১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একের পর এক ইস্যু

একের পর এক ইস্যু
  • বেতন পর্যালোচনা কমিটি হলেও অর্থমন্ত্রীকে রাখা নিয়ে বিপত্তি;###;শিক্ষক ধর্মঘটে পাবলিক ভার্সিটি অচল

বিভাষ বাড়ৈ/ইব্রাহীম সুজন ॥ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে আরাজক পরিস্থিতি শান্ত হলেও ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা। বেতন স্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাদ দেয়াসহ একের পর এক ইস্যুতে শিক্ষক আন্দোলনে অস্থির হয়ে উঠছে সারাদেশের সরকারী প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারী কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। জটিলতা সামাল দিতে বেতন পর্যালোচনা কমিটি হলেও সেখানে এবার অর্থমন্ত্রীকে রাখা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে বৃহস্পতিবারও অচল ছিল সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। স্কেলে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাদ দেয়ায় আন্দোলন শুরু করেছেন সরকারী কলেজের শিক্ষক-কর্মকর্তারা। মাঠে নেমেছেন সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। এদিকে প্রাথমিক শিক্ষকরা হুমকি দিয়েছেন, বেতন বৈষম্য না কমালে আসন্ন প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার কোন দায়িত্বই পালন করবেন না তারা।

শিক্ষাঙ্গনের এমন অরাজক পরিস্থিতি দেখার যেন কেউ নেই। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান সরকারী কর্মসূচীতে দেশের বাইরে আছেন বেশ কয়েকদিন। আজ তাদের দেশে ফেরার কথা। যারা দেশে আছেন তাদেরও সঙ্কট সমাধানে উদ্যোগ নেই বললেই চলে। বরং সরকারের কর্তাব্যক্তিরা শিক্ষক আন্দোলনের মধ্যেই একেক সময় একের রকম কথা বলে উল্টো পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষকরাই বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চললেও সঙ্কট সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে আসন্ন ঈদের পর লাগাতার কর্মবিরতি ও ধর্মঘটেরও ডাক দেয়ার হুমকি দিয়েছেন শিক্ষকরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা কতটুকু ॥ জানা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন সর্বনিম্ন। অর্থনীতির সূচকে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোতেও শিক্ষকদের বেতন বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। বর্তমান (সপ্তম পে স্কেল) বেতন স্কেলে বাংলাদেশে একজন প্রভাষকের মূল বেতন মাত্র ১১ হাজার টাকা, অধ্যাপকের ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা। প্রস্তাাবিত অষ্টম বেতন স্কেলে তা দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে। এতে প্রভাষকের মূল বেতন ধরা হয়েছে ২২ হাজার টাকা এবং অধ্যাপকের মূল বেতন ধরা হয়েছে ৬৪ হাজার ৬০০ টাকা। এর পরও সবার চেয়ে পিছিয়েই থাকছে বাংলাদেশ। অথচ নেপালে বর্তমানে প্রভাষকের মূল বেতন ২৮ হাজার ১৯২ টাকা আর অধ্যাপকের ৬৫ হাজার ১৮৪ টাকা। অষ্টম বেতন স্কেলে মর্যাদার দিক দিয়েও আগের চেয়ে কয়েক ধাপ পিছিয়ে যাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শিক্ষকরা বলেছেন, শিক্ষকরা যদি মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়েন তাহলে তাঁরা কিভাবে ক্লাসে পড়ালেখায় মন দেবেন? আর মানের উন্নয়নই বা কিভাবে হবে? ইউজিসি সূত্র জানায়, দেশে এখন ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। এর মধ্যে অধ্যাপক আছেন প্রায় পাঁচ হাজার। এর এক-চতুর্থাংশ অধ্যাপক সিলেকশন গ্রেড পেয়েছেন পদোন্নতির ১২ থেকে ১৪ বছর পর, তাঁদের সংখ্যা প্রায় এক হাজার ২৫০ জন। সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত শিক্ষকরা এতদিন সর্বোচ্চ বেতন পেয়েছেন। অর্থাৎ তাঁদের বেতন সচিবদের বেতনের সমান। সপ্তম বেতন স্কেলে সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও সচিব উভয়েই ৪০ হাজার টাকা মূল বেতন স্কেল পান। কিন্তু নতুন বেতন স্কেলে (অষ্টম পে স্কেল) গ্রেড-১ এর আগেও তিনটি ধাপ রাখা হয়েছে। প্রথম ধাপে ৯০ হাজার টাকা বেতন পাবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবরা। দ্বিতীয় ধাপে ৮৪ হাজার টাকা পাবেন সিনিয়র সচিবরা। আর তৃতীয় ধাপে পদায়িত সচিবরা পাবেন ৮০ হাজার টাকা। এরপর থেকেই শুরু হয়েছে গ্রেড-১। এখানে রয়েছে সচিব (ওএসডি) ও অধ্যাপকরা (সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত)। বেতন কমিশন অবশ্য সিলেকশন গ্রেড তুলে দেয়ার প্রস্তাব করেছে। তা করলে অধ্যাপকদের নেমে আসতে হবে গ্রেড-২ তে।

