২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জালালের গল্প

প্রতিনিয়ত ঘটে চলা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঠিক বুনন ‘জালালের গল্প’ -ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় আবু শাহেদ ইমন পরিচালিত নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা চলচ্চিত্র। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের যে কোন আড্ডায় চলচ্চিত্রটি খুবই আলোচিত। আর এটি আলোচিত হওয়ার অন্যতম কারণ গতানুগতিক বাংলা চলচ্চিত্র হতে এর ভিন্নতা। বিশেষ করে এর গল্প, গল্প বলার ধরন আর সময়ের পর সময় বাদ দিয়ে (ইংরেজীতে যাকে বলে ‘এলিপ্সিস’) তিনটি খন্ড চিত্রে ছবির গল্প শেষ করা। যেখানে সাধারণত বাংলা চলচ্চিত্রে দেখা যায় ২০ বছরের একটা সময়সীমা না দেখিয়ে আবার নির্দিষ্ট একটা সময়ে গিয়ে গল্পটা আটকে যাওয়া। কিন্তু এই ছবিতে ১ম খন্ড চিত্রের পর সময়ের ধারাবাহিকতার ছেদ ঘটিয়ে ২য় খন্ড চিত্রের শুরু আবার সময়ের ধারাবাহিকতার ছেদ ঘটিয়ে ৩য় খ চিত্রের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে সমাপ্তি। এতে গল্পটি নির্দিষ্ট কোন জায়গায় আটকে বা ঝুলে গেছে বলে মনে হয়নি। গল্পের ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে এটি একটি চক্রাকার গল্প, যেখানে জালালের শুরু সেখানেই জালালের শেষ, আবার নতুন জালালের উৎপত্তি। যা গল্পটিকে অনন্য করেছে। যেখানে শুধু বিচ্ছিন্নতার বয়ান, জালাল এই সমাজের কেউ না। সমাজ থেকে সে বিচ্ছিন্ন। তাই তার মমত্ববোধ দেখা যায় হাঁসের প্রতি, সমাজ থেকে যাত্রাপালার নর্তকী বিচ্ছিন্ন শীলার (মৌসুমি হামিদ) প্রতি।

ক্যামেরা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্মাতার মুন্সিয়ানা দেখা গেছে। অনেক বেশি এক্সট্রিম লং শট, লং শট, মিডিয়াম শটের ব্যবহার দেখা গেছে। ক্লোজ শট একটু কম ব্যবহার করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে বলা যেতে পারে এটা নির্মাতা গল্পের প্রয়োজনেই করেছেন। কেননা তিনি প্রধান চরিত্রের গল্প বা কাহিনী অন্য চরিত্রগুলোর আলোকে বলার চেষ্টা করেছেন। এজন্য দেখা যায় ক্যামেরা স্থাপনের জায়গাটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেখান থেকে ফ্রেমে সবগুলো উপাদান যাতে ভালভাবে ধরা পরে। গল্প বলার ক্ষেত্রে বিস্তারিত বিবরণ (ডিটেইলিং) দেখা গেছে আবার দেখা যায় নাই। যেমন- ১ম খন্ড চিত্রে নদী পাড়ের গ্রামীণ জীবন দেখানোর জন্য নদীর তীর, পাড় ভাঙ্গন, নদীতে নৌকা চলা, গরুর গাড়ি প্রভৃতি। ২য় খ চিত্রে উঠোনে কুকুর, হাঁস, মুরগি প্রভৃতির দৃশ্য ধারণ। সেই তুলনায় ৩য় দৃশ্যে বিস্তারিত বিবরণের প্রবণতা কম দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে প্রতীকী দৃশ্য ধারণ- সরাসরি হাঁস জবাই না দেখিয়ে শুধু রক্ত দেখানো, মোশারফ করিমের দায়ের কোপে মানুষ খুন সরাসরি না দেখিয়ে গাছের ডাল কাটার দৃশ্য দেখানো হয়। সন্তান গর্ভপাত নিয়ে মোশারফ করিম ও শীলা (মৌসুমি হামিদ) মধ্যে মতবিরোধের দৃশ্য দুজনের মাঝে একটি পিলার বা খুঁটি দেখানো হয়, যেটা প্রতীকীভাবে বিভেদের দেয়াল ধরা যেতে পারে।

চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা বলা যেতে পারে- এর সংলাপ। সংলাপ বলার ক্ষেত্রে সাবলীলতা দেখে ধরে নেয়া যেতে পারে প্রাক-সৃজনের কাজটি খুবই যতেœর সহিত করা হয়েছে। সংলাপগুলো কৌতুক রসবোধের বুদ্ধিদীপ্ততায় ছিল পরিপূর্ণ। মিরাজ (নয়ন) প্রথম বাচ্চাটিকে বাড়িতে আনলে তার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করে, ‘এটা কি’? মিরাজের সাবলীল ভঙ্গিতে উত্তর, ‘কেন মানুষের বাচ্চা’। আবার আমিনের বিরোধিতা নিয়ে কথা প্রসঙ্গে মিরাজ বলে, ‘আমি কি জালাল, যে নদীর জলে ভাইস্যা আইছি’। এখানে ভাসমান বা ছিন্নমূল মানুষের প্রতীকরূপে জালালকে দেখানো ছিল বুদ্ধিদীপ্ততা। এই রকম বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ বারংবার দেখা যায়। তৌকির আহমেদ তার কালো বউকে কালো হয়ে যাওয়ার ভয়তে রোদ থেকে সরে বসার কথা, কবিরাজের মুখে- এই হাঁসপড়া ভুল করে পুরুষ মানুষ খাইলে পুরুষ মানুষও পোয়াতি হয়ে যাইব, বাচ্চা কি এমনে এমনে পয়দা হবে? কবিরাজের জালালকে শেখানো, ‘সত্য বলাও মহাপাপ’। এছাড়া ৩য় খ-ে জালালকে মোশারফ করিমের বাস্তবতা শেখানোসহ আরও অনেক জায়গায় সংলাপের ক্ষেত্রে বুদ্ধিদীপ্ততা লক্ষণীয়। আবহ সঙ্গীতের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্মাতার মুন্সীয়ানা লক্ষণীয়। আবহ সঙ্গীতের ব্যবহার গল্পের প্রতি দর্শকের তীব্রতা বাড়িয়েছে। গ্রামীণ পরিবেশের দিকে লক্ষ্য রেখেই আবহ সঙ্গীতের ব্যবহার দেখা গেছে। আবার কোথাও কোথাও নিরবতা বা আবহ সঙ্গীত না থাকা দৃশ্যের তীব্রতাকে বাড়িয়ে তুলেছে। বাংলাদেশে এটিই বোধহয় প্রথম চলচ্চিত্র যার চরিত্রগুলো বিচারে বলা যায়, উত্তরাধুনিকতার ধরণ রয়েছে চরিত্রগুলো নির্মাণের ক্ষেত্রে। গল্পে দেখা যায় প্রধান চরিত্রের বাইরে অন্যান্য চরিত্রই বেশি গুরুত্ববহন করে। ‘জালালের গল্প’ চলচ্চিত্রটিতে গ্রামীণ রাজনীতি ও আর্থ-সামাজিক আঙ্গিকের একটি ক্রমবিকাশ লক্ষ্য করা যায়। ভূমিহীন মিরাজের (নয়ন) কাছ থেকে তৌকীর আহমেদ (বংশ পরাম্পরায় সামন্ততন্ত্র) হয়ে ইটভাটার মালিক মোশারফ করিম (অর্থাৎ দখলদারিত্বের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ের পুঁজিপতি)। এই সব দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করলে চলচ্চিত্রটি চলচ্চিত্রের বাইরেও অনেক কিছু হয়ে উঠবে। সর্বোপরি বলা যায়, ‘জালালের গল্প’ চলচ্চিত্রটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে থাকা দর্শকদের মনোজগতে নাড়া দিলে বা সাড়া ফেললেও সাধারণ দর্শকদের সার্বিকভাবে ততোটা স্পর্শ করতে পারেনি বলে মনে হয়েছে। নির্মাতাকে সাধারণ দর্শকদের কথাটাও মাথায় রাখা বাঞ্ছনীয় ছিল।

সায়েম খান