২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিলেটের সুমির মডেল হওয়ার স্বপ্ন এ্যাসিড সন্ত্রাসে চুরমার!

সিলেটের সুমির মডেল হওয়ার স্বপ্ন এ্যাসিড সন্ত্রাসে চুরমার!
  • পরিবার তাকে আশ্রয় দিতে চায় না, যাবে কোথায়?

শর্মী চক্রবর্তী ॥ অনেক স্বপ্ন নিয়ে ছোট বেলা থেকে অনেক কষ্ট করে বেড়ে ওঠে সুমি। দেখতেও তেমন খারাপ নয়। স্বপ্ন দেখেছিলেন মডেল হওয়ার। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে চালিয়ে গিয়েছিলেন জীবন সংগ্রাম। কিন্তু তার সব স্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে সর্বনাশা এ্যাসিড। এমনকি আপনজনেরাও দূরে সরে গেছে। সবাই থাকতেও এখন সুমি একা। কেউ নিতে চায় না তাকে। সৎ বাবা-আপন মামা, কেউ নয়। সর্বনাশা এ্যাসিডে সুমি এখন নিঃস্ব। হারিয়েছে তার সুন্দর মুখ ও দুই চোখ। দু’চোখে কিছুই দেখতে পারে না। সবকিছু হারিয়ে হতভাগা মেয়েটি এখন এ্যাসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশনে আছে। তাদের মাধ্যমে নিচ্ছে চিকিৎসা। শুধু একটা চিন্তায় দিন কাটে তার। তার চোখ দুটি কি ঠিক হবে? চায় আল্লাহ তার একটা চোখ হলেও ঠিক করে দিক। তাহলে অন্তত কাজ করে দু’মুঠো খেতে পারবে। কারও কাছে হাত পাততে হবে না তার। রঙিন স্বপ্নে নিজেকে ঘিরে রাখা সুমির মাত্র ৮ থেকে ২২ বছর বয়স পর্যন্ত বাবা-মাসহ পারিবারিক বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। এরপরও কারও কাছে হাত পাতা কিংবা কারও কোন করুণায় নয়, অদম্য সুমি নিজেই নিজেকে চালাচ্ছিলেন বিউটি পার্লারে কাজ করে। কিন্তু এ্যাসিড সন্ত্রাস তাকে এতটাই ক্ষতি করেছে, সুন্দর চেহারা ও দেহের বিভিন্ন স্থান ঝলসানোর পাশাপাশি চোখ দুটো চিরতরে নষ্ট হওয়ার উপক্রম।

সুমি যখন ছোট ছিলেন তখন তার বাবা-মার ইচ্ছা ছিল তাকে পুলিশ বানাবে। কিন্তু তারা এখন কেউ নেই। একা একা বেড়ে ওঠার পর তার মনেও আরেকটি ইচ্ছে বড় হয়। আর তা হলো তিনি মডেল হবেন। এজন্য তিনি পেশাদার আলোকচিত্রী দিয়ে ছবিও তুলিয়ে চেষ্টাও শুরু করেছিলেন। কিন্তু এখন তার সেই স্বপ্নও শেষ হয়ে গেল।

এ্যাসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশন (এএসএফ) সূত্রে জানা যায়, সুমির পাশে এখন কেউ নেই। এ্যাসিড সন্ত্রাসের পর থেকে তার আত্মীয় স্বজন কেউ তাকে নেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। সৎ বাবাও তার মাকে নিষেধ করে দিয়েছে সুমির সঙ্গে যোগাযোগ না করতে এবং তাকে দেখতে আসতেও মানা করেছে। এখন সুমি তার চোখের চিন্তায় আছে। সুমি জানান, যদি চোখ ঠিক না হয়, কেউ তাকে না নেয়, তাহলে রাস্তায় থাকা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই তার। এসব বিষয়ে ভেবে সব সময় হতাশায় থাকে সুমি। মনে এসব কষ্ট নিয়ে নীরবে শুধুই কাঁদেন।

২০১৪ সালের ২১ নবেম্বর এ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হন সিলেটের তরুণী সুমি। শহরের জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস রোডে, রাত প্রায় নয়টায় এই ঘটনা ঘটে। প্রতিদিনের মতো সেদিন সুমি শহরে তার কর্মস্থল দুলহান বিউটি পার্লারে কাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন। ফেরার পথেই ভয়ঙ্কর এ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হন। এতে তার শরীরের ২৩ শতাংশ ঝলসে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার মুখ ও দুই চোখ। এ্যাসিডদগ্ধ সুমিকে প্রথমে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে কিছুদিন চিকিৎসার পর সিলেট হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) বার্ন ইউনিটে পাঠান। খবর পেয়ে এএসএফ তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। এবং তাকে চিকিৎসা দেয়ার জন্য নিয়ে আসে তাদের চিকিৎসাকেন্দ্রে। তখন থেকে সুমি এসএসএফের চিকিৎসাকেন্দ্রেই আছেন।

