২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দুটিকে একীভূত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন

  • প্রজ্ঞাপন জারি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ অবশেষে ৫ বছর ৫ মাস ২০ দিন পর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১ এবং ২ কে একীভূত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। বিচারপতি আনোয়ারুল হককে চেয়ারম্যান করে তিন সদস্যের এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ কর্মরত সদস্য বিচারপতি মোঃ শাহিনুর ইসলাম ও সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতি মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী। তবে, ‘অপর ট্রাইব্যুনালটি পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত অগঠিত অবস্থায় থাকবে।’ ট্রাইব্যুনালে থাকা বাকি চার জন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীন, বিচারপতি মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম এবং বিচারপতি মজিবর রহমান মিয়া হাইকোর্টে ফিরে যাবেন। মঙ্গলবার আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন এবং বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মোঃ জহিরুল হক স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্তের কথা জানা গেছে।

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এর বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বিবেচনায় উক্ত ট্রাইব্যুনাল দুটিকে একীভূত করে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন আবশ্যক। সে লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ কর্মরত সদস্য বিচারপতি আনোয়ারুল হককে চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ কর্মরত সদস্য বিচারপতি মোঃ শাহিনুর ইসলামকে সদস্য এবং সুপ্রীমকোর্টের পরামর্শক্রমে বিচারপতি মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দীকে সদস্য করে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে অপর ট্রাইব্যুনালটি পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত অগঠিত অবস্থায় থাকবে বলে জানানো হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল হতে হাইকোর্ট বিভাগে প্রত্যাবর্তনকারী বিচারপতিগণের অনুকূলে ট্রাইব্যুনালে কমর্রত থাকাকালে প্রদত্ত সকল নিরাপত্তা সুবিধাসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য সুবিধাদি অব্যাহত থাকবে। প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ এর প্রশাসনিক ও বিচার সংক্রান্ত সকল বিষয় পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সম্পন্ন হবে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল তাদের বিচারের জন্য পুরনো হাইকোর্ট অঙ্গনে স্থাপন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এ পর্যন্ত ২১টি মামলায় ২৪ জনকে দ- প্রদান করা হয়েছে। বর্তমান মামলার সংখ্যা কমে আসায় কারণে ট্রাইব্যুনাল দুটি স্থলে একটি নিষ্ক্রিয় ও একটি সচল রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত দু’টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মধ্যে একটিকে নিষ্ক্রিয় করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। মঙ্গলবার বিকেলে ট্রাইব্যুনাল-১ সক্রিয় রেখে ট্রাইব্যুনাল-২ নিষ্ক্রিয় করার এ প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১০টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটির বিচার কাজ চলছে। একটি মামলা আমলে নেয়া হয়েছে। অন্যগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক জনকণ্ঠকে বলেছিলেন, মামলা কমার কারনে ট্রাইব্যুনাল দুটির স্থলে একটি করা হবে। অপরটি নিষ্ক্রিয় থাকবে। মামলা বাড়লে প্রয়োজনে দুটি কেন তিনটি ট্রাইব্যুনাল করা হবে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর দুটি বিধি সংশোধন করা হয়েছে। দুটি ট্রাইব্যুনালের মধ্যে একটি না থাকলে যেন একটিই অনুপস্থিত ট্রাইব্যুনালের কাজ করতে পারেন, এমন বিধান রেখে বিধি দুটি সংশোধন করা হয়। স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলার সংখ্যা বাড়া এবং দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২০১২ সালের ২২ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হয়। ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত দুটি ট্রাইব্যুনালে ২১টি মামলার রায় হয়েছে। তার মধ্যে ২৪ জনকে বিভিন্ন দ- প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ জনকে মৃত্যুদ-, এক জনকে যাবজ্জীবন, একজনকে ৯০ বছরের কারাদ- ও ৫ জনকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করা হয়। আন্তর্জার্তিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, ১০টি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২, ১১টি রায় প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালের দেয়া দ-ের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে ৫টি মামলার চ’ড়ান্ত নিষ্পত্তি হলেও এখন পর্যন্ত তিনটি মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়নি।

এদিকে দুটি ট্রাইব্যুনালের পুনগঠনের আগে মঙ্গলবার দুটি ট্রাইব্যুনালে তিনটি মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নেত্রকোনার দুই রাজাকার ননী ও তাহেরের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ১৮ তম সাক্ষী সুবোধ চন্দ্র দেব রায়ের জবানবন্দী। জামালপুরের ৮ রাজাকারের অভিযোগের ওপর শুনানির দিন নির্ধারণ ও যশোরের তিন রাজাকারের অভিযোগ থেকে অব্যাহতির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের রিভিউ আবেদন ওপর আদেশ।

