২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঈদে ঢাকা ছাড়বে ৬০ লাখ মানুষ ॥ টিকেট পেতে লড়াই

  • বাস-লঞ্চের টিকেট শেষ্র;###;আজ শেষ হবে ট্রেনের ;###;চলছে সিটি সার্ভিস ও মাইক্রো বুকিং

রাজন ভট্টাচার্য ॥ টিকেটের জন্য হাহাকার চলছে। নৌ-সড়কসহ রেলপথের টিকেট সংগ্রহে ছুটছেন মানুষ। কারও চেষ্টার কমতি নেই। তবুও টিকেট নামের সোনার হরিণের যেন দেখাই মিলছে না। কেউ হতাশ হয়ে কাউন্টার থেকে ফিরছেন। কেউবা ফিরছেন গালভরা হাসি নিয়ে। ঈদ-উল-আযহায় ঢাকা থেকে ঘরমুখো যাত্রীদের জন্য উত্তরবঙ্গের ২১টির বেশি জেলার বাসের টিকেট বিক্রি শেষ। লঞ্চের টিকেট বিক্রিও শেষ হয়েছে। চলছে ট্রেনের অগ্রিম টিকেট বিক্রি। আজ শনিবার শেষ দিনে বিক্রি হবে ২৪ অক্টোবরের টিকেট। বিআরটিসি বাসের টিকেট পর্যাপ্ত থাকলেও সেবার মান ভাল না হওয়ায় কাউন্টারে যাত্রী নেই। বিকল্প হিসেবে অনেকেই মাইক্রোবাস কিংবা সিটিবাস সার্ভিস বুকিং দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। আবার টিকেট পেতে মন্ত্রী, এমপিসহ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের দিয়ে তদবিরও চলছে।

দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদ-উল-আযহা। আর মাত্র ক’দিন। তাইতো আর যেন তর সইছে না। কখন মিলবে টিকেট। মিলবে গাড়ি। এ প্রতীক্ষা সবার। প্রিয়জনের কাছে না যাওয়া পর্যন্ত উৎসবের আনন্দই যেন পরিপূর্ণ হয় না। তাই বাড়ি যেতে চেষ্টা চলছেই। যে যার মতো করেই চালিয়ে যাচ্ছেন। দুই কোটি মানুষের এই শহরে প্রায় ৬০ লাখের বেশি মানুষ এ উৎসবকে কেন্দ্র করে ঘরে ফিরবেন। ধর্মীয় কোন উৎসবকে কেন্দ্র করে একসঙ্গে এত মানুষের একটি শহর ছেড়ে যাবার নজির হয়ত ঢাকাই। পারিবারিক ও সামাজিক এই বন্ধনের ইতিহাস বহু কালের। উৎসবের তিন থেকে চারদিনে একসঙ্গে এত মানুষের যাতায়াতে পর্যাপ্ত পরিবহনের কোন ব্যবস্থা নেই। সড়কপথে দূরপাল্লার বাস কম। নৌ-পথে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে গেলেও পরিবহন স্বল্পতা দীর্ঘদিনের। নিরাপদ যাত্রা হিসেবে সবার প্রথম পছন্দ ট্রেন। কিন্তু নানা সঙ্কটের আবর্তে দেশের রেল যোগাযোগ। ৬৪ জেলায় এখনও রেল নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি। তেমনি ট্রেনের অভাব তো আছেই। ঈদ উৎসবে ট্রেনে ১০ ভাগ যাত্রীর পরিবহন নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। তাই নৌ-সড়কও রেলপথে ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফেরার প্রতিযোগিতা শুরু হয় শেষ মুহূর্তে। সেই সঙ্গে সড়ক মহাসড়কে যানজট, বেহাল রাস্তাসহ নানা কারণে যাত্রী ভোগান্তি তো আছেই। সড়কপথে বড় আতঙ্ক হলো দুর্ঘটনা।

