১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শান্তি মিশনে বাংলাদেশী সেনাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই ॥ অতুল খারে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ শান্তি মিশনে কর্মরত সেনাদের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে আরও কঠোর হচ্ছে জাতিসংঘ। তবে বাংলাদেশী সেনাদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির কোন অভিযোগ এখনও উঠেনি। এছাড়া শান্তি মিশনে বাংলাদেশ সেনা সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসাযোগ্য। মঙ্গলবার জাতিসংঘ মাঠসহায়তা বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন। শান্তি মিশনে কাজের চ্যালেঞ্জ ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে জানান অতুল খারে।

তিন দিন বাংলাদেশ সফর শেষ মঙ্গলবার ঢাকা ত্যাগ করেন অতুল খারে। মঙ্গলবার ভারপ্রাপ্ত সেনা প্রধান, মহাপুলিশ পরিদর্শক ও গাজীপুরে বিপসট পরিদর্শন করেন জাতিসংঘ আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল। ঢাকা ত্যাগের আগে হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে অতুল খারে বলেন, শান্তি মিশনে কর্মরত সেনাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। গত বছর বিভিন্ন মিশনে ৪৩ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠে। তবে বাংলাদেশের কোন সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেনি। বাংলাদেশের বেলায় এই অভিযোগ প্রায় শূন্যের কোঠায়। শান্তি মিশনের সেনাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ উঠলে জাতিসংঘ দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করার জন্য আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান। শান্তি মিশনে বাংলাদেশের সেনাদের প্রশংসা করে অতুল খারে বলেন, বিশ্বের ৩৭টি মিশনে এখন এক লাখ ৭৫ হাজার সেনা কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন ৯ হাজার ৩৯৮ জন। তাদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসাযোগ্য।

এক প্রশ্নের উত্তরে অতুল খারে বলেন, জাতিসংঘের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ব্যবসার সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ বাংলাদেশেরও রয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা থাকে। এসব পণ্য বাংলাদেশ চাইলে সরবরাহ করতে পারে। জাতিসংঘে ওষুধ, পোশাক শিল্প পণ্য ইত্যাদি সরবরাহ করতে পারে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ গত বছর প্রায় ২২০ কোটি টাকার পণ্য ক্রয় করেছে বলেও তিনি জানান।

জাতিসংঘের শান্তি মিশনে নারী সেনাদের কাজের সুযোগ রয়েছে বলেও জানান জাতিসংঘ আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি জানান, হাইতি ও কঙ্গোতে বিভিন্ন দেশের অনেক নারী সেনা সদস্য কাজ করছেন। এখানে আরও নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। শান্তি মিশনে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হলে ইংরেজী ভাষার পাশাপাশি ফ্রেঞ্চ ভাষাও শেখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে জানান অতুল খারে। তিনি বলেন, শান্তি মিশন যেসব দেশে রয়েছে, সেসব দেশে ফ্রেঞ্চ ভাষার প্রাধান্য রয়েছে। তাই ভালভাবে ফ্রেঞ্চ শেখাও জরুরী বলে তিনি জানান।

অতুল খারে বলেন, শান্তি মিশনে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে কাজ করতে হয়। এই চ্যালেঞ্জ দিনে দিনে বাড়ছে। সে কারণে সেনাদের অনেক দক্ষ ও কৌশলি হতে হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্যা আর্থ’ পুরস্কার পাওয়ায় অভিনন্দন জানান জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি।

ভারপ্রাপ্ত সেনা প্রধানের সঙ্গে বৈঠক ॥ ভারপ্রাপ্ত সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে বাংলাদেশ সফররত জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব ফিল্ড সাপোর্ট (ডিএফএস)-এর আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারে মঙ্গলবার ঢাকা সেনানিবাসস্থ সেনাসদর দফতরে সৌজন্য বৈঠক করেন। বৈঠককালে তাঁরা পারস্পরিক কুশলাদি বিনিময় ছাড়াও পেশাগত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাব্বির আহমেদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন¦য়কারী রবার্ট ওয়াটকিন্স উপস্থিত ছিলেন।

আইজিপির সঙ্গে সাক্ষাত ॥ বাংলাদেশ পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারে বলেছেন, যখন মানবতা প্রয়োজন, তখন আপনারা অত্যন্ত মানবিক। আর যখন শক্তি প্রয়োজন, তখন সেটাতেও পিছিয়ে থাকেননি। জনশৃঙ্খলা রক্ষায় অত্যন্ত দক্ষ। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা সত্যিই পেশাদার। মঙ্গলবার পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করেন তিনি। এ সময় তিনি বাংলাদেশ পুলিশের শান্তিরক্ষা মিশনে অতুলনীয় ভূমিকা রাখায় ভূয়সী প্রশংসা করেন।

জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারে বলেন, তিনটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশকে ধন্যবাদ না দিলেই নয়। আড়াই দশক ধরে বিশ্ব শান্তিরক্ষায় দক্ষ ও পেশাদার বাংলাদেশ পুলিশের অবদান, নারী পুলিশ প্রেরণ এবং বাংলাদেশে কর্মরত জাতিসংঘের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা। অতুল খারে বলেন, বাংলাদেশের পুলিশ পৃথিবীর নানা দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনবদ্য অবদান রাখছেন। নিজ দেশেও সমাজ ‘পরিবর্তনের প্রতিনিধি’ হিসেবে কাজ করছেন। জাতিসংঘের অধীনে নারীর প্রতি সহিংসতা, পারিবারিক সহিংসতা, নারী অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের পুলিশের অভিজ্ঞতা তারা নিজ দেশে কাজে লাগাতে সক্ষম হচ্ছেন। দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণ পরিবর্তনে এটা অত্যন্ত ইতিবাচক প্রয়াস বলে তিনি মন্তব্য করেন। পুলিশ সংস্কার কর্মসূচীর (পিআরপি) কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করে পিআরপির তৃতীয় পর্যায়ে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের অর্থায়নে বাংলাদেশ পুলিশের উদ্যোগে কিছু থানায় ‘নারী সহায়তা কেন্দ্র’ স্থাপনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, লিঙ্গ ভিত্তিক অপরাধ দমন, নারীর ক্ষমতায়নে এসব কেন্দ্র কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এ সময় আইজিপি বলেন, বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যগণের সক্ষমতা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা পরীক্ষিত। এমনকি আফ্রিকায় ‘ইবোলা ভাইরাস’ সংক্রমণের সময়ও আমরা শান্তি প্রক্রিয়া থেকে পিছপা হইনি। বর্তমান মিশনগুলোতে বাংলাদেশের পুলিশ মোতায়েন কমে গেছে। ইউএনপোল এবং এফপিইউ মিশনগুলোতে বাংলাদেশ পুলিশের নতুন ইউনিট নেয়ার বিষয়ে তিনি আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ফ্রেঞ্চ ভাষাভাষী দেশে ভাষাগত দক্ষতা নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের একটি ইউনিট অপেক্ষমাণ রয়েছে বলে জানান আইজিপি। শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি যৌক্তিকতা স্বীকার করে তিনি বলেন, বিষয়টি ডিপার্টমেন্ট অব পিস কিপিং অপারেশন্সকে অবগত করা হবে।

সাক্ষাতকালে বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ওয়াটসিন এবং বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (এডমিন এ্যান্ড অপস্) মোখলেসুর রহমান, অতিরিক্ত আইজিপি মইনুর রহমান চৌধুরী, ডিআইজি (মিডিয়া এ্যান্ড প্ল্যনিং) লুৎফর রহমান ম-ল, এআইজি (এমএ্যান্ডপিআর) নজরুল ইসলাম এবং এআইজি (ইউএন এ্যাফেয়ার্স) শেখ রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

বিপসট পরিদর্শন ॥ গাজীপুর থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাসে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সার্পোট অপারেশন ট্রেনিং (বিপসট) মঙ্গলবার পরিদর্শন করেছেন অন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল (ইউএসজি) অব ডিপার্টমেন্ট অব ফিল্ড সাপোর্ট (ডিএফএস) অতুল খেরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলটি বিপসটে এসে পৌঁছলে কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল মাকসুদুর রহমান পিএসসি অভ্যর্থনা জানান। প্রতিনিধি দলটি বিপসটের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পরিদর্শন করেন। পরে প্রশাসনিক ভবনের কনফারেন্স রুমে এক বৈঠকে মিলিত হয়ে বিভিন্ন শান্তি রক্ষা বিষয়ের ওপর বিপসটের কমান্ড্যান্টের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পরিদর্শনকালে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকা- এবং বিপসট’র প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিনিধি দলকে অবহিত করা হয়। পরে প্রতিনিধি দলটি বিপসট’র বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও মাঠ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ সুবিধাদি পরিদর্শন করেন। এছাড়াও পরিদর্শন দল বিদ্রোহী দল দ্বারা আক্রান্ত জাতিসংঘের উদ্বাস্তু ক্যাম্পে বসবাসরত অসামরিক লোকদের ওপর আক্রমণ বা হামলা ও পরবর্তীকালে উঁচুমানের শান্তিরক্ষী বাহিনী কর্তৃক উদ্ধার অভিযানের মহড়া প্রত্যক্ষ করেন। বিকেল পর্যন্ত পরিদর্শনকালে অন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল (ইউএসজি) অব ডিপার্টমেন্ট অব ফিল্ড সাপোর্ট (ডিএফএস) অতুল খের বিপসটের প্রশিক্ষণ মান এবং প্রশিক্ষণ সুবিধাদির বিষয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বিপসট’র উন্নতি কামনা করেন। তিনি প্রায় তিন দশক ধরে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের মহতি অবদানের উচ্ছসিত প্রশংসা করেন।

উল্লেখ্য, বিপসট বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর একটি শান্তিরক্ষা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ প্রদানকারী আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান, যেখানে দেশী এবং বিদেশী শান্তিরক্ষীরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।