২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিস্মিত কৃষ্ণকলি সেরেনা

  • মাহমুদা সুবর্ণা

গত এক বছর ধরে টেনিস বিশ্বে একটি চিত্রনাট্যের দৃশ্য খুবই স্বাভাবিক হয়ে পড়েছিল। ফাইনাল জিতেই সেরেনা উইলিয়ামসের বাঁধভাঙ্গা আনন্দ-উল্লাস। গত বছরের ইউএস ওপেন জিতে যেন নতুন করে শুরু করেছিলেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, ফ্রেঞ্চ ওপেন কিংবা উইম্বলডন। ফাইনাল মানেই যেন সেরেনার শিরোপা উচিয়ে ধরার দারুণ এক চিত্র। তবে ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালেই থেমে গেল তার জয়রথ। রবার্টা ভিঞ্চির কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গেলেন আমেরিকান টেনিসের এই জীবন্ত কিংবদন্তি।

এর ফলে স্টেফি গ্রাফকে ছোঁয়া হলো না সেরেনার। জেতা হলো না ক্যালেন্ডার গ্র্যান্ড সøাম। সেরেনাকে থামিয়ে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন রবার্টা ভিঞ্চি। বছরের শেষ গ্রান্ড সøাম টুর্নামেন্টের লড়াই থেকে ছিটকে পড়ে বড় অঘটনের জন্ম দিলেন বিশ্ব টেনিস র‌্যাংকিংয়ের এক নাম্বার তারকা। ইতালিয়ান টেনিস তারকা ভিঞ্চির কাছে হেরে ইউএস ওপেনের সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় নেন টেনিস র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ তারকা। গত বছর ইউএস ওপেন জিতে দারুণভাবেই গত মৌসুম শেষ করেছিলেন সেরেনা উইলিয়ামস। নতুন মৌসুমের শুরুটাও একইভাবে বছরের প্রথম গ্র্যান্ডসøাম টুর্নামেন্ট অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতে। এরপর নিজের ঝলক দেখিয়ে শুধুই এগিয়ে আসেন তিনি। ফ্রেঞ্চ ওপেনের পর উম্বলডনেও চ্যাম্পিয়ন। বছরের প্রথম তিন মেজর শিরোপা জিতে ক্যালেন্ডার গ্রান্ডসøাম জয়ের লক্ষ্য নিয়েই ইউ এস ওপেনের হার্ডকোর্টে খেলতে নামেন। শুরু থেকে খেলছিলেনও দোর্দ-প্রতাপে। কিন্তু সেই দৌড় থেমে গেল সেমিফাইনালেই। তাকে থামিয়ে দিলেন টেনিস র‌্যাঙ্কিংয়ের ৪৩ নাম্বারে থাকা ভিঞ্চি। সেইসঙ্গে সেরেনার অনেক রেকর্ড ছুয়ার হাতছানিকেই চুর্ণবিচুর্ণ করে দেন তিনি। অনন্য ইতিহাস গড়ার খুব কাছে গিয়েও পরাজয়ে হতাশ সেরেনা উইলিয়ামস। ম্যাচ শেষেই হতাশজনক কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ভিঞ্চি তার ক্যারিয়ারের সেরাটা দিয়ে খেলেই আমাকে হারিয়েছে। এমন পরাজয় আমার কাছে বেশ হতাশার যার ব্যাখা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। কারণ এই আসরের শিরোপা জিততে পারলেই বছরের চারটি গ্রান্ডসøাম জেতা হতো। তারপরও, ইতিবাচকভাবেই নিচ্ছি সব।’

১৯৯৮ সালে শেষ কোন প্রমীলা খেলোয়াড় হিসেবে একই বছরের সবকটি মেজর শিরোপা জয়ের রেকর্ড গড়েছিলেন স্টেফি গ্রাফ। আর এবার সেই কীর্তির কাছে পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গ। টেনিস বিশ্বের সেরা সেরা তারকাদের ভিড়ে কোন গ্র্যান্ডসøাম জেতাটাই এখন দুঃসাধ্য ব্যাপার। আর বছরের তিনটিতেই চ্যাম্পিয়ন সেরেনা শেষটিরও সেমিফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু অসামান্য সেই কীর্তি না গড়তে পারার হতাশা যে তাকে সারা জীবনই আঘাত করবে তা অনুমিতই। সেটা স্বীকার করেছেন সেরেনার কোচ প্যাট্রিক মোরাতোগলো, ‘এই টুর্নামেন্টের চাপটা অন্যগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ছিল। তাছাড়া সেমিফাইনালের ম্যাচটি অন্য ম্যাচগুলোর চেয়ে কম নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল। তার ক্যারিয়ারের শেষে আমরা তাকে সর্বকালের সেরা চ্যাম্পিয়ন বলব কিন্তু এটা ঠিকই মনে থাকবে যে সে ক্যালেন্ডার সøাম জিততে পারেনি।’