কমলাপুরে রাতজাগা মানুষের ভিড় ॥ ঈদের দু’দিন আগে ২৩ অক্টোবরের টিকেট বিক্রি হয়েছে ছুটির দিন শুক্রবার। তাই কমলাপুরে রেল স্টেশনে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে শত-শত মানুষের ভিড়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শত-শত মানুষের সংখ্যা কয়েক হাজারে পরিণত হয়। অর্থাৎ ১৪ হাজারের কিছু বেশি টিকেটের বিপরীতে চাহিদা ছিল অন্তত ১০ গুণ। বেশিরভাগ যাত্রী শূন্যহাতে বাড়ি ফিরেছেন। এরমধ্যে বেশিরভাগ যাত্রী চারটি টিকেট সংগ্রহ করেছেন। বাড়তি যাত্রীর চাপে বেলা ১২টার মধ্যে বেশিরভাগ রুটের টিকেট শেষ হয়ে যায়। এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন টিকেট প্রত্যাশীরা। রেল কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিভাগের লোকজনের সঙ্গেও টিকেট না থাকা নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে।

শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে বিক্রি শুরু হয় ২৩ সেপ্টেম্বরের অগ্রিম টিকেট। বরাবরের মতই কাউন্টারের সামনে টিকেট প্রত্যাশীদের ভিড় শুরু হয় ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা আগে। প্রচ- ভিড়ের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কাউন্টারের সামনে পৌঁছার অপেক্ষায় থাকতে হয় টিকেট প্রত্যাশীদের। নারীদের জন্য একটিমাত্র কাউন্টার হওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এই ভোগান্তি যারা জয় করতে পেরেছেন তাদের মুখে ছিল বিজয়ের হাসি। দুপুরের দিকে প্রচ- ভিড়ের কারণে নারীদের লাইনটি পাঁচবার দিক বদল করা হয়। পুরুষদের লাইন প্লাটফরম ছাড়িয়ে আসে রাস্তায়।

নেত্রকোনার হাওড় এক্সপ্রেসের টিকেট কাটতে আসা কাদের মিয়া জানান, অনেক আগে থেকে যোগাযোগ করেও সিøপিং টিকেট মেলেনি। আজ এসে চেয়ার পাইনি। অনেক কষ্টে পেয়েছি শোভন। তবুও খুশি তিনি। বলেন, বাড়ি যাওয়া তো নিশ্চিত। রংপুরের টিকেট কাটতে আসা পারভীন বলেন, সকাল ছয়টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি। গরমে অসহনীয় কষ্ট হচ্ছে। ভাষায় প্রকাশ করা মতো না। যাত্রীদের সবাই টিকেট দিতে ধীরগতির কথা জানান। তাই তাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে দিনভর। প্রতিবছরের মতো এবারও রেলওয়ের ২৫ ভাগ টিকেট অনলাইনে, পাঁচ ভাগ ভিআইপি ও আরও পাঁচ ভাগ রেলওয়ের কর্মকর্তাসহ কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ। বাকি ৬৫ ভাগ টিকেট সাধারণ যাত্রীদের কাছে কাউন্টার থেকে সরাসরি বিক্রি হবে।

কমলাপুরের স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলেন, জায়গা সংকীর্ণ হওয়ায় এবং গরমের কারণে টিকেট প্রত্যাশীদের একটু কষ্ট হচ্ছে। ভিড়ের মধ্যে যে কোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং যাত্রী নিরাপত্তায় আনসার, পুলিশ, জিআরপি, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক রয়েছে বলে জানান তিনি।

স্টেশন ম্যানেজার বলেন, ২২, ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বরের টিকেটের চাহিদা বেশি হওয়ায় যাত্রীদের জন্য স্পেশাল ট্রেনও আছে। ঈদের পরেও সাতদিন বিশেষ ট্রেন দেয়া হবে। তিনি জানান, ঈদের জন্য প্রতিদিন বিভিন্ন গন্তব্যের ১৪ হাজার ৬৩৩টি আগাম টিকেট বিক্রি করা হচ্ছে। এর সঙ্গে বিশেষ ট্রেনের টিকেট যোগ করলে প্রতিদিন যাত্রীদের হাতে যাচ্ছে মোট ১৮ হাজার টিকেট। কমলাপুর রেলওয়ে পুলিশের ওসি আব্দুল মজিদ বলেন, নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরায় নজর রাখা হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজ ও গতিবিধি দেখেই কালোবাজারিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।

