২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল থেকে বছরে কয়েক হাজার নারী মধ্যপ্রাচ্যে পাচার

  • ট্রানজিট পয়েন্ট অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লী;###;সিরিয়ায় আইএস বন্দী শিবিরে এদের বিক্রি করা হয় মোটা অঙ্কে

মানস বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৫ সেপ্টেম্বর, নয়াদিল্লী ॥ সম্প্রতি হরিয়ানার গুরুগাঁও শহরে দুই নেপালী যুবতীকে অবৈধভাবে আটক করে দীর্ঘদিন যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে সৌদি দূতাবাসের কূটনীতিকের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তার ২০ জন সহযোগীকে নিয়ে প্রতিদিন শারীরিক অত্যাচার চালিয়ে গেছেন দুই যুবতীর ওপর। এই ঘটনার পর দিল্লী এবং নেপালে হৈচৈ পড়ে যায়। দুই দেশের গোয়েন্দারা সক্রিয় হয়ে এমন কিছু মেয়ে পাচারকারী গ্যাংয়ের সন্ধান পেয়েছেন, যাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর জানা গেছে প্রায় ১০০০ অবৈধ কর্মসংস্থান সংস্থানের মাধ্যমে ভারত থেকে কয়েক হাজার মেয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে সৌদি আরব, মিসর, কেনিয়া, কুয়েত, মরক্কো, লিবিয়া, তাঞ্জানিয়া এবং সিরিয়ায় আইএসআইএস সন্ত্রাসবাদীদের বন্দী শিবিরে। এদের মধ্যে সব থেকে বেশি মেয়েকে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে আনা হচ্ছে নেপাল থেকে। এরপরই বাংলাদেশের স্থান। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ দিল্লী পুলিশকে গত ২ সেপ্টেম্বর সতর্কবার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছে, বেশকিছু বাংলাদেশী মেয়েকে দিল্লী থেকে দুবাই, কুয়েত, সৌদি আরব পাঠানোর চক্রান্ত করছে ভারতে বাংলাদেশের লিঙ্কম্যান। সে ৩১ আগস্ট বাংলাদেশে গিয়ে তার মহিলা সহযোগীর সঙ্গে দেখা করে জানিয়েছে, সে দিল্লীতে উঁচুদরের লোকের সঙ্গে সম্পর্ক করতে পেরেছে এবং দিল্লী থেকে বাংলাদেশী মেয়েদের জন্য কুয়েত, দুবাই সৌদি আরবের ভিসা সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠাতে কোন অসুবিধা হবে না। ‘র’-এর হুঁশিয়ারি পেয়েই কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা, দিল্লী পুলিশ, ইমিগ্রেশন ব্যুরো এবং বিমানবন্দর কর্মকর্তারা সজাগ হয়ে যান। নেপাল থেকে এক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাও দিল্লীতে আসেন ভারতীয় অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে। তারা দু’বছরে কয়েক শ’ নিখোঁজ মেয়ের তালিকা দিয়ে বলেন, তাদের সন্দেহ এদের পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোতে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। নেপাল এবং ভারতের গোয়েন্দারা যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে জানতে পেরেছেন, ভারত থেকে বাংলাদেশী, ভারতীয় ও নেপালের মেয়েদের সিরিয়াতে খুংখার আইএসআইএস সন্ত্রাসবাদীদের বন্দী শিবিরে তাদের যৌন লালসার শিকার বানাতে মোটা টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। নেপালের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সকল মেয়েকেই পাচার করা হচ্ছে ভারত তথা দিল্লী থেকে। নেপালের কাঠমান্ডু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি কোন ফ্লাইট নেই। তাই পশ্চিমবঙ্গ, বিহারের মধ্য দিয়ে মেয়েদের ভারতে আনা হচ্ছে। ‘র’ জানতে পেরেছে বাংলাদেশ থেকে নারী পাচারকারী অসম, ত্রিপুরা হয়ে মেয়েদের শিলিগুড়িতে নিয়ে এসে দিল্লী পাঠিয়ে দিচ্ছে। নেপালী এবং বাংলাদেশী মেয়ে ছাড়াও ঝাড়খন্ড ও অন্যান্য ট্রাইবল অঞ্চল থেকে মেয়েদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সেক্স বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। দিল্লীর কাছে বিমানবন্দরসংলগ্ন মহীপালপুরে কয়েকটি আস্তানায় এই মেয়েদের রাখা হয়েছে। ২৫ জুলাই দিল্লী পুলিশ মহীপালপুরে অভিযান চালিয়ে দুই নেপালী দালাল বিষ্ণু তামাঙ্গ ও দয়া রামকে গ্রেফতার করেছে। তাদের আড্ডা থেকে ২০ থেকে ৩৫ বছরের ৩১ জন যুবতীকে পুলিশ উদ্ধার করেছে। এরা স্বীকার করেছে, মাত্র গত দু’মাসে তারা ৯০০ নেপালী মেয়েকে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোতে মোটা টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে। গত বছর পুলিশ মোট এই সেক্স রেকেটের কাছ থেকে ২৩৫ যুবতীকে উদ্ধার করেছিল। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৬০। এরমধ্যে নেপালী ৪৩ জন। ২০১২ সালে ১৮৫ যুবতীকে উদ্ধার করা হয়েছিল, যার মধ্যে নেপালী ৪২ জন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত পুলিশ ৬২ মানব তস্কারি দালালকে গ্রেফতার করেছে। এরমধ্যে ৮ জন মহিলা। গত বছর ধৃত ১৯৯ জনের মধ্যে মহিলা দালালের সংখ্যা ছিল ৩১ জন। ২০১৩ সালে ২৮৬ জনের মধ্যে মহিলা পাচারকারী ছিল ৪০ জন। নেপালের কাঠমান্ডু থেকে ১০০ কিলোমিটারও দূরে মেলচি গ্রামের মেয়েদের সবচেয়ে বেশি টাকায় বিক্রি করা হয়েছে বলে পুলিশকে জানিয়েছে পাচারকারীরা। এদের ফর্সা চেহারার সঙ্গে নীল চোখের জন্য মূল্য লাখ টাকার অনেক বেশি। অসম, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খন্ডের দালালদের রমরমা। বাংলাদেশ থেকে অসম, ত্রিপুরা হয়ে শিলিগুড়ি এবং সেখান থেকে সরাসরি দিল্লী এই ট্রানজিট রুট। গোয়েন্দারা কয়েকটি স্থান চিহ্নিত করে বলেছেন, অনুসূচিত জনগোষ্ঠী সংবলিত ঝাড়খন্ডের গুমলা, লোহারডাঙ্গা, খুন্তি এবং পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, কুচবিহার, মালদা, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা হচ্ছে দ্রুত গজিয়ে ওঠা অন্ধকার জগতের অন্ধ কুঠুরি। কর্মসংস্থান এজেন্সিগুলো এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। দিল্লীতে ৪৬২টি সরকার অনুমোদিত প্লেসমেন্ট এজেন্সি রয়েছে। অবৈধভাবে আরও ১০০০ পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত। এদের সঙ্গে এয়ার ইন্ডিয়ার দুই কর্মীর আঁতাতের তথ্যও পুলিশ জানতে পেরেছে। মনীষ গুপ্তা এবং কপিল কুমার এই চক্রকে মেয়ে পাচারের জন্য বোর্ডিং পাস ইস্যু করতেন। এদের গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লী পুলিশ এবং সিআইএসএফ দুবাইগামী ৭৬ নেপালী মেয়েকে পাচারকারীদের কবল থেকে উদ্ধার করেছে।