যেখানে বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৪ হাজার ৬০০ টাকা। অন্য পদের শিক্ষকদেরও এভাবে নিচের ধাপে নামতে হবে। সপ্তম বেতন স্কেলে গ্রেড-৪ এ থাকা সহযোগী অধ্যাপকরা মূল বেতন পান ২৫ হাজার ৭৫০ টাকা। নতুন স্কেলে তাঁরা পাবেন ৫০ হাজার টাকা। তাঁদের গ্রেড ঠিক থাকলেও আগের একই মর্যাদার প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপরে উঠে যাচ্ছেন। আর সহকারী অধ্যাপকরা ১৮ হাজার ৫০০ টাকার মূল বেতনের বদলে পাবেন ৩৫ হাজার ৫০০। তাঁদের ক্ষেত্রেও সহযোগীদের মতো একই ঘটনা ঘটছে। শিক্ষকরা বলছেন, এতদিন আমরা সর্বোচ্চ গ্রেডে বেতন ও সম্মান পেলেও নতুন বেতন কাঠামোতে আমাদের দুই ধাপ নিচে নেমে আসতে হবে, যা আমাদের জন্য মোটেই সম্মানজনক নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা সরকারী কর্মকর্তাদের মতো সুযোগ-সুবিধা আশা করি না। কিন্তু আমাদের কেন নিচে নামিয়ে দেয়া হবে? মন্ত্রিপরিষদ ও মুখ্য পরিষদ সচিবরা আমাদের উপরে থাকতে পারেন। কিন্তু এর পরের অবস্থানে তো আমাদের থাকা উচিত। আর আমাদের মূল দাবি স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো। সেটা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আগের মর্যাদার অবস্থানে রাখতে হবে। নইলে আমরা কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি আমাদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান পর্যালোচনা এবং ঢাবি, জবি, রাবি, জাবিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের শিক্ষকরা বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধায় যথেষ্ট পিছিয়ে আছেন। অধিকাংশ দেশেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রভাষকের পদ নেই। তাদের শুরু সহকারী অধ্যাপক দিয়ে। আশপাশের দেশে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল রয়েছে। ভারতে সহকারী অধ্যাপকের মূল বেতন ৫৫ হাজার, সহযোগী অধ্যাপকের ৯০ হাজার এবং অধ্যাপকের এক লাখ ১০ থেকে এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা। পাকিস্তানে সহকারী অধ্যাপকের মূল বেতন এক লাখ চার হাজার, সহযোগী অধ্যাপকের এক লাখ ৫৬ হাজার ও অধ্যাপকের দুই লাখ ৩৪ হাজার টাকা। শ্রীলঙ্কায় সহকারী অধ্যাপকের বেতন স্কেল এক লাখ পাঁচ হাজার ৬৮০, সহযোগী অধ্যাপকের এক লাখ ৪০ হাজার ও অধ্যাপকের এক লাখ ৮৬ হাজার ৩৪৫ টাকা। চীনে সহকারী অধ্যাপকের মূল বেতন ৯৬ হাজার ৩০৯, অধ্যাপকরা পান এক লাখ ৫০ হাজার ৩৩১ টাকা। মালয়েশিয়ায় সহকারী অধ্যাপকের মূল বেতন দুই লাখ ৫৩ হাজার ১৫৮, অধ্যাপকরা পান তিন লাখ ৬০ হাজার ৩০৫ টাকা। জাপানে সহকারী অধ্যাপকদের মূল বেতন দুই লাখ ৪২ হাজার ৭২৯, অধ্যাপকরা পান চার লাখ ৫১ হাজার ৮৮৮ টাকা। এর বাইরে আবাসন, যাতায়াতের জন্য গাড়িসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।

