১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মানুষকে ক্ষুদ্র ভাবতে নেই

  • বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

আমলাতন্ত্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ধর্মজ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। এই প্রভাবের দরুন এসব দল যুক্তিতে বিশ্বাসী নয়। ধর্ম যুক্তিবহির্ভূত, আর যুক্তি ও ধর্ম পরস্পরবিরোধী। আবার পরস্পরবিরোধিতা ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। ক্ষমতা বাদে আইডেন্টিটি রাজনীতি হয় না। ক্ষমতা, অর্থাৎ শুদ্ধতা, শুদ্ধতা হচ্ছে ধর্মের অন্তঃসার। এই অন্তঃসার হচ্ছে ধর্মের বাস্তবতা। ধর্ম, সেজন্য, মিশ্রিত, বৈপরীত্যভিত্তিক ডিসকোর্স। এই ডিসকোর্সের মধ্যে আকর্ষণ কম, যুদ্ধংদেহী মনোভাব বেশি। এই মনোভাব একত্র করে তৈরি হয় আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব, ধর্মের আমলাতন্ত্র পুরোহিত, মোল্লা, যাজক সৃষ্ট, ধর্মজ সংস্কৃতি আমলাতন্ত্র ছাড়া তৈরি হয় না। তিন দশকের ধর্মজ সংস্কৃতি যেভাবে তৈরি হয়েছে, তার ব্যাখ্যা জরুরী। দুই মহাযুদ্ধ উদ্ভূত মানুষী মাইগ্রেসন, কলোনিয়ালিজম এবং ডি-কলোনিয়াজেসন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপ্লব; সেই সঙ্গে যুক্ত দুর্ভিক্ষ, এথনিক ক্লিনসিংয়ের মতো পৌনঃপুনিক ঘটনা ধর্মজ সংস্কৃতিকে পাঁচ মহাদেশে শক্তিশালী করেছে। এই শক্তিশালী করার অর্থ ধর্মজ আমলাতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। পাশ্চাত্যের মেট্রোপোল, যেমন লন্ডন, প্যারিস, স্টকহোম, বার্লিন এবং নিউইয়র্কের মতো শহরগুলো; অন্যদিকে প্রাচ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের মেট্রোপোল, যেমন দিল্লী, ইসলামাবাদ, ঢাকা, কলম্বো, দুবাই, কায়রো, লিবিয়া বদলে দিয়েছে ধর্মজ আমলাতন্ত্রের শহরগুলো : এইসব পরিবর্তন রূপান্তরিত করেছে পেশা, সাংস্কৃতিক উৎপাদন ঘণ্টা থেকে ঘণ্টায়। নির্বাসন, এমিগ্রে, রিফিউজি জমি থেকে উন্মূল হয়েছে : ফিলিস্তিন একটা ভূখ-ের নাম নয়, ফিলিস্তিন একটা মহাদেশের নাম, যে মহাদেশ ঘিরে ধরেছে একটা বিশাল ভুবন, এই ভুবনের বিষণœতার শেষ নেই। ধর্ম সর্বত্র, আবার ধর্ম কোথাও নেই, ধর্ম এবং ধর্মহীনতার আখ্যান বলেছেন সালমান এবং ভিএস নইপাল, যে দরজা খুলেছেন সর্বপ্রথম কনরাড। আমরা এইসব লেখকের উপাখ্যান পড়ে নেহাত ঈশ্বর সম্বন্ধে জানি না, আমরা বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্যে প্রবেশ করি- বিভিন্ন অভিজ্ঞতা যেন বিশাল ক্ষমতা এবং বিশাল বিস্তৃত ঐতিহাসিক আন্দোলন, যেখান থেকে তৈরি হচ্ছে প্রত্যহ ধর্মজ সংস্কৃতি। ধর্মজ সংস্কৃতি ও ধর্মজ আমলাতন্ত্র পরস্পরকে শক্তিশালী করে চলেছে। বর্তমান পৃথিবীতে আমরা কি তাই দেখছি না? আবার এও তো দেখছি, ধর্মজ সংস্কৃতি বাদ দিয়ে আমলাতন্ত্র স্বতন্ত্রভাবে বিকাশ লাভ করছে।

এই স্বতন্ত্র বিকাশ ভাববার মতো। ধর্মের দিক থেকে নয়, জীবনযাপনের দিক থেকে আমলাতন্ত্র আমাদের ঘিরে ধরেছে। আমরা যা-কিছু করি না কেন, আমাদের খুব সম্ভব অনুমতি নিতে হয়। এই অনুমতি রাষ্ট্রের কাছ থেকে, সরকারের কাছ থেকে, কখনও কখনও আদালত থেকে। এই অবস্থাটা মেনে নেয়া যায় না। একটা গবেষণাপত্রে পড়েছি : আমরা কোন্ ধরনের চাল খাব, তার অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি কৃষকের কাছ থেকে নয়, চালের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। আমাদের নির্ভরশীলতা বেড়ে চলেছে, শক্তিশালী রাষ্ট্রের ওপর শক্তিশালী সরকারের ওপর। এই নির্ভরশীলতা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে।

