১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভ্যাট প্রত্যাহার ও শিক্ষার মান

সরকার বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিউশন ফির সঙ্গে বর্ধিত ভ্যাট আদায়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। শিক্ষার্থীরাও তাদের আন্দোলন প্রত্যাহার করেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত শুধু স্বস্তিদায়কই নয়, সঠিক এবং যৌক্তিক বলে সবাই মনে করে। তবে সিদ্ধান্তটি আরও আগে নেয়া গেলে জনদুর্ভোগ কমে আসত। আরেকটা বিষয় এখানে উল্লেখ করা জরুরী, কোন ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে অহিংস এবং একটি স্লোগাননির্ভর আন্দোলন কতটা ফলপ্রসূ হতে পারে তার দৃষ্টান্তও স্থাপিত হলো।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রসমূহ প্রায়শ সংবাদ শিরোনাম হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গুণগতমান বজায় রাখতে না পারার কারণে। চলতি বছর এশিয়ার মর্যাদাপূর্ণ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পায়নি বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার মান, গবেষণাসহ কিছু মানদণ্ডের বিচারে এই মূল্যায়ন করা হয়। উচ্চশিক্ষার মানে এমন অবস্থান প্রত্যাশিত নয়। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের সবচেয়ে বড় অভিযোগও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে। সীমিত ও স্বল্প ব্যয়ের উচ্চশিক্ষা এখন পরিণত হয়েছে ব্যাপক ও উচ্চমূল্যে। একসময় উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্র ছিল সীমিত। বেসরকারীকরণ নীতির ফলে উচ্চশিক্ষার সব স্তরে প্রবেশাধিকার সহজ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের হিসাব মতে, দেশের ৮৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর ১০টি মাত্র ভাল। ২৬টির মান মোটামুুটি ভাল। বেশ কিছুর মান একেবারেই খারাপ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জর্জরিত। এটা প্রায় সবারই জানা। বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেবল সনদবাণিজ্যই নয়, চালিয়ে যাচ্ছে আর্থিক দুর্নীতিও। বলা যায়, মানুষের মৌলিক অধিকার শিক্ষা এখন ক্ষেত্রবিশেষে পণ্য হিসেবেও বিবেচিত। শিক্ষা খাতে সরকারের ব্যাপক ভর্তুকিসহ নানা সহযোগিতা থাকার পরও প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক প্রায় স্তরেই উচ্চমূল্যে কিনতে হচ্ছে শিক্ষাসেবা।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে ক্লাস ও পরীক্ষা ছাড়া সার্টিফিকেট বিক্রির অভিযোগ বহু দিনের। সবচেয়ে বড় অভিযোগ হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে। অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এখনও ভাড়া করা ভবনে চলছে। রাজধানীর অলি-গলিতে বহু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যার নিচে হোটেল-রেস্তরাঁ, পাশে নালা-নর্দমা। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ভিড় থাকলেও শিক্ষার মানসম্মত পরিবেশ কতটা বজায় আছে তা প্রশ্নবিদ্ধ। পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ দেশের অধিকাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। বেশিরভাগের ক্ষেত্রে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসসহ বিভিন্ন দিবস প্রায় উপেক্ষিত; সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ও সেভাবে পালিত হয় না। বিশ্বের উন্নত অনেক দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেশ ভাল; কিন্তু সে তুলনায় বাংলাদেশে দু-চারটি বাদে বাকিগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এখন কোন কোন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় পিএইচডি ডিগ্রীও দিচ্ছে। অনুমান কঠিন নয়, এর মান কোথায় গিয়ে ঠেকছে। শিক্ষার মানসহ উল্লেখিত বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি দেয়া জরুরী। শিক্ষার প্রসারে সরকারী সুযোগ-সুবিধা যেমন প্রয়োজনীয় তেমনি মানসম্মত শিক্ষা ও পরিবেশ সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ভ্যাট প্রত্যাহার করে নিলেই এসব সমস্যা শেষ হয়ে যাবে তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যাতে ভ্যাটের অজুহাতে বাড়তি টিউশন ফি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করতে না পারে, সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে মেনে চলতে হবে। প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে হতে হবে কঠোর। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি যাতে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় সেই ব্যবস্থার কথাই ভাবা উচিত। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার, এই সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হোক।

এই মাত্রা পাওয়া