১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বীরোচিত ফেরা ‘সি আর সেভেন’র

  • অতশী রহমান

তাঁকে নিয়ে মাতামাতি সবসময়। সেটা কারণে কিংবা অকারণে। স্বভাব অনেকটাই ফুটবল কিংবদন্তি দিয়াগো ম্যারাডোনার মতো। মিডিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা। ফুটবলে নামডাকের কমতি নেই; রূপটাও আগুন ঝরানো। তাই তো মুহূর্তেই সুন্দরী রমণীরা তার বাহুডোরে আস্তানা গাড়তে ভিড় জমায়। হ্যাঁ, বর্তমান বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সুদর্শন তরুণ পর্তুগীজ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর কথাই আলোকপাত করা হচ্ছে। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে এই তরুণের উদ্ভাসিত নৈপুণ্যের ওপর ভর করে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছিল পর্তুগীজরা।

এরপর রিয়াল মাদ্রিদ তাকে দলে ভেড়ায় ট্রান্সফারের নয়া ইতিহাস গড়ে। সান্টিয়াগো বার্নাবুতে এসে পারফরম্যান্সটা আরও ক্ষুরধার হয়েছে সি আর সেভেনের। যার প্রমাণ হরহামেশাই রেখে যাচ্ছেন। দিন কয়েক আগে স্প্যানিশ লা লীগায় এক ম্যাচে একাই করেছেন পাঁচ গোল। অথচ ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে গোল পাননি টানা আট ম্যাচে। নতুন মৌসুমে লা লীগায় প্রথম দুই ম্যাচেও ছিলেন গোলশূন্য। যে কারণে সমালোচনার মৃদু বাতাস বইছিল রোনাল্ডোকে নিয়ে! কিন্তু কেন যে তাঁকে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয় সে প্রমাণ আরও একবার রেখেছেন পর্তুগাল অধিনায়ক। অবিশ্বাস্য, চোখ ধাঁধানো, অনুপম ফুটবলশৈলী প্রদর্শন করে বন্ধ করে দিয়েছেন সমালোচকদের মুখ।

একটা, দুইটা বা তিনটা নয়, লা লীগায় এস্পানিওলের বিরুদ্ধে রোনাল্ডো একাই করেছেন পাঁচ গোল। ১২ সেপ্টেম্বর রাতে প্রতিপক্ষের মাঠে এই গোলবৃষ্টিতে সি আর সেভেন নাম লিখিয়েছেন রেকর্ড বইয়ে। রিয়ালের কিংবদন্তি রাউল গঞ্জালেসকে পেছনে ফেলে তিনিই এখন লা লীগায় রিয়ালের জার্সি গায়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা। গ্যালাক্টিকোদের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি আরও কয়েকটি রেকর্ড নাড়াচাড়া করেছেন ৩০ বছর বয়সী এই বিশ্বখ্যাত ফরোয়ার্ড।

২২৮ গোল করে লা লীগায় রিয়ালের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটি এতদিন ছিল স্প্যানিশ তারকা রাউলের দখলে। এস্পানিওলের বিরুদ্ধে রোনাল্ডো ম্যাচটি শুরু করেছিলেন ২২৫ গোল নিয়ে। এ ম্যাচেই যে তিনি রাউলকে ছাড়িয়ে যাবেন, তা হয়ত কেউ কল্পনা করতে পারেনি। কিন্তু একের পর এক গোল করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বর্তমান ফিফা সেরা ফুটবলার। শুরু করেন ম্যাচের সপ্তম মিনিটে প্রথম গোল করে। ১৭ মিনিটে দ্বিতীয় গোলটি করেন পেনাল্টি থেকে। তিন মিনিট পরেই আরেকটি গোল করে পূর্ণ করেন হ্যাটট্রিক। ২৮ মিনিটে রিয়ালের চতুর্থ গোলটি করেন ফরাসী স্ট্রাইকার করিম বেঞ্জামা। রেকর্ড গড়া হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেও গোলক্ষুধা মেটেনি রোনাল্ডোর। দ্বিতীয়ার্ধে ৬১ ও ৮১ মিনিটে করেন আরও দুটি গোল। ছাড়িয়ে যান রাউলকে। ১৯৯৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ২২৮টি গোল করতে রাউল খেলেছেন ৫৫০টি ম্যাচ। আর রোনাল্ডো ২৩০ গোল করেছেন মাত্র ২০৩ ম্যাচ খেলে।

