২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার

  • ড. আর এম দেবনাথ

বাঁচা গেছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে। অসহনীয় দিনযাপনের অভিজ্ঞতা শেষ হয়েছে। এমনিতেই ঢাকা শহরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। তার ওপর আবার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের রাস্তা অবরোধ। তাদের দাবি ছিল ছাত্রদের ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার করতে হবে। সরকার তা শেষ পর্যন্ত প্রত্যাহার করে নেয়। ছাত্রছাত্রীরা একে তাদের বিজয় বলে উল্লাস প্রকাশ করেছে। এখানেই আমার খটকা লেগেছে। ভ্যাট প্রত্যাহারে কার লাভ হলো? কার বিজয় হলো? কার আন্দোলন কে করল? বিষয়টা বুঝিয়ে বলি। সরকার ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জোর দিয়ে একাধিকবার বলল যে, ভ্যাট দেবে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা। ছাত্রছাত্রীদের ওপর কোন ভ্যাট আরোপিত হয়নি। সরকারের এ কথা বলার পর আর কথা থাকে না। কিন্তু তারপরও কথা থাকল। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদের সংগঠনের সভাপতি বললেন, তারা ভ্যাট দেবেন না। কারণ তাদের প্রতিষ্ঠান লাভজনক নয়। এসব চালায় ট্রাস্টি বোর্ড। এ প্রেক্ষাপটে ভ্যাট যখন প্রত্যাহৃত হলো তখন কার বিজয় হলো? দৃশ্যত বিজয় ছাত্রদের; কিন্তু এতে তো লাভ হলো বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদেরও। কারণ সরকারের মতে ভ্যাট দেয়ার কথা মালিকদের। এখানে দেখা যাচ্ছে মালিকরা সরকারের আইন বা কথা মানছেন না। তারা ছাত্রদের দ্বারা আন্দোলন করিয়ে তাদের দাবি আদায় করে নিলেন- এ কথা বললে কি ভুল হবে?

শুধু ভ্যাট ইস্যুতেই নয়, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় দেখা যাচ্ছে সরকারের অনেক নিয়ম-কানুনই মানছে না। এর একটা উদাহরণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, একই বিল্ডিংয়ে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করছে। তিনি এও বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা অনেক শর্তে এসবের অনুমতি নিয়েছেন। এখন তারা মানছেন না। একই বিল্ডিংয়ে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় শুধু নয়, দেখা যাচ্ছে ধানমণ্ডির মতো আবাসিক এলাকাগুলো হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়পাড়া। দুই-এক গজ পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়। একেকজন ‘প্রফেসর’ এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং কার্ড নিয়ে ঘোরেন যে বিশ্ববিদ্যালয় আছে কী বাস্তবে নেই তা বলা মুশকিল। জনমনে এসব বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে নানা প্রশ্ন। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী শিক্ষক নেই, যারা আছেন তাদের একটা বিরাট সংখ্যকের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ধার করা শিক্ষক-পার্টটাইমার। শিক্ষকদের অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের ছাত্রছাত্রী নিজেদের যোগাড় করে নিতে হয়। এসব সাধারণত ঘটছে বিবিএ, এমবিএর ক্ষেত্রে। দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই শুধু বিবিএ, এমবিএ পড়ানো হয়। এসব পাঠ্যসূচীতে বিলেত-আমেরিকার উদাহরণ। বাংলাদেশের প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা, তাদের সমস্যা, সমস্যার সমাধান নিয়ে কোন আলোচনা নেই। দেশী বই-পুস্তক তো নেই-ই। পাঠ্যসূচীতে কী আমাদের ব্যবসার, শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা আছে? এ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া বড়ই কঠিন। দুই-একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন লাইব্রেরী নেই। বিজ্ঞান পড়ানো হয় এমন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কি দুই-একটা আছে? আমার মনে হয় নেই। খেলাধুলার কোন ব্যবস্থা আছে কি? থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ, যেহেতু বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন নিজস্ব জায়গা নেই। অধিকাংশ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ভাড়া বাড়িতে কাজ করে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় মনে হয় নিজের জায়গায় স্থানান্তরিত হয়েছে। তবে এদের সংখ্যা খুবই কম। নিজের জায়গায় যাওয়া বড় ধরনের বিনিয়োগের বিষয়। আজকাল জমির দাম খুবই বেশি। দুই-চার বিঘা বা একর জমি কিনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে হলে বিপুল বিনিয়োগের দরকার। ঐ টাকা পুষিয়ে দিতে পারে এমন ছাত্রছাত্রী পাওয়া কঠিন বিষয়। বিজ্ঞান নেই, লিবারেল আর্টস নেই, শুধু বিবিএ, এমবিএভিত্তিক এসব বিশ্ববিদ্যালয় দেশের কতটুকু কাজে আসছে এই প্রশ্ন ইতোমধ্যে উঠতে শুরু করেছে। প্রয়োজনের বেশিসংখ্যক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়কে কাজ করতে দেয়া হয়েছে কিনা এ প্রশ্নও উঠছে। শিক্ষাকে পণ্যে রূপান্তরের মাধ্যম হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠছে।

