২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইন্টারনেটের দাম কমানো হলেও গ্রাহক কোন সুবিধা পাচ্ছেন না

ফিরোজ মান্না ॥ ইন্টারনেটের দাম কমানোর পরও গ্রাহক পর্যায়ে এর কোন সুবিধা পৌঁছেনি। লাভবান হচ্ছে আইআইজি (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) আইএসপি (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডর), মোবাইল আপারেটর, ওয়াইম্যাক্স ও কিউবি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যান্ডউইথের দাম বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) ৪১ শতাংশ কমিয়েছে। ব্যান্ডউইথ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কম দামে ব্যান্ডউইথ নিয়ে গ্রাহকদের কাছে আগের দামেই বিক্রি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন দামে প্রতি এমবিপিএস (মেগাবিট পার সেকেন্ড) ৬২৫ টাকা। আগে এর দাম ছিল এক হাজার ৬৮ টাকা। তখনও গ্রাহকদের কাছ থেকে যে টাকা নেয়া হতো এখনও একই দাম নেয়া হচ্ছে।

বিএসসিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম কমানো গ্রাহকেদের কোন লাভ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশে এই দাম কমানো হয়েছে। গ্রাহকরা যাতে কম দামে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন সে জন্য বিটিআরসিকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এই চিঠির অনুলিপি ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম ও সচিবের কাছেও দেয়া হয়েছে। গত এক সেপ্টেম্বর থেকে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথের দাম ৬২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিটিআরসিকে দেয়া চিঠিতে ৬টি সুপারিশের কথা বলা হয়েছে। এই সুপারিশগুলো এক সেপ্টেম্বর থেকেই বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। কিন্তু তারা না করায় গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম এক টাকাও কমেনি। এখনও আগের মতো আইআইজি, আইএসপি ও মোবাইল অপারেটররা ইচ্ছেমতো দামে ব্যান্ডউইথ গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করছে। এই কাজটি করতে হবে বিটিআরসিকে। তারা একটা নির্দিষ্ট দাম ধরে দেবে। যারা ব্যান্ডউইথ বিক্রি করছে তারা ওই নির্দিষ্ট দামের বেশি টাকা নিতে পারবে না। বরং ওই দামের চেয়ে কমে ব্যান্ডউইথ বিক্রি করতে পারবে। এটা না হলে গ্রাহকরা কম দামে ইন্টারনেট সুবিধা পাবে না। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট যেমন এই সুবিধা পাওয়ার কথা ওয়্যারলেস ইন্টারনেটেও একই সুবিধার রাখার জন্য সুপারিশ করা হয়। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এই সুবিধা কার্যকর হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে ইন্টারনেটের দাম কমানো হবে।

বিএসসিসিএলের এমডি বলেন, সাবমেরিন কেবল কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত আরেকটি স্টেশনে যুক্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে সোজা ঢাকায় অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে ঢাকার মগবাজার স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে এই তিন এলাকায় অপটিক্যাল ফাইবার থাকায় ব্যান্ডউইথের দাম কমানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু দেশের অন্য কোন এলাকায় অপটিক্যাল ফাইবার না থাকায় ব্যান্ডউইথের দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না। দেশের অন্য এলাকাগুলোতে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম কমাতে হলে সাবমেরিন কোম্পানিকে ভর্তুকি দিতে হবে। কারণ তিনটি এনটিটিএন কোম্পানি রয়েছে। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ সরবরাহ দিতে তাদের কেবল ভাড়া নিতে হবে। এই তিনটি কোম্পানি হচ্ছে ফাইবার এট হোম, সামিট কমিউনিকেশনস ও মেট্রো নেট। আর এদের কেবলের এত বেশি ভাড়া যে, তাতে সাবমেরিন কোম্পানিকে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকা ভর্তুকি গুনতে হবে। এ কারণেই সারাদেশে ইন্টারনেটের দাম কমানো সম্ভব হয়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের মানুষের কাছে ইন্টারনেট এখন অধিকার হিসেবে ভাবা হয়। অল্প কিছু জনগোষ্ঠীর জন্য ইন্টারনেটের দাম কমানো হয়েছে। বাকি বিরাট জনগোষ্ঠী এর বাইরে রয়ে গেছে। এমন প্রশ্ন প্রতিনিয়ত শুনতে হচ্ছে। একই দেশের নাগরিক হয়েও এটা একটা বৈষম্যই বলা চলে।