বাংলাদেশে অষ্টম পে স্কেলে যুগ্ম সচিব ও তদুর্ধ পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের গাড়ি ক্রয়ে ২৫ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা ও মাসিক ব্যয় নির্বাহের জন্য ৪৫ হাজার টাকা বহাল রাখা হয়েছে। কিন্তু সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য এ সুবিধা দিতে হলে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ সংস্থানের কথা বলা হয়েছে। শিক্ষকরা বলছেন, এক দেশে তো দুই নিয়ম হতে পারে না। জনগণের করের টাকায় যুগ্ম সচিবরা যদি এ সুবিধা পেতে পারেন তাহলে আমরা পাব না কেন? তারা বলেন, সিনিয়র অধ্যাপক ও অধ্যাপকদের পদমর্যাদা ও বেতন যথাক্রমে সিনিয়র সচিব এবং পদায়িত সচিবদের সমান করাসহ স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো গঠনের দাবি পূরণ করতে হবে। আর এ দাবি না মানলে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের নির্দেশনায় সব শিক্ষক আরও কঠোর কর্মসূচী গ্রহণ করবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন শিক্ষক নেতা অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান বলেন, নতুৃন পে স্কেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য সত্যিই একটি বেদনার বিষয়। এ স্কেল বাস্তবায়িত হওয়ার আগে বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের একটু ভাবার অনুরোধ জানান তিনি।

কর্মবিরতিতে স্থবিরতা ॥ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে প্রধান করে ‘বেতন বৈষম্য দূরীকরণ কমিটি’ গঠন করা হলেও অচলাবস্থার অবসান হচ্ছে না। অর্থমন্ত্রীকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটির সঙ্গে আপাতত আলোচনায়ও বসবেন না শিক্ষকরা। অর্থমন্ত্রী সম্পর্কে শিক্ষকরা বলছেন যিনি শিক্ষকদের ব্যাপারে সব সময় নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, এমন ব্যক্তির নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সঙ্গে কোন ধরনের আলোচনা নয়। দাবি আদায়ে প্রয়োজনে ভর্তি পরীক্ষা বয়কটের মতো কর্মসূচী পালন করা হবে।

বেতন কাঠামোয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা অবনমনের প্রতিবাদ, শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেলসহ চার দফা দাবিতে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে অনুষ্ঠিত সমাবেশে এসব কথা বলেন শিক্ষক নেতারা। এদিন পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করেছে দেশের ৩৭ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া এ কর্মবিরতি চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা স্ব স্ব ক্যাম্পাসে সকাল ১১টা থেকে একটা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচীও পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কর্মসূচীতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে ও সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামালের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আখতারুজ্জামান, অধ্যাপক মোঃ নিজামুল হক ভূইয়া, অধ্যাপক জিয়া রহমান, অধ্যাপক সাবিতা রেজওয়ানা রহমান, অধ্যাপক গোলাম রব্বানী প্রমুখ।

