২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমাজ ভাবনা ॥ শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য জরুরী আনন্দময় শিক্ষা

  • -অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, শিক্ষাবিদ;###;সাক্ষাতকার নিয়েছেন মারুফ রায়হান;###;এবারের বিষয় ॥ পাঠ্যবইয়ের চাপে শিশু

জনকণ্ঠ : স্কুলগামী শিশুদের দিকে তাকালে দেখা যায় পাঠ্যবইয়ের বোঝায় স্কুলে যেতে শিশুর কষ্ট হচ্ছে। এই বিপুল পাঠ্যসূচী তার শিক্ষা অর্জনে আসলে কতটা ভূমিকা রাখছে?

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : শুধু বইয়ের বোঝাই নয়, শিশুর ওপর নানা ধরনের বোঝা বা চাপ রয়েছে। ব্রিটিশরা আসার আগে আমাদের দেশে শিক্ষা ছিল গুরুমুখী। তখন পাঠ্যপুস্তক ছিল না। দুটো বিষয়ে সে সময়ে শিক্ষা দেয়া হতো। অঙ্ক এবং ভাষা- এ দুটি শিক্ষা প্রয়োজনীয় ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যের হিসাব রাখার জন্য অঙ্ক দরকার হতো। আর ভাষা না হলে যোগাযোগটা কিভাবে হবে। সে সময়ে পাঠ্যপুস্তকে শিক্ষা দেয়া হতো না। শিক্ষা ছিল অনানুষ্ঠানিক। ব্রিটিশরা আসার পর শিক্ষাদানে প্রাতিষ্ঠানিকতা এলো। আজকের দিনে শিশুর জন্য যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়েছে তাতে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে শিশুর শিক্ষার ওপরে বিশেষ মনোযোগ দেয়া হচ্ছে। আসলে বিষয়ের চাপে শিশুকে অবরুদ্ধ করে ফেলা হচ্ছে। তার ওপর কৃত্রিম শৃঙ্খলা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমাদের সমাজে শিশুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক মানবিক নয়। শিশুকে আমরা দেখছি পূর্ণবয়স্ক মানুষের ছোট সংস্করণ হিসেবে। আমাদের ধারণা হচ্ছে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের যা যা জ্ঞান থাকা দরকার, শিশুর জন্যও সেসব জ্ঞানই থাকা দরকার। এটা মোটেও ঠিক নয়। শিশুকে আনন্দের মধ্য দিয়ে শিক্ষা দিতে হবে। পাঠ্যপুস্তক যত কম হয় ততই তার জন্য মঙ্গল। সে সৃষ্টিশীল উপায়ে শিখবে। কথাবার্তা বলা, সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া, আনন্দ, পারস্পরিক আদান প্রদানÑ এ সবের মধ্য দিয়েও তার শিক্ষা লাভ ঘটবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আমরা দেখতে চাইব সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। একইসঙ্গে তা শিশুর জন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও হবে। তাহলেই শিশুর সার্থক বিকাশ হবে। সেটা না করে আমরা শিশুর ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছি বইয়ের বোঝা। পাঠ্যবই ও পাঠ্যসূচীর বোঝা চাপিয়ে দেয়ার ফলে শিশুর আনন্দ কেড়ে নেয়া হচ্ছে। তার কাছে শিক্ষাটা আনন্দহীন হয়ে যাচ্ছে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটানোÑ এসব সংকুচিত হয়ে আসছে। পাঠ্যসূচী বোঝার জন্য পাঠকক্ষে তার পাঠ সমাপ্ত হচ্ছে না। বাসায় এসে আবার তাকে পড়তে হচ্ছে। কিংবা দৌড়তে হচ্ছে কোচিংয়ে।

আরেকটি বিষয়, এখন প্রাথমিক স্তরে পঞ্চম শ্রেণীতে বিশেষ পরীক্ষা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। আগে এটা ছিল না। আমাদের সময়ে পাঠশালায় পরীক্ষা দেয়ার বিষয়টি ছিল না। এখন শৈশব থেকেই পরীক্ষার চাপ, কেমন করে ফল ভাল করা যায়, বেশি নম্বর পাওয়া যায়Ñ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে শিশুকে ঢুকিয়ে ফেলা হচ্ছে। এতে শিশুদের ওপরে শুধু নয়, চাপ পড়ছে অভিভাবকদের ওপরেও। অভিভাবকরা সেই চাপ আবার শিশুদের ওপরেই চাপাচ্ছেন। পরীক্ষামুখী এই চাপ তার স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করছে।

