রিটের মোড়ে সড়ক পারের কাফেতে বসে শেষ বিকেলের ম্লান আলোতে কফি খেতে খেতে গোগ্রাসে পড়লাম। বলা হয়েছে, ১৯৫০-এর দশকে লী মকিংবার্ডের প্রথম খসড়া হিসেবে লিখেছিলেন এই উপন্যাস। মকিংবার্ডের প্রথম খসড়া ‘গো সেট এ ওয়াচম্যান’ কিনা তা এই উপন্যাস পড়ে নিঃসন্দেহে বলা মুশকিল। এই উপন্যাসে লীর মকিংবার্ডের নায়িকা স্কাউট বড় হয়েছে, ২৬ বছর বয়সে সে নিউইর্য়ক থেকে এসেছে মেএকমে তার বুড়ো বাবা এটিকাসকে দেখতে। এই দেখার সময় তার চোখে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের মানবাধিকারকেন্দ্রিক সামাজিক অস্থিতি ও প্রতিক্রিয়াশীলতা তখনও যায়নি। মানবাধিকার সম্প্রসারণে কেবলমাত্র শ্বেতাঙ্গরাই বাধা কিংবা সকল ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গরাই এর সুযোগ্য দাবিদার বা লক্ষ্য, তা লী এই উপন্যাসে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে সকলকে এক্ষেত্রে সচেতন পাহারাদার নিযুক্তির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। লী এই উপন্যাস লিখেছেন মকিংবার্ডের সহজ ও ললিত ভাষায় আবেগবর্জিত উপলব্ধির প্রতিফলন ঘটিয়ে। এই উপলব্ধির বিতর্কিত অবয়ব দেখা যায় যখন স্কাউট বড় হয়ে প্রকারান্তরে এবং ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে বলতে ও ফুটিয়ে তুলতে চান যে, মকিংবার্ডে তিন দশক আগে তিনি যে মূল্যবোধকে আশ্রয় করে জীবনের পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তা সর্বাংশে সত্য কিংবা অনুসরণীয় নয়। উপন্যাসটির এটিই প্রতিপাদ্য এবং এখানেই সম্ভবত এই উপন্যাসের ব্যর্থতা। আগে শুনেছিলাম সময়ান্তরে পাঠকের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু এই বইয়ে দুঃখ ও বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম পাঠক নয় লেখকের মৃত্যু ঘটেছে। যে মূল্যবোধ ও শালীনতা লীকে মানবাধিকারের অদমনীয় প্রতিফলক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ঔপন্যাসিক হিসেবে ১৯৬০-এর দশকে পৃথিবীব্যাপী বরণীয় করেছিল তার সম্পর্কে সন্দেহ এবং প্রশ্ন পশ্চাৎমুখী প্রতিক্রিয়াশীলতার চক্রের নিগড়ে দমিত করার এক অপচেষ্টা বলে এই বইয়ে পাহারাদার বা ওয়াচম্যানের কথিত প্রয়োজনীয়তা লী আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। যুগ বিবর্তনের ফলশ্রুতি হিসেবে আমাদের পাওয়া মূল্যবোধের বিপরীতে তিনি বলতে চেয়েছেন, প্রত্যেক মানুষ একজন পারস্পরিক সম্পর্কবিহীন দ¦ীপসদৃশ্য এবং সেজন্যই তার ওয়াচম্যান তার বিবেক, যা সর্বজনীনতায় শক্তি পাওয়ার নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬০-এর দশকে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে যে মানবাধিকার আন্দোলন ও চেতনাবোধ পৃথিবীব্যাপী সঞ্চালিত হয়েছিল এবং যার প্রভাব পরবর্তী কয়েক যুগ ধরে আফ্রিকার জিম্বাবুয়ে ও দক্ষিণাঞ্চলে মানবাশ্রয়ী চেতনাবোধ সৃষ্টি করতে সহায়ক হয়েছে, তার এক দার্শনিক এবং প্রাণস্পর্শী রূপ দিয়েছিলেন লী তার মকিংবার্ডে। সেই দর্শন ও প্রাণস্পর্শী উপলব্ধি থেকে তাকে এই শতাব্দীর প্রথম ভাগে দূরে সরিয়ে দেয়ার ভিন্নতর চেষ্টা অসংবেদনশীলতায় ঢেকে দিয়ে সমকালীন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের ফার্গুসন বা জ্যাকসনের কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে অপসমাজ নীতির পটেও মুছে ফেলতে পারবে না। এখনও পৃথিবীর অধিকাংশ এলাকায় সব পর্যায়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি কিংবা সকল মানুষ সমান হারে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। এখনও অমানবিক যুদ্ধ থেকে আশ্রয়প্রত্যাশী অত্যাচারিত মানবতাকে প্রবৃদ্ধির অহমিকায় আশা ও নিরাপত্তার উপকূল থেকে সরিয়ে দিতে চায় বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সমতার বিরোধী বিত্তশালী প্রাগ্রসর মানুষই। প্রেসিডেন্ট জেফারসনের সেই বিখ্যাত দার্শনিক উক্তি- সকল মানুষ সমান হয়ে সৃষ্ট হয়েছে- তার যথাযোগ্য উত্তরাধিকার এখনও সর্ব সমাজ অর্জন করেনি। এই সময়ে এক্ষেত্রে মকিংবার্ডে অনবদ্যভাবে পরিস্ফুটিত সমতার ও সামাজিক একতার দর্শনের বিপক্ষে একই লেখক ‘টু সেট এ ওয়াচম্যান’-এ কেমন করে লেখেন তা বোঝা কষ্টকর। মনে হয় ‘গো সেট এ ওয়াচম্যান’ না লিখলে বা প্রকাশ না করলেই লী ভাল করতেন। মানবাধিকার ও মানবিক চেতনাবোধের পতাকাধারী হিসেবে মকিংবার্ডের লী আমাদের চেতনায় চিরকাল জেগে থাকবেন। তবে ওয়াচম্যানের সাবধানবাণী শোনানোর বাজপাখি হিসেবে তিনি নিশ্চিতভাবে বিস্মৃতির অতল গুহায় হারিয়ে যাবেন।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সংসদ সদস্য