১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জিএসপি ইস্যুতে ১৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রতিনিধি দল আসছে

  • অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ শেষে পুনর্বহালে ঘোষণা আসার সম্ভাবনা

এম শাহজাহান ॥ যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি স্থগিতের কোন ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেশের রফতানি বাণিজ্যে পড়েনি। রফতানি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তবে জিএসপি ইস্যুর সঙ্গে রফতানি বাণিজ্যের ভাবমূর্তির বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার না হলে সারাবিশ্বে একটি ভুল বার্তা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে যে, এখানে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি। নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা হয়নি। আর তাই শুধুমাত্র ইতিবাচক ভাবমূর্তির জন্য জিএসপি বা অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা বাংলাদেশের জন্য জরুরী। এলক্ষ্যে সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগে জিএসপি পুনর্বহালে জোর দেয়া হচ্ছে। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর জিএসপি ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসটিআর প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসছেন। ওই সময় বাংলাদেশ এ্যাকশন প্ল্যানের ১৬টি শর্তের অগ্রগতি স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করবে ইউএসটিআর। এরপরই জিএসপি সুবিধা পুনর্বহালের ঘোষণা আসতে পারে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের যে ৫ হাজার পণ্যে জিএসপি সুবিধা চালু রয়েছে তার মধ্যে দেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যসামগ্রী নেই। তবে প্লাস্টিক, সিরামিক, তামার তৈজসপত্র, গলফ খেলার উপকরণ রয়েছে। গত ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রফতানির পরিমাণ ৫৫০ কোটি ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৯২ শতাংশই তৈরি পোশাক পণ্য, যা জিএসপি সুবিধার বাইরে। মোট রফতানি আয়ের ১ শতাংশেরও কম রফতানি হয় জিএসপি সুবিধার আওতায়। বরং বাংলাদেশী তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করার জন্য সে দেশের সরকারকে বেশি হারে শুল্ক দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা গত বছর জিএসপির আওতায় ৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের তামাক, ক্রীড়া সরঞ্জাম, সিরামিকস, চশমা ও প্লাস্টিক সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করেছেন। এতে ব্যবসায়ীরা শুল্ক ছাড় পেয়েছে ২০ লাখ ডলার। অপরদিকে ৪৯০ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে শুল্ক দিয়েছে ৭৩ কোটি ডলার।

এই বাস্তবতায় জিএসপি সুবিধা আদৌ বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন রয়েছে কি না জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, আর্থিক বিবেচনায় জিএসপি দেশের রফতানিতে কোন প্রভাব ফেলছে না। কোন দিন ফেলেনি, ভবিষ্যতেও এটি পেলে আহামরি কিছু হবে তা নয়। তবে এটি একটি ইমেজের বিষয়। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে এ সুবিধা বহাল রয়েছে, সেখানে আমাদের বাইরে রাখা হয়েছে। সেজন্য ব্যবসায়ীরা জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য বলছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া এ্যাকশন প্ল্যানের ১৬টি শর্ত বাংলাদেশ পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এখন বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধায় আওতায় নেয়া হবে এটাই প্রত্যাশা করছি।

এদিকে, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ১৬ দশমিক ৬২ শতাংশ শুল্ক দিয়ে পণ্য রফতানি করছে। অথচ ভারতের ক্ষেত্রে গড় শুল্কহার ২ দশমিক ২৯ শতাংশ, চীনের ক্ষেত্রে ৩ দশমিক ০৮ ও তুরস্কের ক্ষেত্রে তা ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। বাংলাদেশ সারা বিশ্বে তৈরি পোশাক রফতানিতে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের পর চতুর্থ অবস্থানে। গত ২০১৪ সালে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রে ৯৭০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে, সেখানে বাংলাদেশের রফতানি আয় ৫২৮ কোটি ডলার।

এদিকে, বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিলের জন্য ২০০৭ সালে আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার কংগ্রেস ফর ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন এএফএল-সিআইও নামের এ শ্রমিক সংগঠন ইউএসটিআরে মামলা করে। এটির মধ্যে এক ধরনের রাজনীতিও রয়েছে। জিএসপি ফিরিয়ে না দিতে যুক্তরাষ্ট্রে জোর লবিং করছে সরকার বিরোধীরা। এই ইস্যুতে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি মার্কিন চাপ অব্যাহত রাখতে কূটনৈতিক অপকৌশলের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। তাই এটিকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। সম্প্রতি তিনি মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের জানান, শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে জিএসপি সুবিধা দেয়া হয়নি।

জানা গেছে, জিএসপি সুবিধা বহাল না হলে বাংলাদেশের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে না ধরে বরং ষড়যন্ত্রকারীরা প্রপাগান্ডা চালানোর সুযোগ পাবে। বিশ্বে একটি ভুল বার্তা ছড়িয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত যেসব দেশ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্য আমদানি করে, তাদের কাছেও একটি নেতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে এর মাধ্যমে। জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে পোশাক রফতানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী জনকণ্ঠকে বলেন, জিএসপি সুবিধার আওতায় কোনদিন পোশাক রফতানি হয়নি। তাই এটি থাকলেই কি আর না থাকলেই কি যায় আসে। আর্থিক দিক দিয়ে এটির কোন প্রভাব রফতানি বাণিজ্যে নেই। তবে এটিও ঠিক, জিএসপি বিষয়টি আমাদের ভাবমূর্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশকে প্রদত্ত জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয়ায় অন্যান্য আমদানিকারকদেশগুলো প্রভাবিত হতে পারে। বাংলাদেশী এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও এর দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। যদিও গত কয়েক বছরে বাংলাদেশী তৈরি পোশাক, বিশেষত ওভেন পোশাক রফতানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। গত দুই বছরে রফতানি আয় প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল ইউরোপিয়ান দেশগুলোয় ওভেন পোশাকের বাজার সম্প্রসারণের। যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি বাতিল করায় ইউরোপেও তার প্রভাব পড়বে কিনা, তাই এখন দেখার বিষয়।

জানা গেছে, বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিলের পেছনে শুরু থেকেই কাজ করেছে রাজনীতি। যার মূলে রয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল, দীর্ঘদিন টিকফা চুক্তি না করা, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা, গার্মেন্টস শ্রমিক আমিনুল হত্যাকা-ের বিচার ইস্যু, জিএসপি বাতিলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুরোধ সংবলিত ওয়াশিংটন টাইমসে প্রকাশিত প্রবন্ধ এবং সর্বোপরি ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের জিএসপি স্থগিতের পেছনে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে ড. ইউনূস ইস্যু।

এদিকে, জিএসপি সুবিধা স্থগিত হওয়ার কারণে পোশাক শিল্পখাত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে এ খাতটি। বিশেষ করে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও কানাডা যদি যুক্তরাষ্ট্রের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাহলে বড় ধরনের সঙ্কট হতে পারে। পোশাক শিল্পখাতে বিপর্যয় নেমে এলে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও জিএসপি স্থগিত হওয়ার পর এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি বেড়েছে। সামগ্রিক রফতানিও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের প্রথম সহসভাপতি মোঃ সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের রফতানি বাণিজ্যে জিএসপি এখন আর কোন ফ্যাক্টর নয়। পণ্যের কোয়ালিটি এবং দামের কারণে আমাদের সক্ষমতা এখন অনেক বেশি। তারপরও ভাবমূর্তির জন্য জিএসপি প্রয়োজন। তিনি বলেন, জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে সরকারকে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। এ্যাকশন প্লানের শর্তগুলো দ্রুত পূরণ করে তা ইউএসটিআরকে জানাতে হবে।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া