এমতাবস্থায় অনেক বিষয় বিবেচনায় আনা দরকার। প্রথমেই দেখা দরকার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে তাদের চাকরিপ্রাপ্তির পরিসংখ্যানটি কী? ধরা যাক, ‘বিএসসি’ পরীক্ষা। এতে তারাও অংশগ্রহণ করছে। প্রতি ১০০ জন উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের কতজন ছাত্রছাত্রী থাকে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তাদের মধ্য থেকে উত্তীর্ণের সংখ্যা কত। আমাকে একটি সূত্র জানিয়েছে, এসব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী উত্তীর্ণ হয় খুবই কম, বলা যায় বিরল। যদি এ কথা সত্য হয় তাহলে গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় দেয়া হচ্ছে দুটো কারণে। প্রথম কারণ তো অবশ্যই এটা যে, দেশের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এত ছাত্রছাত্রীর জায়গা করে দিতে পারে না। প্রচুর মেধাবী ছাত্রছাত্রী ওখানে জায়গা পায় না। ওরাই আশ্রয় নেয় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাহলে তো সেখান থেকেও ভাল ফল আসার কথা। তা হচ্ছে কি? শুনেছি একটি-দুটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় ভাল করছে, দুই-একটি মেডিক্যাল কলেজও ভাল করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দুই-চারটি ভাল করছে। কিন্তু অধিকাংশের অবস্থাই খারাপ। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা নিজেদের মধ্যে গ-গোল, ঝগড়ায় ব্যস্ত। অনেক ক্ষেত্রে সহায়-সম্পদের ভাগ-বাটোয়ারা নাকি ঝগড়ার কারণ। এসব অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন জানে। কিন্তু তারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছে এটা আমরা জানি না।

দৃশ্যতই বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, কারিগরি কলেজ ইত্যাদি একটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে। বেশিরভাগ লোকের ধারণা, এসব প্রতিষ্ঠান সার্টিফিকেট বিক্রির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তারা ব্যস্ত শিক্ষার নামে যথেচ্ছ হারে বেতন আদায়ে। দলীয় লোকজন এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিয়ে শিক্ষাকে বাণিজ্যে পরিণত করেছে। আমার বদ্ধমূল ধারণা এতে আমাদের ভবিষ্যতে খারাপই হবে। অবিলম্বে এ কর্মকা- বন্ধ করা দরকার। শিক্ষাক্ষেত্রের নৈরাজ্যের ফল পাওয়া যায় অনেকদিন পরে। অতএব, এখনই সাবধান। যেসব শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, কারিগরি কলেজগুলো করতে দেয়া হয়েছে সেগুলো নির্দয়ভাবে পরিপালনের উদ্যোগ নিতে হবে। আমার ধারণা এটা করতে গেলে বাধা আসবে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা খুবই প্রভাবশালী। এদের হাত লম্বা, এরা অনেকেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এদের অনেকের ব্যাংক আছে, বীমা কোম্পানি আছে, আমদানি-রফতানি ব্যবসা আছে, পোশাক কারখানা আছে। এক কথায় এরা ব্যবসায়ী এবং শিক্ষা-ব্যবসায়ীও বটে। এমতাবস্থায় কঠোর অবস্থানে থেকে কাজ করতে না পারলে কোন ফল হবে না। যারা কয়েকবার রেয়াত দেয়ার পরও নিজস্ব জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থানান্তর করতে পারেনি তাদের প্রতিষ্ঠানকে ‘অবৈধ দোকান’ মনে করে ভেঙ্গে দেয়া উচিত। যারা আরও সময় চায় তাদের সময় দেয়ার পরও যদি তারা তো পরিপালন না করে তাহলে তাদের কী শাস্তি হবে তা পূর্বাহ্ণেই ঠিক রাখা দরকার। দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, কারিগরি কলেজগুলোর ‘রেইটিং’ করা। ব্যাংকগুলোকে ‘রেইটিং’ করা হয়। এতে আমানতকারীরা জানতে ও বুঝতে পারে কোন্ ব্যাংকের অবস্থা কেমন, কোন্ ব্যাংক আর্থিকভাবে সচ্ছল, কোন্ ব্যাংক ভাল, কোন্টি মন্দ। সেই অনুপাতে আমানতকারীরা তাদের টাকা গচ্ছিত রাখে। এতে তাদের ঝুঁকি কমে। এই ব্যবস্থা সর্বত্রই চালু হচ্ছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, কারিগরি কলেজের সংখ্যা এখন শত শত। বস্তুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্ম হচ্ছে মুড়ি-মুড়কির দোকানের মতো। কোন্টা ভাল কোন্্টা মন্দ কিছুই বোঝা যায় না। এই সুযোগে এসব প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণা করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সার্টিফিকেট বিক্রির প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। অতএব, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অন্যতম কর্তব্য এবং তা এই মুর্হূতে হচ্ছে রেইটিংয়ের ব্যবস্থা করা, যাতে ছাত্রছাত্রীরা বুঝতে পারে কোথায় লেখাপড়া হয়, কোথায় ভাল শিক্ষক আছে, কোথায় লাইব্রেরীর সুযোগ আছে, কোথায় খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা আছে, কোথায় ক্যান্টিনের ব্যবস্থা আছে, কোথায় বিনোদনের ব্যবস্থা ও বিতর্কের ব্যবস্থা আছে। এসব জানলে ছাত্রছাত্রীরা প্রতারণার শিকার হয় না। ‘ইউজিসি’ এই কাজটি করবে কি? একটা ভাল কাজ তারা করেছে। দেখলাম কোন্ কোন্ বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত নয় তার তালিকা ছাপা হয়েছে। ভাল, কিন্তু রেইটিংয়ের কাজটি করা হোক। এতে খারাপ প্রতিষ্ঠানগুলো আপনা-আপনিই ছাত্রাভাবে মারা যাবে। মারা যাক, এটা দরকার। আর দরকার ছাত্রদের বেতন ও ফি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করা। একটা বেতন কাঠামো করে দিলে ভাল হয়। বেতন কাঠামো দরকার শিক্ষক ও ছাত্র উভয়েরই। মনে রাখতে হবে শিক্ষা পণ্য নয়। একে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে।

লেখক : ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ও

সাবেক শিক্ষক ঢাবি

নির্বাচিত সংবাদ