জনকণ্ঠ : আজকের শিশুদের বড় একটা সময় কেড়ে নিচ্ছে টেলিভিশন ও কম্পিউটার। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাইছি।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : টেলিভিশন দেখার ফলে ক্ষতিকর চাপ পড়ছে শিশুর ওপর। পরিবারে বয়স্করা যে হিন্দী সিরিয়াল দেখছেন, শিশুরাও সেই একই সিরিয়াল দেখছে তাদের সঙ্গে বসে। সেখানে হিংসা ও বিদ্বেষ এবং নর-নারীর সম্পর্কÑ এসব শিশুর মনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে ভাষা সমস্যা। মাতৃভাষা শিশুর কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। বাংলা-ইংরেজী-হিন্দীÑ তিন ভাষার টানাটানিতে শিশুর কথা বলার ক্ষমতা, নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষমতাও সংকুচিত হচ্ছে। আমরা অবস্থাসম্পন্ন ঘরের যে শিশুদের দেখছি, আগে তাদের কথা বলায় যে স্বাভাবিকতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল, সেটা আর এখন পাচ্ছি না। তাদের কথাবার্তা এবং অঙ্গভঙ্গির ভেতরে এক ধরনের অস্বাভাবিকতা প্রকাশ পাচ্ছে। তারা ভাষার সমস্যার ভেতরে পতিত হচ্ছে। সমস্ত কিছু মিলিয়ে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, শিশুর জগৎ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। অনেকে বলবেন যে শিশুর এখন কম্পিউটার রয়েছে, মোবাইল ফোন রয়েছে। তার জগৎ অনেক বড়। আসলে কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনের পর্দা অনেক ছোট, যা ছোট শিশুদের জগৎকে বড় নয়, সীমাবদ্ধ করে ফেলছে।

এ তো গেল একটা দিক। অপরদিকে যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয় স্বতন্ত্রভাবে থাকে সেগুলোর দিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়া হয় না। আর অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধীনে। সেখানেও প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকে অবহেলিত। সেখানকার শিক্ষকরা সম্মান পান না, সুযোগ পান না। মেধাবান শিক্ষকদের পাওয়া যায় না প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে। প্রাথমিক শিক্ষকরা আনন্দ পান না। সামাজিক জীবনেও তাদের তেমন সম্মান নেই, অংশগ্রহণ নেই। আগে তারা সামাজিক অনুষ্ঠানে ডাক পেতেন, যুক্ত হতে পারতেন। এখন তাদের সে সুযোগ প্রায় নেই। তাই প্রাথমিক শিক্ষাটা অবহেলিত থাকে। সরকারের কর্মসূচীর কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেশের অনেক শিশুকেই প্রাথমিক শিক্ষায় আনা যাচ্ছে, আবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু ঝরেও পড়ছে। ঝরে পড়ছে যারা, তাদের আমরা খোঁজ রাখি না।

জনকণ্ঠ : সকল শিশুর জন্য একই ধরনের শিক্ষাসূচী অনুসৃত হচ্ছে না। ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা...

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এ প্রসঙ্গে আসতে চাইছিলাম। ত্রিমুখী শিক্ষাধারা চলছে আমাদের দেশে। ফলে শিশুদের আমরা তিন ভাগে ভাগ করে শিক্ষাদান করছি। এর নেপথ্যে কাজ করছে শিশুর অভিভাবকের অর্থনৈতিক সঙ্গতি। শ্রেণীভেদ অনুযায়ী শিশুদেরও শ্রেণীবিন্যাস করছি। উচ্চবিত্ত ও সচ্ছল পরিবারের শিশুরা পড়ছে ইংরেজী মাধ্যমে, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুরা বাংলায়, আর দরিদ্ররা মাদ্রাসায়। শিশুশিক্ষা ভাগ করার ভেতর দিয়েও আমরা সমাজে শ্রেণীভেদ করছি।

শিক্ষার একটা কর্তব্য হচ্ছে একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করা, তাদের কাছাকাছি নিয়ে আসা। শিশুশিক্ষার মাধ্যমে আমরা ঠিক বিপরীতটাই করছি। শিশুদের মধ্যে বিভেদ গড়ে দিচ্ছি। ইংরেজী ও বাংলাÑ দুই ধারার শিক্ষার মধ্যে শিশুরা দুটি আলাদা জগতের বাসিন্দা হয়ে উঠছে। এর বাইরে আবার আছে মাদ্রাসায় পড়া শিশুরা। তাদেরও একটা আলাদা জগৎ তৈরি হচ্ছে। শৈশবেই শিশুদের মধ্যে বিরাট ব্যবধান তৈরি করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে শিশুদের জন্য যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে তাকে আমি হতাশাব্যঞ্জক ছাড়া কিছু বলতে পারছি না।