১৩ বছর বয়স থেকে প্রতিবেশী দুলুর সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল সুমির। ভাল চলছিল তাদের বন্ধুত্ব। কিন্তু বছর খানেক ধরে দুলু তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে। কিন্তু সুমি তাকে জানিয়ে দেয়, দুলুকে তিনি বন্ধু হিসেবেই দেখেন অন্য কিছু হিসেবে নয়। এতসব বলার পরও যখন দুলু বুঝতে চাচ্ছিল না তখন সুমি দুলুর চাপের মুখে জানিয়েছিলেন তার ব্যক্তিগত অবস্থা। তার বাবা নেই, মা থেকেও নেই। তাকে দুলুর পরিবার মেনে নেবে না। এসব কিছু শোনার পর দুলু পরামর্শ দেয় কোর্টম্যারেজ করবে। কিন্তু এতে মান-সম্মান নষ্ট হবে বলে সুমি রাজি হননি। দুলু ক্ষিপ্ত হন সুমির ওপর। তবে দুলুর সঙ্গে তার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে কোন বেপরোয়া চলাফেরা ছিল না সুমির। কারণ দিনরাত পার্লারেই কাজ করতেন।

জানা যায়, মাত্র ৮ বছর বয়সেই সুমির বাবা তাকে ও তার মাকে ছেড়ে চলে যায়। আজ অবধি তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। সে সময় তার ছোট একটি ভাই ছিল। এরপর সুমির মা’র অন্যত্র বিয়ে হয়। সে ঘরে এক মেয়ে আছে। মায়ের বিয়ের পর সুমি ও সুমির ভাই থাকত তার খালার বাসায়। খালার মাধ্যমে সেখান থেকেই যুক্ত হন বিউটি পার্লারের সঙ্গে। সে সময় হঠাৎ তার ছোট ভাই হারিয়ে যায়, আজও যার খোঁজ মেলেনি।

সুমি জানান, খাইতে পারতাম না। মানুষ আমাদের অনেক মারত। মাঝে মধ্যে ফুটফরমাইশ শুনলে খাওন দিত। প্রথমে বিউটি পার্লার ঝাড়ু দিতাম। পরে আস্তে আস্তে পার্লারের কাজ শিখি। জীবনের প্রথম বেতন পেয়েছিলেন এক হাজার টাকা। সর্বশেষ মাসিক ১০ হাজার টাকা পেতেন। চাকরি অবস্থাতেই সুমি পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। উš§ুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল তার।

এ্যাসিড নিক্ষেপকারী দুলুই বলে জানান সুমি। এর আগেও ২০১৪ সালের ২৭ জুন একবার এ্যাসিড নিক্ষেপের চেষ্টা করেছিল দুলু। তখন ভাগ্যের জোরে সুমি রক্ষা পেয়েছিলেন। এরপর বন্ধু দুলু ভাড়া করা কাউকে দিয়ে এই কাজ করিয়েছেন। এ্যাসিডে আক্রান্ত হওয়ার পর এই দুলুই তাকে ওসমানী মেডিক্যাল ও ঢাকা মেডিক্যালে আনে। দুলুর বরাত দিয়ে সুমি জানান, দুলু চেয়েছিল এ্যাসিডে তার চেহারা সামান্য যেন ক্ষতি হয়। তবে এতে এত বড় ক্ষতি হবে সেটা ভাবতেই পারেনি। ঘটনার পর সুমির মা শাহপরাণ থানায় দুলুসহ ৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছিলেন। এতে দুজন গ্রেফতার হলেও বাকিরা পলাতক।

এএসএফের প্রচার ও যোগাযোগ বিভাগের সমন্বয়কারী একে আজাদ জানান, এএসএফের টিম গিয়েছিল সুমির পরিজনের কাছে। কিন্তু কেউ তাকে নিতে রাজি নন। তার মা পরের ঘর করেন, সৎ বাবা সুমিকে নিতে নারাজ। তারপরও সুমির মা সুযোগ পেলে মেয়ের কাছে ফোন দিয়ে খবর নেয় তাও সৎ বাবাকে লুকিয়ে। অন্যদিকে সুমির মামার আর্থিক অবস্থা ভাল নয়, তাই তিনিও নিতে চান না। তিনি আরও জানান, সুমির যে অবস্থা তাতে তার বাড়তি যতœআত্তি দরকার। দরকার ভাল মানের খাবার, মানসিক শক্তি দরকার। এ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার কাউকে বাবা-মা বা আত্মীয়-স্বজন কেউ নিতে চায় না’Ñ এমন ঘটনা এএসএফের বয়সে এটাই প্রথম বলে উল্লেখ করেন তিনি। একে আজাদ আরও জানান, বর্তমানে সুমি মানসিকভাবে একটু বিপর্যস্ত। তাই তার মানসিক চিকিৎসা চলছে। এছাড়া আমরা সুমির চোখ ভাল করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছি। বাংলাদেশের সব চিকিৎসক জানিয়ে দিয়েছেন সুমির চোখ আর ভাল হবে না। তবে আমরা একটা শেষ চেষ্টা করতে চাই। তাই সুমির পাসপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে। তাকে আমরা ইন্ডিয়াতে পাঠাব চোখের চিকিৎসার জন্য।

সুমি এখন একটা আশা নিয়েই আছে যেন তার একটা চোখ হলেও তার ভাল হবে। তার চোখ যদি ভাল না হয় তাহলে মরণ ছাড়া তার আর কোন উপায় থাকবে না। রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে। বর্তমানে সুমি এ্যাসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশনে চিকিৎসার জন্য আছেন কিন্তু যখন চিকিৎসা শেষ হয়ে যাবে তখন সে কোথায় যাবেÑ এই প্রশ্নের জবাব নেই কারও কাছে।