২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বেশি পড়া কি বেশি শেখা?

  • ফারহানা মান্নান

এক বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারলাম, ওর প্রি-স্কুলে পড়া ছেলেটিকে সে বর্তমান স্কুল বদলে একটি নামী স্কুলে ভর্তি করাতে চায়। ভর্তি পরীক্ষায় তার ছেলেকে অঙ্কনে পারদর্শিতা দেখাতে হবে। তাই ছেলেটির জন্য একজন চারুকলায় অধ্যয়নরত ছাত্র খুঁজছে সে! ঘটনাটি শোনার পর থেকেই ভাবছি, ছেলেমেয়েদের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে বাবা-মায়েদের যদি এমন প্রস্তুতি নিতে হয় তবে ভর্তি হবার পর স্কুল পরীক্ষায় কৃতিত্ব অর্জন করতে নিশ্চয়ই তাঁদের নির্ঘুম রাত্রি যাপন করতে হবে। আসলে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুলগুলোতে পড়াশোনার চাপ আছে। প্রথমত বিষয়ভিত্তিক বইয়ের বোঝাতো আছেই, সেই সঙ্গে আছে ভাল ফলের জন্য প্রি-স্কুল থেকেই শিক্ষকের বাসায় ধর্ণা দেয়ার প্রবণতা। সকালে স্কুল আর বিকেল ও সন্ধ্যায় প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে দৌড়ানো, নয়তো বাসাতেই প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে বসা। আর রাতে কোনমতে হোমওয়ার্ক শেষ করেই ঘুম। পরদিন আবার সেই একই জীবন, একই রুটিন। ছাত্রজীবন মানেই এখন দাঁড়িয়েছে পড়া, পড়া, কেবলই পড়া। শেখা নয়। আর সেই পড়ার একমাত্র উৎস পাঠ্যবই।

আমাদের দেশে প্রি-স্কুলের সিলেবাস একেক স্কুলে একেক রকম। প্রতিটি স্কুল তাদের নিজেদের মতো করেই বাচ্চাদের জন্য সিলেবাস নির্ধারণ করে। একটা স্কুলের কথা শুনলাম, এরা বাচ্চাদের নামী কিছু স্কুলের ভর্তি পরীক্ষার জন্য তৈরি করে। এদের সিলেবাসে গণিত ও ইংরেজীর সঙ্গে কমিউনিকেশন বলে একটা বিষয় আছে। তিন ও তিনের অধিক কিছু বয়সের বাচ্চাদের জন্য তারা এ সিলেবাস তৈরি করেছে। এখানে মৌখিক ও লিখিত দু’ভাবেই বাচ্চাদের মূল্যায়ন করা হয়। সাড়ে তিন বছরের একটা বাচ্চাকে ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত গুনতে ও লিখতে পারতে হয়। ইংরেজীতে ছোট ও বড় দুই ধরনের হাতের লেখার পাশাপাশি ম্যাচিং করা, আঁকার ক্ষেত্রে রং বুঝে ছবি মেলানো এ জাতীয় নানা অনুশীলন নির্ভর কাজের চাপ ওদের ওপর আছে। তবে সিলেবাসের ব্যাপারে প্রি-স্কুলের আরও কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে আমি সরাসরি কথা বলেছি। জানলাম, বেশ কিছু নামী ইংরেজী মাধ্যম স্কুল আছে যেখানে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার চাপ তুলনামূলকভাবে কিছু কম হলেও বাড়িতে এক বা একাধিক প্রাইভেট টিউটর রেখে বাচ্চাদের পড়ানো হয়। শুনলাম ধানম-ির একটি নামী ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত বাচ্চাদের লিখিতভাবে মূল্যায়ন না হলেও একাধিক বিষয়ে পড়ার একটা চাপ থাকে। উক্ত স্কুলে লেখাপড়ার মূল চাপটা (বাড়িতে অভিভাবকের হস্তক্ষেপে পড়া) শুরু হয় পঞ্চম শ্রেণী থেকে। ইসলামীভিত্তিক একটি নামী ইংরেজী মাধ্যম স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ানো ছেলের অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম তার ছেলেকে ১০টির মতো বিষয় পড়তে হয়। একই সঙ্গে সে কোরআন শরীফের ওপরেও বিশেষ তালিম নিচ্ছে। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম তার ছেলের পড়াশোনার চাপ যা, তা সবই স্কুলে। বাড়িতে অভিভাবক হিসেবে বাড়তি চাপ তাকে নিতে হয় না। কিন্তু কেজিতে পড়া এক বাচ্চার মা বললেন যে, তাকে নিয়মিত সন্তানকে পড়ানোর জন্য সময় দিতে হয়। তাঁর মেয়েকে তিনি একটি নামী বাংলা মাধ্যম স্কুলের ইংরেজী ভার্সনে পড়াচ্ছেন। তার মেয়ের বয়স পাঁচ বছর। তাকে ইংরেজী, বাংলা, গণিত, বিজ্ঞান, ড্রয়িং ও ধর্ম পড়তে হয়। পাশাপাশি তাকে কনভার্সেশনও (মূলত সাধারণজ্ঞান পড়ানো হয়) পড়তে হয়। প্রতি সপ্তাহে কুইজতো থাকেই, আরও আছে অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষার চাপ। কেজিতে পড়া পাঁচ বছরের একটি বাচ্চার জন্য সিলেবাসটি বেশ বড় বলেই মেয়েটির অভিভাবক মনে করেন। এতো গেল ঢাকায় যে সকল অভিভাবক থাকেন, তাদের প্রতিক্রিয়া। খুলনার ফরাজিপাড়ায় থাকেন এমন একজন অভিভাবকের সঙ্গেও কথা বললাম। তিনি তার বাচ্চাকে ওখানকার একটি নামী প্রি-স্কুলেই পড়িয়েছেন। ওই স্কুলে ভর্তিযুদ্ধে টিকতে তাকে ও তার মেয়েকে রীতিমত সাধনা করতে হয়েছিল। ভর্তির পরেও পড়াশোনার চাপ ছিল অবর্ণনীয়। ঐ স্কুলের ব্যাপারটি ছিল এরকমÑ ওখানে যে ছেলেমেয়েরা পড়বে তারা ওখান থেকে পাস করে বেরিয়ে অন্য সকল নামী প্রাইমারী ও সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তিযুদ্ধে টিকে যাবার যোগ্যতা অর্জন করবে।

কাজেই ঢাকায়তো বটেই, ঢাকার বাইরের শহরগুলোতেও প্রি-স্কুলগুলোতে পড়াশোনার চাপ আছে। মূলত ঢাকার ইংরেজী মাধ্যম প্রি-স্কুলগুলোতে আপাত দৃষ্টিতে চাপ কম বলে মনে হলেও সিলেবাস নিতান্ত কম নয়। তবে নিঃসন্দেহে ওই সকল স্কুলগুলোতে চতুর্থ শ্রেণীর পর লেখাপড়ার চাপটা প্রি-স্কুলের তুলনায় বেড়ে যায় অনেকখানি। বাংলা ও ইংরেজী ভার্সন স্কুলগুলোতে লেখাপড়ার চাপ শুরু হয় প্রি-স্কুল থেকেই। তবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রি-স্কুল বলে কিছু নেই। সেখানে প্রথম শ্রেণীর আগে বাচ্চাদের শিশু শ্রেণীতে পড়ানো হয়। শিশু শ্রেণীতে বাচ্চাদের লেখাপড়ার চাপ তেমন নেই।

প্রি-স্কুলগুলোতে স্কুল কর্তৃপক্ষের সিলেবাস তৈরি করার স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে আছে, তবু গবেষণার মধ্য দিয়ে বয়সজনিত সিলেবাস তারা তৈরি করে না। আমি এক্ষেত্রে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার কথাই বলছি। তবে ঢাকার সব প্রি-স্কুলগুলোর চিত্র একই রকম না হলেও পুরো দেশের আনাচে-কানাচের প্রি-স্কুলগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকার ছেলেমেয়েরা তুলনামূলকভাবে পড়ে অনেক বেশি। যদিও ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে বাড়ির কাজ তেমন দেয়া হয় না বলে এ সকল স্কুলের অভিভাবকরা মনে করেন যে, বাচ্চাদের লেখাপড়ার চাপ নেই। কিন্তু ঢাকায় প্রি-স্কুলগুলোতে বিষয়ভিত্তিক ‘অনেক পড়ানোর’ প্রথাকে অস্বীকার করবেন না কোন অভিভাবকই।

আমাদের দেশে সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের বিনামূল্যে পাঠ্যবই দেয়া হয়। প্রথম থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত তাদের দুটি বড় পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। বিশেষ করে এই দুটি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ ৫ পাওয়া ও সেই সঙ্গে মোট সংখ্যায় অধিক নম্বর পাওয়া প্রতিটি বাচ্চারই স্বপ্ন। এখন ৫ম শ্রেণীতে ফলাফলের ক্ষেত্রে উক্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিশেষ করে বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজী ভার্সনের অভিভাবকদের বেশ কষ্ট করতে হয়। প্রথম শ্রেণীতে মোট সাতটি বিষয় পড়তে হয়। এর মধ্যে সরকার গণিত, বাংলা ও ইংরেজী পাঠ্যবইগুলো ছেলেমেয়েদের বিনামূল্যে দিয়ে দেন। ২য় থেকে ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়তে হয় ১০টি বিষয়। তবে দ্বিতীয় শ্রেণীতেও সরকার তিনটি বই প্রদান করেন এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীতে প্রদান করেন ছয়টি পাঠ্যবই। কিন্তু সরকারের পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা যাই হোক না কেন, বিশেষ করে বেসরকারী স্কুলগুলো তাদের নিজেদের মতো করে আরও কয়েকটি বিষয় যোগ করে সিলেবাস তৈরি করে নেন। এ বিষয়ে একজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তার প্রথম শ্রেণীর ইংরেজি ভার্সনে পড়ুয়া মেয়েটিকে ইংরেজীতে চারটি বই পড়তে হয়। এর মধ্যে আছে ল্যাঙ্গুয়েজ, লিটারেচার, স্পেলিং, গ্রামার ও ওয়ার্কবুক। নিঃসন্দেহে তার সিলেবাসটি ব্যাপক। আরও একটি বেসরকারী স্কুলের কথা জানি, সেখানে বাচ্চাদের প্রথম শ্রেণী থেকেই কম্পিউটার বিষয়টি পড়ানো হয়। এখন জ্ঞানের সুযোগ ও সুবিধা এই দুটোই প্রদানের দিক থেকে বেসরকারী স্কুলগুলো এগিয়ে আছে অনেক। সুবিধা প্রাপ্তির কারণে কিছু ছেলেমেয়ে বেশি পড়ছে আর কিছু কম। ঢাকার উত্তরা ও বনশ্রীতে একটি স্কুলের দুটি শাখা। এরা সৃজনশীলভাবে তাদের স্কুল চালাবে বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথম শ্রেণী থেকেই কম্পিউটার বিষয় হিসেবে থাকছে। আরও থাকছে ছেলেমেয়েদের বিশ্লেষণী দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিশেষ কিছু গেমস-এর ব্যবস্থা। যা হোক, নিঃসন্দেহে বেসরকারী স্কুলগুলোতে বাড়তি লেখাপড়ার চাপ আছে।

আসলে ছেলেমেয়েরা পড়ার সঙ্গে শিখছে কিনা, সেটা নিশ্চিত করাটাও কিন্তু জরুরী। লেখাপড়ার ক্ষেত্রে বিশাল একটি সিলেবাস বা একটি বিষয়ের একাধিক পাঠ্যবই থাকলেই ধরে নেয়া যায় না, ছেলেমেয়েরা অনেক পড়ছে মানেই শিখছে অনেক। আর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক দিকগুলো দেখলেই চলবে? শিশুর শারীরিক, মানসিক ও আবেগিক দিকগুলোর প্রতিও লক্ষ্য করা চাই। তা না হলে একটা শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ হবে না। কাজেই বয়সজনিত কার্যকর সিলেবাস চাই। যা কিনা একটি শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ নিশ্চিত করবে। এমন একটি সিলেবাস আমরা সত্যি চাই, যা শিশুদের কাঁধ থেকে পড়ার বোঝা কমিয়ে শেখার বোঝা বাড়াবে। আমাদের চেষ্টায় আমরা তৈরি করব প্রতিটি শিশু, কিন্তু বাস্তবে তৈরি হবে একটি দেশ।

লেখক : শিক্ষা গবেষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়