আরেকটি কথা না বললেই নয়। জনসংখ্যা সমস্যা কিন্তু আমাদের দেশের একটি বড় সমস্যা। এই সমস্যার দিকে আমাদের দৃষ্টি দেয়া উচিত, সে কাজটি হচ্ছে না। স্বাধীনতা অর্জনের সময় আমাদের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। সাড়ে চার দশক পর সেই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ষোলো কোটিরও বেশি। দেখা যাচ্ছে নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানের সংখ্যাই বেশি। তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তার মানে দেশের বেশিরভাগ শিশুই কষ্টেসৃষ্টে বড় হচ্ছে। তারা সামাজিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত। তারা বঞ্চিত মানুষ হিসেবেই বড় হচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচী আগের মতো ব্যাপক নয়। সমাজের শিক্ষিত ও বিত্তবান মানুষরা পরিবারের সদস্য সংখ্যা সীমিত রাখার বিষয়ে স্বাভাবিকভাবেই সচেতন। কিন্তু নিম্নবিত্তরা সচেতন নয়। বরং তারা ভাবছে পরিবারে যত বেশি সদস্য আসবে ততই মঙ্গল। সন্তানরা উপার্জন করবে। আসলে তাদের বেশিরভাগই উপার্জন করতে পারছে না। তাদের সচেতন না করানোর ফলে অধিক হারে শিশু এ সমাজে চলে আসছে এবং সেসব শিশু বিভিন্ন দিক দিয়ে বঞ্চিত হয়ে বড় হচ্ছে।

জনকণ্ঠ : আমাদের সমাজে কন্যাশিশু ও ছেলেশিশুÑ এদের লালন-পালন ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও কি পার্থক্য নেই?

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : সেটা তো আছেই। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণীর ভেতর মেয়ে ও ছেলেশিশুর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এই বৈষম্য মর্মান্তিক ও ক্ষতিকর। মেয়েদের বোঝা মনে করা হচ্ছে। অপরদিকে ভাবা হচ্ছে ছেলেরা উপার্জন করবে। আমরা বড়রা শিশুদের ব্যাপারে সচেতন নই। আমাদের বড়দের বিরোধ, সংঘাত ও কলহ আমরা চাপিয়ে দিচ্ছি শিশুদের ওপর। একবারে শৈশব থেকে শিশুরা দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও কলহময় পরিবেশের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠায় তার মনোজগতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যা ভবিষ্যতে তাকে সুস্থ সামাজিক মানুষে পরিণত হতে বাধা দেবে।

পরিবারের সমস্যাটাও ক্রমাগত প্রকট হচ্ছে। একসময় আমরা একান্নবর্তী পরিবারে ছিলাম। এখন ছোট ছোট পরিবার। এসব পরিবারের ভেতর আবার বিরোধ ও সংঘাত বিদ্যমান রয়েছে যা শিশুদের ওপরও প্রভাব ফেলছে। আমরা যদি এসব বিষয়ে সচেতন ও সতর্ক না হই তাহলে শিশুদের সুস্থ মানুষরূপে গড়ে তুলতে পারব না। ফলে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যত অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। তাই শিশুদের প্রতি অধিক যতœবান হতে হবে। তার মানে এই নয় যে, তাকে বেশি বেশি আদর করতে হবে। স্বাভাবিক আদর, স্বাভাবিক যতœটাই দরকার। অতিরিক্ত কিংবা একেবারেই যতœ না নেয়াÑ দুটোই খারাপ। শিশুদের শৈশব আমাদের রক্ষা করতে হবে। এই দায়িত্ব পরিবারের, সমাজের এবং অবশ্যই রাষ্ট্রের।

জনকণ্ঠ : গল্পের প্রতি শিশুদের আকর্ষণ রয়েছে। গল্প শোনা এবং নিজে থেকে গল্প তৈরি করে বলা; গান শোনা এবং অন্যকে শোনানো; আর ছবি আঁকা বা কাগজ বা অন্যান্য উপকরণ দিয়ে কিছু সৃষ্টি করাÑ এসবের ভেতর দিয়ে শিশুর শিক্ষার্জনের পাশাপাশি সৃজনশীলতার পাঠ হয়, আনন্দ লাভও ঘটে। বিদ্যালয়ে এসবের ব্যবস্থা থাকলে তা নিশ্চয়ই শিশুর বিকাশের জন্য সহায়ক হবে?