রিয়ালের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পর এখন রোনাল্ডোর সামনে অপেক্ষা করছে লা লীগার ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া। এ তালিকায় সি আর সেভেনের বর্তমান অবস্থান চার নম্বরে। তাঁর সামনে আছেন শুধু হুগো সানচেজ (২৩৪), টেলমো জারা (২৫১) ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি (২৮৭)। ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো এক ম্যাচে পাঁচ গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন রোনাল্ডো। গত এপ্রিলেই গ্রানাডার বিরুদ্ধে পাঁচ গোল করেন রিয়াল তারকা। এর ফলে রিয়ালের হয়ে আরেকটি কীর্তিও গড়া হয়ে গেছে পর্তুগীজ তারকার। রিয়ালের হয়ে দুই ম্যাচে পাঁচটি করে গোল করা প্রথম ফুটবলার তিনি। ম্যাচের শেষ দিকে ডাবল হ্যাটট্রিকের সুযোগ পেয়েছিলেন ৩০ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। কিন্তু সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। পাঁচ গোল করে স্পেনের শীর্ষ লীগে লিওনেল মেসির সর্বোচ্চ ২৪ হ্যাটট্রিকের রেকর্ডে ফের ভাগ বসিয়েছেন রোনাল্ডো। গত মার্চেই ২৪তম হ্যাটট্রিক করে রোনাল্ডোকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন বার্সিলোনা তারকা। ন্যুক্যাম্পের ওই ম্যাচে মেসির হ্যাটট্রিকের সৌজন্যে রায়ো ভায়োকানোকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল ক্যাটালানরা।

ম্যাচ শেষে রেকর্ড গড়া রোনাল্ডোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন রিয়ালের কোচ রাফায়েল বেনিতেজ। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, রোনাল্ডোর পরিসংখ্যানই তাঁর হয়ে কথা বলে। এত এত গোল করা একজন খেলোয়াড় নিশ্চিতভাবেই জায়গা করে নিতে পারবে ইতিহাসের পাতায়। আশা করছি, সে এভাবেই নিজের গোলসংখ্যা বাড়িয়ে নিতে পারবে। সেটা তাঁর নিজের জন্যও যেমন ভালো হবে, তেমনি দলের জন্যও ভাল হবে। শুধু কোচই নয়, রোনাল্ডোকে প্রশংসায় ভাসিয়ে চলেছেন তার সতীর্থরাও। যেমন সি আর সেভেনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন কেইলর নাভাস। রিয়াল মাদ্রিদ গোলরক্ষকের মনে করছেন, তার সতীর্থ পর্তুগিজ ফরোয়ার্ডই সবার সেরা। তিনি বলেন, আমরা সবাই জানি, সে-ই (রোনাল্ডো) বিশ্বসেরা। সে একজন অবিশ্বাস্য খেলোয়াড়।

অনেক দিন ধরেই চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ইতিহাসে গোলদাতাদের তালিকার শীর্ষস্থান নিয়ে মেসি ও রোনাল্ডোর মধ্যে অদল-বদল হচ্ছে। গত মৌসুমে কয়েকবার দু’জন দু’জনকে টপকে যান। তবে শেষ পর্যন্ত একই কাতারে থেকে মৌসুম শেষ করেন রিয়াল ও বার্সা তারকা। বর্তমানে চ্যাম্পিয়ন্স লীগে মেসি ও রোনাল্ডো দু’জনেরই গোলসংখ্যা ৭৭টি করে। মঙ্গলবার রাতে গোল পেলেই তাই আরেকবার মেসিকে টপকে এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যাবেন রোনাল্ডো। সি আর সেভেন আরেক গৌরবগাথা রচনা করতে পেরেছেন কিনা সেটা অবশ্য এতক্ষণে পাঠকেরা জেনে গেছেন।

গত মৌসুমে (২০১৪-১৫) পারফরমেন্সের খতিয়ানে শতভাগ সফল ছিলেন লিওনেল মেসি। কিন্তু সুপারস্টার রোনাল্ডো ছিলেন ঠিক বিপরীত। ব্যক্তিগত সাফল্য পেলেও ছিলেন শিরোপাশূন্য। শুরু হওয়া নতুন মৌসুমে (২০১৫-১৬) তাই অগ্নিপরীক্ষা নিয়ে মাঠে নেমেছেন রিয়াল মাদ্রিদের পর্তুগীজ তারকা। আর মেসির চ্যালেঞ্জ সাফল্য ধরে রাখা। কিন্তু মৌসুমের শুরুতে দুই মহাতারকার পারফরমেন্সে অশনি সঙ্কেত দেখা যায়।