সেরেনা উইলিয়ামস পারেননি। তবে সেরেনা-বধের পর বেশিদূর এগুতে পারলেন না ৩২ বছর বয়সী ভিঞ্চিও। ফাইনালেই হেরে যান তিনি। আর তাকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউএস ওপেনের শিরোপা জিতলেন তারই স্বদেশী ফ্লাভিয়া পেনেত্তা। বছরের শেষ গ্র্যান্ডসøামের ফাইনালে ফ্লাভিয়া পেনেত্তা ৭-৬ এবং ৬-২ গেমে হারান রবার্তা ভিঞ্চিকে। সেইসঙ্গে নতুন এক মাইলফলকও স্পর্শ করেন ৩৩ বছর বয়সী পেনেত্তা। টেনিসের আধুনিক যুগে সবচেয়ে বেশি বয়সী প্রমীলা খেলোয়াড় হিসেবে প্রথম গ্র্যান্ডসøাম জয়ের স্বাদ পেলেন তিনি। পেনেত্তার আগে ইতালির হয়ে গ্র্যান্ডসøাম জিতেছিলেন ফ্রান্সেসকা শিয়াভোনি। ২০১০ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেনের শিরোপা জিতেছিলেন তিনি। এরপর পেনেত্তাই টেনিসের মেজর শিরোপা উপহার দিলেন ইতালিকে।

তবে স্বদেশী পেনেত্তার কাছে হারলেও ক্যারিয়ারের প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠেই রোমাঞ্চিত ছিলেন ভিঞ্চি। সেরেনাকে হারানোর পরই তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জন্য এটা অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। এটা ঠিক স্বপ্নের মতোই। আমি ফাইনালে। সেরেনাকে হারালাম আমি। বিস্ময়কর মুহূর্তই বলতে পারেন। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা মুহূর্ত।’ সেরেনাকে নিয়ে টুর্নামেন্টের শুরুর আগে থেকেই স্বপ্ন দেখছিলেন আমেরিকান সমর্থকরা। তা বুঝতে বাকি ছিল না ভিঞ্চির। তাই তো আমেরিকান তারকাকে হারিয়ে তার ভক্তদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন ভিঞ্চি। তিনি জানিয়েছিলেন, ‘আমেরিকান মানুষগুলোর জন্য খারাপ লাগছে। সেরেনার কাছেও ক্ষমা চাচ্ছি- গ্র্যান্ডসøাম এবং সবকিছুর জন্যই। আসলে এদিনটা ছিল শুধুই আমার।’

নিউইয়র্কের ফ্লাশিং মিডোয় গত কয়েক মৌসুম ধরেই রাজত্ব করছিলেন সেরেনা। এবার তার রাজ্যে হানা দিলেন পেনেত্তা। ইতালির ইতিহাসে দ্বিতীয় প্রমীলা খেলোয়াড় হিসেবে গ্র্যান্ডসøাম জয়ের রেকর্ড গড়েন তিনি। তবে পেনেত্তা চমকে দেন প্রথম মেজর শিরোপা জেতার পরই অবসর ঘোষণা দেন তিনি। আর ইতালিয়ান এই তারকার বিদায়ে হতাশ অনেক টেনিস খেলোয়াড়। যাদের মধ্যে রয়েছেন কিংবদন্তি সেরেনা উইলিয়ামস-সিমোনা হ্যালেপরাও। তবে ক্যারিয়ারের বাকি সময়টাতে যেন ভাল কাটে সেই শুভ কামনাই জানিয়েছেন তারা। টেনিস র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ তারকা সেরেনা উইলিয়ামস বলেন, ‘পেনেত্তা তোমাকে অভিনন্দন। তুমি চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় আমি খুবই খুশি। প্রকৃতপক্ষে তুমিই এর যোগ্য। তোমার বাকি জীবন সুখে কাটুক সেটাই আমি চাই। আমি তোমার হাসিমাখা মুখটা খুবই মিস করব।’ টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় বাছাই রোমানিয়ার সিমোনা হ্যালেপ বলেন, ‘সত্যিই পেনেত্তা তোমার জয়ে খুব ভাল লাগছে। তুমিই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যোগ্য। দুই সপ্তাহজুড়েই অসাধারণ খেলেছো তুমি।’ এমন বিদায়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন টেনিস র‌্যাঙ্কিংয়ের সাবেক নাম্বার ওয়ান তারকা ভিক্টোরিয়া আজারেঙ্কাও। তবে অভিনন্দন জানাতে মোটেও ভুল করেননি তিনি, ‘ওয়াও পেনেত্তা দারুণভাবেই শেষ করল। তোমার মতো ভাল মানুষ খোঁজে পাওয়াটা দুষ্কর। অভিনন্দন এবং বাকি জীবনটাও ভাল কাটুক তোমার এমন প্রত্যাশাই করি আমি।’

তবে ক্যারিয়ারের শেষ বেলায় টেনিসের শীর্ষ দশে জায়গা করে নিলেন পেনেত্তা। ডব্লিউটিএ কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ র‌্যাঙ্কিং অনুযায়ী ৮ নাম্বার জায়গাটি দখল করেন তিনি। তবে ফাইনালে হেরেও ১৯ ধাপ এগিয়েছেন রবার্টা ভিঞ্চি। বর্তমানে তার অবস্থান ১৯। র‌্যাঙ্কিংয়ে পেনেত্তা-ভিঞ্চির উন্নতি ঘটলেও অপরিবর্তিত রয়েছেন সেরেনা উইলিয়ামস।