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : অবশ্যই হবে। এটা তার জন্য আনন্দদায়কও বটে। তা না হলে শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা তার জন্য বিরূপ হবে, শিক্ষা গ্রহণেও সে অপারগ হবে। শিশুদের মধ্যে যদি এমন ধারণা তৈরি করা যায় যে, ঘরের ছোট পরিসর থেকে বিদ্যালয়ে বড় পরিসরে এসে হাসিখুশি আনন্দময় ও ক্রীড়াবান্ধব পরিবেশ তার জন্য অপেক্ষা করছে। তাহলে সেটায় তাদের আগ্রহ, আকর্ষণ থাকবে। আনন্দের মধ্য দিয়ে শিক্ষা দান জরুরী। একইসঙ্গে একজন শিশুও অপর শিশুকে আনন্দ দান করতে পারে। বিষয়টি বেশ স্বাস্থ্যকর শরীর ও মনের জন্য।

জনকণ্ঠ : পাঠ্যবইয়ের চাপের কারণে শিশুর খেলার সময়ও সংকুচিত হয়ে আসে। তাতে তার শারীরিক বিকাশ ও সুস্থতারও ঘাটতি থেকে যায়।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ঠিক। সেক্ষেত্রে তার কাছে পড়ালেখাটা হয়ে ওঠে আতঙ্কের। ফলে সে শিখতেও পারে না যথাযথভাবে। পাঠ্যবই তার কাছে নিপীড়নের উপকরণ হিসেবেই অনুভূত হবে। লেখাপড়া বিষয়টির প্রতিই সে বিরূপ হয়ে উঠবে। পাঠ্যসূচী বা পাঠ্যক্রমের ভেতরেই অন্তর্ভুক্ত থাকবে পাঠ্যবই এবং খেলাধুলা, গানবাজনা, আবৃত্তি, কিছু আঁকা বা তৈরি করাÑ এসব কিছু। প্রকৃতিজগৎ দেখাও একটা বড় শিক্ষা। সেটার জন্য জায়গা থাকবে শিশুর পাঠ্যসূচীতে।

জনকণ্ঠ : মাসে অন্তত একবার বা গোটা একটা দিবস স্কুলের বাইরে থাকা, কোথাও বেড়ানো বা জানার জন্য ক্লাসের শিশুদের চলে যাওয়াÑ এটাও তার আনন্দময় শিক্ষার জন্য সহায়ক হতে পারে কিনা। শিশুর সামগ্রিক শিক্ষার জন্য পাঠ্যবইয়ের বাইরেও পাঠ্যসূচী নির্ধারণ করা দরকার। আপনার অভিমত কী?

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই। তবে শিশুদের পাঠ্যবই নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণ আছে। ইংরেজী মাধ্যমের শিশুরা বিদেশী লেখকদের বই পড়ছে। বাংলা মাধ্যমের বইগুলো এখানেই প্রণীত হচ্ছে। সেগুলো উন্নত মানসম্পন্ন নয়, না লেখায় না ছাপায়। বইয়ের কাগজও নিম্নমানের।

জনকণ্ঠ : শিশুদের সুনাগরিক করে তুলতে হলে করণীয় বহু কিছুই রয়েছে। গভীর ও ব্যাপক পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। এই আলাপচারিতার উপসংহারে এ বিষয়ে যদি কিছু বলেন।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : আমি সুনাগরিক শব্দটার পরিবর্তে বলব, শিশুদের মানুষ হওয়া দরকার। মানুষ হওয়া মানে হচ্ছে তার সার্বিক বিকাশ। সে স্বার্থপর হবে না, অন্যের কল্যাণের কথা ভাববে, সে সামাজিক হবে। বইয়ের জগতের বাইরে যে বৃহৎ জগৎ রয়েছে সে সেই জগতের দিকে তাকাবে। প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি তার সংবেদনশীলতা থাকবে। শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নয়, তার হৃদয়বৃত্তিক বিকাশও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তির দিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। সে চালাক-চতুর কিনা সেটাই বিবেচ্য। সে হৃদয়বান কিনা, তার ভেতর উদার মন, সৃষ্টিশীল গুণ আছে কিনা সে দিকটি উপেক্ষিত থাকে। শিশুর সার্বিক বিকাশের জন্য এসব দিকও বিবেচনা করতে হবে।