অবস্থান কর্মসূচীতে ফেডারেশনের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, যদি শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবিসমূহ মানা না হয়, তাহলে আমরা ঈদের পর আরও কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব। তাই সরকারকে বলব অবিলম্বে শিক্ষকদের দাবিসমূহ মেনে নিন। তিনি আরও বলেন, আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। এর মধ্যে যদি আলোচনায় বসতে হয় শিক্ষকরা বসবেন। আমরা আবারও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। নতুবা প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাও বর্জন করার ঘোষণা আসতে পারে বলে জানান তিনি।

অবস্থান কর্মসূচীতে লাগাতার ক্লাস বর্জনের প্রতি ইঙ্গিত করে ফেডারেশনের মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কা এমনকি ইউরোপের ফ্রান্সের শিক্ষকরাও তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ক্লাস বর্জন করেছেন। আমাদের দাবি যেহেতু যৌক্তিক সেহেতু আমাদের দাবি মেনে নেয়া হবে বলে আমরা আশা করি। আমরা জানি, বর্তমান সরকার উচ্চ শিক্ষাবান্ধব একটি সরকার। আর আমাদের দাবি মেনে না নেয়া হলে দীর্ঘদিন কর্মবিরতির মতো কোন কর্মসূচী দিতে হলেও আমরা আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব।

এ সময় তিনি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষকরা আলোচনায় বসবেন না বলেও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমরা বেতন বৈষম্য নিরোধে যে কমিটি করা হয়েছে তাকে স্বাগত জানাই। কারণ এখানে সরকারের গুরুত্বপূূর্ণ কিছু বিজ্ঞ মন্ত্রী এবং সচিব রয়েছে। যারা সব সময় শিক্ষকদের দাবি নিয়ে কথা বলেছেন। তবে যে অর্থমন্ত্রী শিক্ষকদের নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছেন তাকে এখানে প্রধান করায় আমরা আপতত এ কমিটির সঙ্গে কোন ধরনের আলোচনায় বসতে চাচ্ছি না। তবে আমাদের ফেডারেশনের সঙ্গে বৈঠকে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে আমরা সে অনুযায়ী কাজ করব।

শিক্ষক সমিতির সদস্য অধ্যাপক এ জে এম শফিউল আলম ভূইয়া বলেন, বেতন স্কেলে নতুনভাবে কোন পেশাজীবী শ্রেণীর অবনমন করা হয় না। বরং সেখানে তাদের উন্নতি ঘটে কিন্তু এই বেতন স্কেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবনমন করা হয়েছে। এই যে বৈষম্য তা দূর করতে আমরা আন্দোলন করছি। প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করে তিনি বলেন, এই বেতন কাঠামোতে যে বৈষম্য তা প্রধানমন্ত্রীর স্বীয় হস্তক্ষেপে দূর হবে।

রাতে সংগঠনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অর্থমন্ত্রী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিষয়ে নেতিবাচক বক্তব্য রেখেছেন এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য তুলে ধরেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে তাঁর এ ধরনের আচরণের কারণে তিনি ইতোমধ্যেই সকল স্তরের শিক্ষকের নিকট গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন। গণমাধ্যমে মাননীয় মন্ত্রীর কথায় মনে হয়েছে তিনি জনগণের প্রতিনিধি নন, আমলাদের প্রতিনিধি। সুতরাং তাঁর কাছ থেকে শিক্ষকরা সুবিচার পাবেন বলে আমরা মনে করি না। তবে আমাদের আস্থার জায়গা এই যে, এই কমিটিতে জনবরেণ্য ও নির্ভর করার মতো জনপ্রতিনিধি আছেন, যাঁরা জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ও দেশকে অগ্রসর করে নেয়ার চিন্তা-চেতনা ধারণ করেন। এমতাবস্থায় আমরা মাননীয় অর্থমন্ত্রীর স্থলে একজন সর্বজনগ্রহণযোগ্য জনপ্রতিনিধিকে কমিটির প্রধান করে অনতিবিলম্বে আলাপ-আলোচনা শুরু করতে অনুরোধ জানাই।