ননী-তাহের ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় সমানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেত্রকোনার দুই রাজাকার ননী ও তাহেরের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ১৮তম সাক্ষী সুবোধ চন্দ্র দেব রায় জবাবন্দী প্রদান করেছেন। বুধবার আসামি পক্ষের আইনজীবী সাক্ষীকে জেরা করার জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। সাক্ষী তার জবানবন্দীতে বলেছেন আসামি ননী ও তাহের আমার মেসো রামচন্দ্র তালুকদারকে গুলি করে পানিতে ফেলে দেয়। মেসো নিঃসন্তান ছিলেন।

সাক্ষী তার জবানবন্দীতে বলেন, আমার নাম সুবোধ চন্দ্র দেব রায়। আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ৫৬ বছর। আমার ঠিকানা গ্রাম বাইশদার, থানা ও জেলা-নেত্রকোনা। আমি বর্তমানে বিরামপুর বাজারে সাইকেল রিক্সা মেরামত করি। ১৯৭১ সালের ১৫ নবেম্বর আনুমানিক ১১টার দিকে বাড়িতে ছিলাম। ঐ সময় বিরামপুর বাজারের দিক হতে গুলির শব্দ পাই। কিছুক্ষণ পর আমি বাড়ি হতে বিরামপুর বাজারে গিয়ে জানতে পারি আসামি ওবায়দুল হক তাহের ও আতাউর রহমান ননীর নেতৃত্বে নেত্রকোনা শহর হতে একদল রাজাকার বিরামপুর বাজারে এসে আক্রমন করে বাজার হতে শান্ত ভাই আমার আপন মেসো (খালু) রামচন্দ্র তালুকদার লেবু, ইসলাম উদ্দিন, সিদ্দিকুর রহমান, মুক্তা ভাইকে আটক করে বেঁধে ফেলে। তারা বিরামপুর বাজারের পাশে মিজানুর রহমানের বািড় আক্রমণ করে তাকেও বেঁধে ফেলে। রাজাকাররা আটকৃতদের নিয়ে যাওয়ার পথে ইসমাইল নামে এক রাখাল ছেলেওকে আটক করে তাকেও নিয়ে যায়। আটককৃত সকলকে লক্ষ্মীগঞ্জ খেয়াঘাটে পাকিস্তানী আর্মিদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। আমার মেসো রামচন্দ্র তালুকদার লেবু পরিচয় পেয়ে তাকে আসামি তাহের গুলি করে হত্যা করে। এর লাশ পানিতে ফেলে দেয়।

রিভিউ আবেদন খারিজ ॥ একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক ১২ আসামির মধ্যে ৩ জন আসামিকে দেয়া অব্যাহতির বিরুদ্ধে করা রিভিউ আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নের্তৃত্বে তিন সদস্যে বেঞ্চ এই আদেশ দেন। অব্যাহতি পাওয়া ৩ আসামি হলেন আকরাম হোসেন (৫৯), অজিহার মোড়ল ওরফে ওজিয়ার মোড়ল (৬৪) ও মশিয়ার রহমান (৬০)। এর মধ্যে মশিয়ার রহমান পলাতক রয়েছেন। গতকাল ট্রাইব্যুনালে রিভিউ আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর তাপস কান্তি বল।

জামালপুরের ৮ রাজাকারের চার্জ হিয়ারিং ৩০ সেপ্টেম্বর ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামালপুরের আট রাজাকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের উপর শুনানীর জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান বিাচরপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মোঃ মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মোঃ শাহিনুর ইসলাম। এই আট আটজন হচ্ছেন আশরাফ হোসেন, অধ্যাপক শরীফ আহম্মেদ ওরফে শরীফ হোসেন, মোঃ আবদুল মান্নান, মোঃ আবদুল বারী, মোঃ হারুন, মোঃ আবুল হাশেম, শামসুল হক ওরফে বদর ভাই ও এস এম ইউসুফ আলী ।

প্রসিকিউশনের আবেদনে গত ৩ মার্চ আশরাফ হোসেনসহ আটজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরোয়ানা জারির পর ওই দিনই বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে অভিযান চালিয়ে জামালপুর শহরের নয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে শামসুল হককে ও ফুলবাড়িয়ার জাহেদা শফির মহিলা কলেজ গেট প্রাঙ্গণ থেকে ইউসুফ আলীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই দুজনকে তদন্তের স্বার্থে ৬ মার্চ সেফহোমে নিয়ে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন।