২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অপারেশন ক্লিনজিং

বেশি দিন আগের কথা নয়, এই নিকটকালেরই কাহিনী। যখন রানী আর খুনী মিলে দেশ চালাত আর কোতোয়ালদের হুকুম দিত বিরোধীদের হাপিত্যেশ করে দিতে। নিরীহ মানুষ খাজনা দেয় আর না দেয়, তাদেরও বধ্যভূমিতে বধ করা হতো। কিন্তু কড়া নির্দেশ অনুযায়ী বলা হতো, এরা সবাই হৃৎপি-ের ব্যামোতে ইহলোক সাঙ্গ করেছে। কোতোয়ালদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে কারও বুক ধড়ফড় করত। আর তাতেই নিমিষে অক্কা। বর্ণনাগুলো রোমাঞ্চকর বা হৃদয়বিদারক ছিল কিনা জানে সমসাময়িকজন। ৫৭ জন মারা গেছে শুধু হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে। তরুণ তুর্কী যুবকটিও একইভাবে মৃত্যুবরণ করে। কোতোয়ালরা দেখতে রাক্ষস-খোক্ষসের মতো ভয়ঙ্কর হয়ত ছিল। না হলে তরতাজা, সুস্থ-সবল মানুষটির কেন তাদের দেখামাত্র হার্ট এ্যাটাক ঘটে। অনেক ভেবেচিন্তেই কোতোয়াল টিমের এই অপারেশনের বাহারি নামও রাখা হয়েছিল। ঢাকঢোল পিটিয়ে শুধু নয়, আইন জারি করেই চালু করা হয়েছিল ক্লিন সিটি শব্দের মতো ক্লিনহার্ট। আহ! কী মধুর, মনোরম নাম। কিন্তু কাজটা ছিল মানুষ নিধন। রাজপ্রাসাদ থেকে ঘোষণা করা হতো, এরা মরেছে হৃদযন্ত্রের নাটবল্টু, কলকব্জা বিগড়ে যাওয়ায়। এই কোতোয়ালরা বেছে বেছে হৃদয় পরিচ্ছন্ন করার কাজটি করে আসছিল। ১১ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করেছিল। এত মানুষের হৃদয়ের খোলনলচে বদলানোর চেষ্টা কি আর কম করা হয়েছে? হয়ত কুলিয়ে উঠতে পারেনি। নিরীহ মানুষকে ধরে বেঁধে এনে যেমন পেটানো হতো, বাধ্য করা হতো নিজেকে সন্ত্রাসী জাহির করার। তারপর জেল, জুলুম ভোগান্তির মতো পরিণত হতে হতো। সাঁড়াশি অভিযানের কোপানলে পড়ার ভয়ে অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে দেশে-বিদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। এমনও খাস খবর মিলত যে, কারাগারে আটক লোকজন জামিন পেলেও জেলখানা ছেড়ে আসতে চাইত না। ভয়, সংশয় ছিল ধরে নিয়ে হৃদয় চিরিয়া দেখার দল তাদের হাতছাড়া করবে না।

নিকটকালের এই অ-রূপকথা মানুষকে এখনও শিহরিত করে। কোতোয়ালরা হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে মরণ নিশ্চিত করত। গোলাবারুদ সহজে ব্যবহার করত না। নিহত সামরিক জান্তার দলটি একাত্তরের পরাজিত শক্তি, যা পরে পুনর্বাসিত করা হয়েছে, ২০০১ সালে সম্মিলিতভাবে ক্ষমতায় আসীন হয়ে শুরু করে নির্বিচার নির্যাতন, লুটপাট, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ। তাতেও ক্ষান্ত হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চালু করা হয় দেশব্যাপী। সংসদে আইনও পাস করা হয়। ২০০২ সালের ৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশব্যাপী নৃশংস অভিযান চালিয়ে বাড়ি থেকে রাতের অন্ধকারে জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে যেত। অনেকের আজও খোঁজ মেলেনি। যেমনটা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগী আলবদর, রাজাকাররা রাতের অন্ধকারে বাড়ি ঘরে হাঙ্গামা চালাত। অপারেশন ক্লিনহার্ট তারই ধারাবাহিকতার ফসল, যা জামায়াতের একটি অপারেশন ক্লিনজিং মিশনের অন্তর্গত ছিল।

এই হত্যাকা-ের যাতে বিচার হতে না পারে, বিরোধী দল নিধনসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা যাতে চাপা পড়ে সেজন্য সংবিধানবহির্ভূত আইন পাস করাও হয়েছিল সংসদে। ইনডেমনিটি আইনের মাধ্যমে যেভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয়েছিল, অনুরূপভাবে এই আইন তৈরি করে মানুষ হত্যার পাপের বিচার বন্ধ রাখা হয়। আদালত এক দশকের বেশি পরে হলেও এই ইনডেমনিটি অবৈধ ঘোষণা করেছেন। নিহতদের পক্ষে মামলা করার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। একটি ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে আইনের শাসনের পথকে আরও প্রশস্ত করা হলো। আমরা আশা করি, এই নৃশংস হত্যাকা-ের বিচার দ্রুত শুরু হবে এবং অপরাধী সাজা পাবে।