মার্লে পোঁতের একটা কথা মনে পড়ছে : তাঁর বিখ্যাত ফেনোমেনোলজি অব পারসেপসনের কথা। পৃথিবী আমরা যা ভাবি তা নয়, পৃথিবী তা-ই যার মধ্যে আমরা বেঁচে থাকি। আমি খোলামেলা পৃথিবীর কাছে। আমার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সন্দেহ তো হয়। মার্লে পোঁতের শান্ত বাস্তবতা আমাদের শেখায় : আমরা অর্থ খুঁজতে বাধ্য। আমাদের অস্তিত্বের চারপাশে আমলাতন্ত্র। রাষ্ট্রের চারপাশে আমলাতন্ত্র, সরকারের চারপাশে আমলাতন্ত্র এমনকি আদালতের চারপাশে আমলাতন্ত্র। আমরা সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র মানুষ, আমাদের জীবন কোন অর্থ তৈরি করে না। জেরার্ড ম্যানলি হপকিন্স যত উচ্চৈঃস্বরে বলুন না : পৃথিবী অর্থে ভরপুর। কোন্্ অর্থ? কিসের অর্থ? বরং একটা অর্থহীনতা আমাদের অস্তিত্ব ঘিরে আছে। সেখান থেকে পালাবার উপায় নেই। আমরা সাধারণ মানুষ, আমরা ক্ষুদ্র মানুষ, আমাদের জীবনের অর্থ অনবরত তৈরি করে দেয় রাষ্ট্র কিংবা সরকার কিংবা আদালত, আমরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। এই তাকিয়ে থাকাটা ব্যাখ্যা করেছেন জাঁ পল সার্ত্র : তিনি বলেছেন : আমরা স্বাধীন থাকতে বাধ্য হই। বাধ্য হওয়াটা রাষ্ট্র, বাধ্য হওয়াটা সরকার, বাধ্য হওয়াটা আদালত। আমরা কি কখনও বলতে পারব না : রাষ্ট্র ছাড়া সরকার ছাড়া আদালতের ব্যাখ্যা ছাড়া আমরা স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে চাই। এভাবে বেঁচে থাকাটা হচ্ছে আমলাতন্ত্র ছাড়া বেঁচে থাকা। কবে এই অবস্থায় আমরা পৌঁছতে পারব।

আমরা অন্য প্রণীত অর্থের মধ্যে বেঁচে থাকতে বাধ্য। জাঁ পল সার্ত্র অন্য দিক দিয়ে অর্থের মধ্যে প্রবেশ করেছেন। কাফকা ট্রায়াল উপাখ্যানে জোসেফ স্কে. সমস্যা তুলে ধরেছেন। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন আইনের প্যারালাল অর্থের পর অর্থের যেন শেষ নেই। অর্থ চ্যালেঞ্জ করেছে অনিঃশেষ সম্ভাবনা। মার্লে পোঁত অস্তিত্বের একটি মাত্র অর্থ আমাদের দেন না, তিনি জীবনযাপনের একটি মাত্র অর্থের বদলে বহুবিধ অর্থ আমাদের উপঢৌকন দেন। এ জন্য কি জাঁ পল সার্ত্র বলেছেন কিংবা বলতে বাধ্য হয়েছেন আমরা, সবাই একটি থিসিস ও একটি এন্টি-থিসিসের মধ্যে বেঁচে থাকি।

মৌলবাদী রাজনীতি মানুষকে ক্ষুদ্র ভেবে, মানুষকে আগুনপোড়া কাঁচামাল ভেবে মার খেয়েছে। সেখান থেকে উঠে দাঁড়াতে পারেনি। তেমনি ভ্যাট নিয়ে রাষ্ট্র ও সরকার ও অর্থমন্ত্রী মানুষকে ক্ষুদ্র ভেবে মার খেয়েছে।

মানুষ সব অবস্থাতেই বড়। এই সত্য ভুলে গেলে আমলাতন্ত্রের শক্তিকে মহান ভাবতে হয়।

মানুষকে কোন অবস্থাতে ক্ষুদ্র ভাবতে নেই। ক্ষমতার অহঙ্কারে ক্ষমতাবানরা মিথ্যার দম্ভে এখানে পৌঁছান। কিন্তু কিছুতেই বোঝেন না, বুঝতে চান না, এখান থেকে কোথাও পৌঁছানো যায় না। আমলাতন্ত্র কোন অবস্থাতেই ক্ষমতা নয়।