১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে

  • ইরানী পররাষ্ট্রমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার ॥ জঙ্গীরা রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করছে। জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের নীতি আদর্শ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। এছাড়া বাহিরের দেশ থেকে উদ্যোগ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্কটের সমাধান হবে না। এই সঙ্কটের সমাধান নিজেদেরই করতে হবে। বুধবার ঢাকায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ জারিফ এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়া বাংলাদেশ ও ইরানের সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ইরানী পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় আসেন। দুইদিন ঢাকা সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, রাষ্ট্রপতি এ্যাডভোকেট মোঃ আবদুল হামিদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বুধবার ঢাকা ত্যাগের আগে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যম কর্মীদের মুখোমুখি হন।

সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ বলেন, মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ইরানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামেও দুই দেশ একে অপরকে সহযোগিতা করে আসছে। বাংলাদেশ ও ইরানে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারী খাতে দুই দেশেই ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশ ও ইরান উভয়ই জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রয়েছে। জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিষয়টিও সম্পর্কিত। কোন দেশ অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সংস্কৃতি খুবই সমৃদ্ধ হলে সেখানে জঙ্গীবাদের প্রভাবও কম থাকে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ইরানের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। দুই দেশের মধ্যে এই সম্পর্ক আমরা আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।

বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর কোন উদ্যোগ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইরান বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা দিতে আগ্রহী। সে কারণে বাংলাদেশের বিদ্যুত ও জ্বালানি মন্ত্রীকে ইরান সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাদের ইরান সফরের সময় সেখানে এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

সিরিয়া শরণার্থীদের সহায়তার বিষয়ে ইরানের ভূমিকা জানতে চাইলে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সিরিয়ায় বিষয়টি ইরান অত্যন্ত মানবিক দৃষ্টিতে দেখছে। সিরিয়ার শরণার্থীদের জন্য আমরা খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি ইত্যাদি দিয়ে সহায়তা করছি।

সিরিয়া ও ইয়েমেন সঙ্কট সমাধানের বিষয়ে জানতে চাইলে জাভাদ জারিফ বলেন, সিরিয়া ও ইয়েমেন সঙ্কট একটি রাজনৈতিক সমস্যা। রাজনৈতিকভাবেই এই সঙ্কটের সমাধান হতে হবে। তবে এই সঙ্কটের সমাধান সেখানকার জনগণকেই করতে হবে। কোন বাহিরের শক্তি দিয়ে এর সমাধান হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। পরমাণু কর্মসূচী নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে ইরানের সমঝোতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, পরমাণু কর্মসূচী নিয়ে শান্তিপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। আলোচনা মানে হার শিকার নয়। আমরা শান্তিতে বিশ্বাসী। মানবতায় বিশ্বাসী। সে কারণে আলোচনা সফল হয়েছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে ইরান আন্তরিক। বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামেও এই সমস্যা সমাধানের জন্য আলোচনা হয়ে থাকে। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে।

ইরান জঙ্গীবাদ নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক। জঙ্গীবাদ একটি রাজনৈতিক কর্মসূচী। এটা কোন ধর্ম নয়। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে জঙ্গীবাদের কোন সম্পর্ক নেই। জঙ্গীরা রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করছে। জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের নীতি আদর্শ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশে সম্প্রীতি বজায় রেখে সব ধর্মাবলম্বীরা স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ জারিফের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। কেউ কারও ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত করে না। পরমাণু কর্মসূচী নিয়ে পশ্চিমাদের অবরোধের মুখে থাকা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার দেশের সঙ্গে ছয় বিশ্ব শক্তির সাম্প্রতিক চুক্তির বিষয় জানাতে ঢাকা সফরে এসেছেন। বুধবার তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে তার কার্যালয়ে যান।

জাভাদ জারিফ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও জার্মানির সঙ্গে নিজ দেশের পরমাণু চুক্তির বিষয়বস্তু শেখ হাসিনাকে জানান বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম জানিয়েছেন। জাভাদ জারিফ বলেন, ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ পুরোপুরি উঠে গেলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদার হবে। বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক আগামীতে আরও জোরদারের আশা প্রধানমন্ত্রীও প্রকাশ করেন বলে তার প্রেস সচিব জানান। পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সমর্থনের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান ইরানী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বস্ত্র এবং বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কের সেতু হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের কার্যক্রম পুনরায় চালু করার কথাও বলেন জাভাদ জারিফ। তিনি জানান, বাংলাদেশের কূটনীতিক ও সরকারী কর্মকর্তারা ইরানের ‘অন অ্যারাইভাল’ ভিসা পাবেন। বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আগামীতে আরও জোরদারের আশা প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানিকে শুভেচ্ছাও জানান শেখ হাসিনা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ॥ পরমাণু শক্তি হ্রাস নিয়ে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা গোষ্ঠীর সমঝোতা হওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের ব্যবসা ও বিনিয়োগ আরও বাড়বে বলে আশা করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ আশা প্রকাশ করেন। বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরমাণু কর্মসূচী সমঝোতার বিষয়টি অবহিত করেন। এ সময় আবুল হাসান মাহমুদ আলী এ সমঝোতাকে ঐতিহাসিক মাইলফলক বলে উল্লেখ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগ, জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে ঐকমত্য পোষণ করেন।