আন্দোলনে সরকারী কলেজের শিক্ষকরা ॥ বেতন স্কেলে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাদ দেয়ার প্রতিবাদে এবার আন্দোলনে নামছে শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদের সংগঠন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি। কর্মসূচীর অংশ হিসেবে শিক্ষকরা সারাদেশে কর্মবিরতি পালন করেছেন। প্রস্তুতি নিচ্ছেন বৃহত্তর কর্মসূচীর। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির মহাসচিব আইকে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার এ কথা জানিয়ে বলেন, বর্তমানে কলেজের অধ্যাপকরা (সর্বোচ্চ পদ) চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা। সিলেকশন গ্রেড থাকায় এতদিন আংশিক অধ্যাপক গ্রেড-৩-এ যেতে পারতেন। কিন্তু সিলেকশন গ্রেড বাদ দেয়ায় এখন এই পথ বন্ধ হয়ে গেল। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা গ্রেড-৫ থেকে পদোন্নতি পেয়ে সরাসরি গ্রেড-৩ এ উন্নীত হন। অথচ শিক্ষকদের বেলায় গ্রেড-৫ থেকে পদোন্নতি হওয়ার পর গ্রেড-৪ এ উন্নীত করা হয়। এই বৈষম্য নিরসনেরও দাবি করে আসছেন তাঁরা। কিন্তু সেটা নিরসন না করে উল্টো সিলেকশন গ্রেড বাতিল করায় শিক্ষকরা আরও বৈষম্যের শিকার হবেন।

সরকারী প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলনে ॥ ৭ দফা দাবিতে এবার সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা আন্দোলন কর্মসূচী ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে বেতন গ্রেড ১১তম ধাপে পুনর্নির্ধারণসহ ১১ দফা দাবিতে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরাও। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের দাবি না মানা হলে পরবর্তীকালে বিদ্যালয়ে কর্মবিরতিসহ কঠোর কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে। বেতন কাঠামো পুর্নর্নিধারণ করে বৈষম্য কমিয়ে না আনলে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকার হুমকি দিয়েছে বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি। সংগঠনটির সভাপতি নাসরিন সুলতানা বলেন, বেতন বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। যদি ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেতন স্কেল পুনর্নির্ধারণ করে বৈষম্য কমিয়ে না আনা হয় তাহলে আমরা প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সকল দায়িত্ব পালন বর্জন ও কর্মবিরতির মতো কর্মসূচী দিতে বাধ্য হব। ১১ দফা দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, অষ্টম বেতন স্কেল পুনর্নির্ধারণ করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে ও প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষকদের ১২তম গ্রেডে পদায়ন করতে হবে। এ ছাড়া সরাসরি প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বন্ধ এবং সহকারী শিক্ষক পদকে ‘এন্ট্রি পদ’ ধরে যোগ্যতার ভিত্তিতে মহাপরিচালক পদ পর্যন্ত শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি দিতে হবে। তিনি বলেন, নিয়োগ বিধিমালা পরিবর্তন করে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক্র নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল ঘোষণা করতে হবে।

এবার ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি ইংরেজী মাধ্যম স্কুলগুলোর ॥ টিউশন ফি’র ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ইংরেজী মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা। এই দাবিতে তাঁরা বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে রাজধানীর ধানম-ির ১১/এ নম্বর সড়কে মানববন্ধন করেছেন। ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড স্কুল, ইউনিভার্সেল টিউটোরিয়াল, সিদ্দিকী ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ম্যাপললিফ স্কুলের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরাও মানববন্ধনে অংশ নেন। তাঁদের অভিযোগ, ইংরেজী মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থীদের আগে থেকেই সাড়ে ৪ শতাংশ ভ্যাট দিতে হতো। এবার তা বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে তাঁরা অযৌক্তিক বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁরা এবার শুধু বর্ধিত ভ্যাট নয়, পুরো ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে ইংরেজী মাধ্যম স্কুলের টিউশন ফির ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ৬ মাসের জন্য স্থগিত করেছে হাইকোর্ট। একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি শামীম হাসনাইন ও মোহাম্মদ উল্লাহ সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেয়।