তথ্য প্রযুক্তিবিদরা মোস্তফা জব্বার বলেন, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম কমানোর বিষয়টি শুভংকরের ফাঁকি। এর আগেও বহু বার ইন্টারনেটের দাম কমানো হয়েছে। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে দাম কমেনি। গ্রাহকরা ইন্টারনেটের ব্যান্ডইউথ বেশি দাম দিয়ে কিনলেও গতি পাচ্ছে না। এটা ব্রডব্যান্ড ও ওয়্যারলেস ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে একই অবস্থা বিরাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেয়ার পর ইন্টারনেটের দাম কমানো হয়েছে। অথচ এর সুফল গ্রাহক পাচ্ছে না। পাচ্ছে আইআইজি, আইএসপি, ওয়াইম্যাক্স, কিউবিসহ যারা ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ বিক্রি করছে। গ্রাহকরা কোনভাবেই লাভবান হচ্ছে না। তাছাড়া এমন একটা ছোট দেশে মাত্র কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও ঢাকা শহরে ব্যান্ডউইথের দাম কমিয়ে সারাদেশের সঙ্গে এই তিনটি অঞ্চলের বিরাট বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে, যা নাগরিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। এক জনের বাড়ি যদি রংপুরে হয় সে কেন ঢাকার দামে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে না। তাকে কেন বেশি টাকা দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হবে। তাকে তাহলে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে ঢাকা বা চট্টগ্রামে থাকতে হবে। এটা কোন যৌক্তিকতার মধ্যে পড়ে না। এখান থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে শহরের সঙ্গে গ্রামের যে বৈষম্য সেটা বিভিন্ন শহরের ক্ষেত্রেও হয়ে যাবে। যারা এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা কি বুঝতে পারেন না ইন্টারনেট এখন ৫টি মৌলিক অধিকারের মতোই একটি বিষয়। উন্নত বিশ্বে ইন্টারনেটকেও মৌলিক অধিকার হিসেবে ধরা হচ্ছে। দেশে বাড়তি ব্যান্ডউইথ থাকার পরও ইন্টারনেটের গতি বাড়ানো হয় না। উল্টো নানা প্যাকেজের নামে ইন্টারনেটের দাম বেশি নেয়া হয়। এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ ইন্টারনেটের ব্যবহার করতে পারবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার এ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সাবেক সভাপতি হাবিবুল্লাহ এন করিম বলেন, কিছু লোকের মনোপলি ব্যবসার কারণে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমবে না। প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথের দাম যখন ৮০ হাজার টাকা ছিল তখনও তারা মনোপলি ব্যবসা করেছে। এখন ৬২৫ টাকা প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথের দাম হলেও এখনও ব্যবসা তাদের হাতেই রয়েছে। সরকার যদি ব্যান্ডউইথের দাম আরও কমিয়ে দেয় তার পরও তারা গ্রাহক পর্যায়ে ব্যান্ডউইথের দাম কমাবে না। তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে (বিটিআরসি) নানাভাবে ম্যানেজ করে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমাতে দিচ্ছে না। তারা যুক্তি দিচ্ছে ব্যান্ডউইথের দাম কম হলেও তাদের পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। তাদের অধিক সংখ্যক জনবল লাগছে। ফাইবারের দাও অনেক বেশি। এসব নানা কথা বলেই যাচ্ছে। অথচ তারা যে খরচের কথা বলছে তার কোন যুক্তি নেই। একবার ফাইবার স্থাপন করার পর কোন কারণে ছিঁড়ে না যাওয়া পর্যন্ত ওটা চলতেই থাকে। তামের মোট ব্যয়ের মধ্যে মাত্র ২০ শতাং ব্যয় হয় ব্যান্ডউইথ কেনার পেছনে। শতকরা ৮০ ভাগ ব্যয় দেখানো হয় অন্যান্য কাজে। যেগুলোর যুক্তিযুক্তি কোন কারণ নেই। এটা বিটিআরসি যদি সঠিকভাবে মনিটর করে তাহলে ইন্টারনেটের দাম গ্রাহক পর্যায়ে অর্ধেকে নেমে আসবে। কিন্তু এই কাজটি হচ্ছে না। এ কারণেই গ্রাহকরা কোন সুবিধা পাচ্ছে না।

এদিকে বিএসসিসিএলের এমডি মনোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যান্ডউইথ রফতানি শুরু করা হয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় ১০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ লিজ দেয়া হয়েছে ভারতকে। এই পরিমাণ ব্যান্ডউইথ রফতানি করে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) বছরে ১২ লাখ মার্কিন ডলার আয় করতে পারবে। প্রতি মেগাবিটের দাম ধরা হয়েছে ১০ মার্কিন ডলার। পর্যায়ক্রমে ব্যান্ডউইথের পরিমাণ ৪০ জিবিপিএস পর্যন্ত বাড়ানো হবে। ৪০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ রফতানি করা গেলে বছরে ৪৮ লাখ মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব হবে।

বিএসসিসিএলের এমডি বলেন, আমরা ভারতে ব্যান্ডউইথ রফতানি শুরু করেছি। সেখানে প্রতি মেগাবাইটের দাম ধরা হয়েছে ১০ মার্কিন ডলার। রফতানির কৃত ব্যান্ডউথের দাম বাংলাদেশে ব্যবহৃত ব্যান্ডউইথের দামের চেয়ে বেশি। দেশে প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ ১ হাজার ৬৮ টাকায় বিক্রি করা হতো। গ্রাহকের সাধ্যের মধ্যে রাখতে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম আরও কমিয়ে আনা হযেছে। এতে ইন্টারনেট ব্যবহারে বেশি সংখ্যক গ্রাহক তৈরি হবে। বর্তমানে ইন্টারনেট গ্রাহক রযেছে ৪ কোটি ৯৩ লাখ। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম কমিয়ে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত গ্রাহক বৃদ্ধি করা হবে। গ্রাহক পর্যায়ে দাম কমানোর বিষয়টি নির্ভর করবে ইন্টারনেট গেটওয়ে ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের ওপর। দেশে ইন্টারনেটের দাম নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে আগে থেকেই অসন্তোষ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও ইন্টারনেটের দাম কমানোর দাবি উঠেছে বিভিন্ন সময়ে।