২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কোরবানির চামড়ার ন্যায্য দাম নির্ধারণে অনড় সরকার

  • ২০ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জরুরী বৈঠক

এম শাহজাহান ॥ আসন্ন কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দাম নিয়ে নতুন সঙ্কটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গরিবের ন্যায্য হক আদায়ে দাম নির্ধারণ করে দিতে অনড় সরকার। বিপরীতে এ শিল্পের ব্যবসায়ীরা চামড়ার দর নির্ধারণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এই বাস্তবতায় সঠিক ও ন্যায্য দাম নির্ধারিত না হলে কাঁচা চামড়া পাচার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পাচাররোধে সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিজিবি টহল জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। চামড়া বাণিজ্যে অংশ নিতে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারাদেশ। গ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকায় ছুটে আসছে কসাই ও ফড়িয়ারা। বসে নেই ট্যানারি মালিকরা। চামড়া সংগ্রহে পর্যাপ্ত লবণ ও যাবতীয় কেমিক্যাল সংগ্রহ করেছে ট্যানারিগুলো। কাঁচা চামড়া কেনার জন্য ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক ৬শ’ ৫০ কোটি টাকার ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

জানা গেছে, এবার সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনাবেচা হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে চূড়ান্ত হবে দাম। এতে করে গরিব, এতিম-মিসকিন, মসজিদ মাদ্রাসা, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও অলাভজনক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ন্যায্য হক আদায় হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ কারণে এ খাতের ব্যবসায়ীরা দর নির্ধারণের বিপক্ষে অবস্থান নিলেও শেষ পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত মূল্য দিয়েই তাদের কোরবানির পশুর চামড়া কিনতে হবে। আগামী ২০ সেপ্টেম্বর রবিবার চামড়ার দর, বাজার পরিস্থিতি এবং পাচাররোধে করণীয় নির্ধারণে জরুরী বৈঠক ডেকেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ওই বৈঠকে দর নির্ধারণ ও নির্ধারিত দামে চামড়া কেনার জন্য এ শিল্পের তিন সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। এরপর নির্ধারিত দাম ঘোষণা করবে সরকার।

জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন জনকণ্ঠকে বলেন, সরকার নির্ধারিত দামেই ব্যবসায়ীদের চামড়া বেচাকেনা করতে হবে। কোরবানির চামড়া গরিবের হক, এতিম-মিসকিনদের অধিকার। তাই তাঁরা যাতে না ঠকে সেজন্য দাম নির্ধারণ করে দেয়া হবে। তিনি বলেন, আগামী রবিবার এ সংক্রান্ত জরুরী বৈঠক রয়েছে। ওই বৈঠকে আলাপ-আলোচনা করে নির্ধারিত দাম ঘোষণা করবে সরকার। দাম নির্ধারণে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে কাজ করছে।

বহির্বিশ্বে কাঁচা চামড়ার দাম ভাল অবস্থায় রয়েছে জানিয়ে বাণিজ্য সচিব বলেন, আশা করছি দেশেও সঠিক ও ভাল দাম পাওয়া যাবে। শুধু তাই নয়, কাঁচা চামড়ার সঠিক দাম নিশ্চিত না হলে তা পাচার হয়ে যেতে পারে। চামড়া পাচাররোধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে বিজিবি টহল বাড়িয়েছে সরকার। তিনি বলেন, এতসবের পরও চামড়া দেশে রাখতে হলে সঠিক দাম নির্ধারণ হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে বেশি দামে তা অন্য দেশে পাচার হয়ে যাবে। সার্বিক বিষয় নিয়ে এ খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ের প্রান্তিক ব্যবসায়ী, এতিম, অসহায় ও ভিক্ষুকদের কথা বিবেচনায় নিয়ে সাধারণত চামড়ার দরদাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়। কিন্তু এবার দর নির্ধারণ নিয়ে ট্যানারি মালিক ও আড়ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে ইতোমধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। ট্যানারি মালিকরা দাম নির্ধারণের ঘোর বিরোধিতা করছেন। দর নির্ধারণে গত ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার দরদাম নিয়ে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস এ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ট্যানার্স এ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ হাইড স্কিন এ্যান্ড মার্চেন্টস এ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা একটি বৈঠক করেন। কিন্তু ওই বৈঠকে দাম নির্ধারণ হতে পারেনি।

তবে এবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোঃ শাহীন আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, বরাবরই দাম নির্ধারণের বিপক্ষে ব্যবসায়ীরা। অতীতে কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হলেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে চামড়া কিনেছেন মৌসুমী ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ারা। এতে করে নিম্নমানের চামড়াও ট্যানারি মালিকদের বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয়েছে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই এ শিল্পের উদ্যোক্তারা এবার দাম নির্ধারণের বিপক্ষে। আগামী রবিবারের বৈঠকেও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দাম নির্ধারণের বিপক্ষে জোরালো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, সরকার নয়, ব্যবসায়ীরাই ব্যবসা করেন। ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমন কোন কিছুই করা ঠিক হবে না।

জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর মোট চাহিদার ৪৫-৫০ শতাংশ চামড়া কোরবানির সময় সংগৃহীত হয়ে থাকে। আর বাকি ৫০ ভাগ চামড়া সারা বছরে পাওয়া যায়। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, এ বছর ৪৫-৫০ লাখ গরু ও মহিষ কোরবানি হতে পারে। ওই হিসেবে প্রায় ২৫ লাখ গরুর চামড়া সংগৃহীত হবে এবারের কোরবানি ঈদে। এছাড়া আরও ৬০-৭০ লাখ ছাগল, বকরি ও ভেড়া কোরবানির আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এবার ভারত, মিয়ানমারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গরু ও মহিষ আমদানি হচ্ছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ উৎপাদনও ভাল অবস্থায় রয়েছে। পর্যাপ্ত আমদানি নিয়ে শঙ্কা থাকলেও ধীরে ধীরে সেই আশঙ্কা দূর হয়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এবারের ঈদে পর্যাপ্ত পরিমাণ পশু কোরবানি হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে। আর তাই সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে এ বছর ১৫-২০ শতাংশ চামড়া বেশি পাওয়া যাবে। এই চামড়া সংগ্রহ করতে হলে ন্যায্য দাম নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন ৫০ ভাগ চামড়া মজুদ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস এ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার এম আবু তাহের জনকণ্ঠকে বলেন, চামড়ার দর নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। দর নির্ধারণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে বেশি দামে চামড়া কেনাবেচা হয়। অতীতে এটা নিয়ে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাই তিন সমিতির পক্ষ থেকে চামড়ার দর নির্ধারণের ব্যাপারে আপত্তি জানানো হবে। তিনি বলেন, তাদের মোকামে প্রায় ৫০ শতাংশ চামড়ার মজুদ রয়েছে। এই বাস্তবতায় এ বছর চামড়ার দাম কম হবে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে কম দামে চামড়া কিনতে হবে। তবে দাম কম হওয়ার কারণে চামড়া পাচার হওয়ার আশঙ্কাও ব্যক্ত করেছেন তিনি।

চামড়ার ন্যায্য দর নির্ধারণের দাবি ॥ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় গত বছর কোরবানির চামড়ার কম দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ নিয়ে ওই সময় হতাশা প্রকাশ করেছিল দেশের আলেম সমাজ ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। গত বছর লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ঢাকায় ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, খাসির চামড়া ৩০ থেকে ৩৫, ছাগলের চামড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা ও মহিষের চামড়া ৩৫ থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আগের বছর লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ঢাকায় ৮৫ থেকে ৯০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ৫০ থেকে ৫৫ ও বকরি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা এবং মহিষ প্রতি বর্গফুট ৪০ থেকে ৪৫ টাকা দর ঠিক করে দেয়া হয়েছিল। এবার আগে থেকেই চামড়ার দাম নির্ধারণের বিরোধিতা করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। অর্থাৎ চামড়ার দাম কমানোর চেষ্টা চলছে। এ প্রসঙ্গে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, এটি একটি অলাভজনক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির আয়ের একটি বড় অংশ আসে কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে। কিন্তু গত বছর দাম কমানোর ফলে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ বছর সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক দাম নির্ধারণ করা উচিত।