ঈদ উপলক্ষে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়ার ট্রেনের অগ্রিম টিকেট দুপুরের মধ্যে শেষ হয়ে গেলেও টিকেট প্রত্যাশীদের লম্বা লাইনের যেন শেষ ছিল না। অনেকে টিকেট শেষ হওয়ার খবর না জেনেই বিকেল পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ঈদের অগ্রিম টিকেট দেয়া শুরু হয়েছে। শনিবার আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের টিকেট বিক্রির মাধ্যমে অগ্রিম টিকেট দেয়া শেষ হবে।

রেল মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে বিক্রি হয় ২০ সেপ্টেম্বরের অহিগ্রম টিকেট। এই হিসেবে শনিবার অগ্রিম টিকেট বিক্রি যেমন শেষ হবে তেমনি রেলপথে অগ্রিম টিকেট কাটা যাত্রীদের বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রাও শুরু হবে। ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে পাওয়া যাবে ফিরতি টিকেট। এদিন বিক্রি হবে ২৭ সেপ্টেম্বরের টিকেট। ২৪ সেপ্টেম্বর বিক্রি হবে ২৮ সেপ্টেম্বরের, ২৫ সেপ্টেম্বর বিক্রি হবে ২৯ সেপ্টেম্বরের, ২৬ সেপ্টেম্বর ৩০ সেপ্টেম্বরের টিকেট এবং ২৭ সেপ্টেম্বর বিক্রি হবে ১ অক্টোবরের টিকেট। বর্তমানে রেলের মোট ৮৮৬টি কোচ রয়েছে। ঈদ উপলক্ষে ১৩৮টি কোচ ঈদের আগেই ট্রেনের বহরে যুক্ত হবে। ১৯৯টি ইঞ্জিন চালু রয়েছে; ঈদ সামনে রেখে মেরামতকৃত আরও ২৫টি বহরে যুক্ত হবে।

উত্তরবঙ্গের বাসের টিকেট নেই ॥ পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২২-২৪ সেপ্টেম্বরের বাসের টিকেটের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। যা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। বিলাসবহুল বাসের টিকেট পেতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে সবাইকে। গেল শুক্রবার অর্থাৎ ১১ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে বিভিন্ন পরিবহন কাউন্টারে ১৭-২৪ সেপ্টেম্বরের টিকেট বিক্রি শুরু হয়। এই হিসেবে বৃহস্পতিবার থেকে বাসের অগ্রিম টিকেট নেয়া যাত্রীরা বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রা শুরু করেছেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্লাহ জানান, এখন বিভিন্ন কাউন্টারে টিকেটের জন্য যাত্রীরা এসে ভিড় করছেন। কেউ টিকেট ফেরত দিলে নতুন যাত্রীদের তা দেয়া হচ্ছে। তবে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের এখন মনোযোগ যথাসময়ে বাস ছাড়া ও গন্তব্যে পৌঁছা নিয়ে। মহাখালী ও সায়েদাবাদ থেকে যে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের বাসের কোন অগ্রিম টিকেট দেয়া হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, এই দুই টার্মিনাল থেকে কখনই অগ্রিম টিকেট বিক্রি হয় না। যাত্রীরা আসামাত্রই টিকেট কেটে গাড়িতে উঠতে পারবেন। আর যাত্রী হলেই গাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।

ঢাকা নদীবন্দর থেকে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের জন্য লঞ্চের টিকেট বিক্রি শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এখন যা আছে তা হল সাধারণ আসন। অর্থাৎ কেবিনের অগ্রিম টিকেট বিক্রি শেষ। তবুও কেবিনে যারা আরাম আয়েশে যেতে চান তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে ছুটির দিনে রাজধানীর বিভিন্ন টার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখা গেছে। অনেকেই ঝামেলা এড়াতে পরিবার-পরিজন একটু আগে ভাগেই পাঠাতে শুরু করেছেন। সব মিলিয়ে টিকেট যুদ্ধও প্রায় শেষ পর্যায়ে। যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যাত্রীদের আতঙ্ক তো আছেই। রোজার ঈদে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রায় ভয়াবহ যানজটে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি চরমে ওঠে। যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনার দিক বিবেচনায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কটি এবারও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন পরিবহন মালিক শ্রমিকরা। সব মিলিয়ে এখন নিরাপদে বাড়ি ফেরার পালা।