২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিদেশে সনদ জালিয়াতি ধরা পড়ার জের ॥ ৩৫৭০ নৌ অফিসার ক্যাডেট নাবিক কর্মহীন

  • কয়েক দেশে অন এ্যারাইভাল ভিসা বন্ধ ॥ ভুয়া ও সিডিসিধারী সনদ নিয়ে নৌবাণিজ্য সেক্টরে তুঘলকি কাণ্ড

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ ২৯ কোটি টাকার দুর্নীতি, ৫ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির ঘটনাসহ অনিয়ম জালিয়াতির তদন্তই হলো না। আন্তর্জাতিক বাজারে দেড় লাখ নাবিকের চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশী নৌ অফিসার, ক্যাডেট ও নাবিকরা সে বাজারে ঢুকতে পারছে না। ভুয়া সনদ ও জাল সিডিসিধারী অসংখ্য নাবিক ধরা পড়ার পর ইতোমধ্যেই ২৮শ’ ভুয়া সনদ ও সিডিসিধারীর (কন্টিনিউয়াস ডিসচার্জ সার্টিফিকেট) সনদ বাতিল করেছে। কয়েকটি দেশে বাংলাদেশী নাবিকদের অন এ্যারাইভাল ভিসা বাতিল করে দিয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক প্রকৃত অফিসার, ক্যাডেট ও নাবিক বর্তমানে কর্মহীন। দুর্নীতিবাজদের কারণে তাদের কপাল পুড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জাহাজ চলাচল সেক্টরে ৩৭০ অফিসার, ১২শ’ ক্যাডেট ও ২ হাজার নাবিক কর্মহীন। সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের অধীন কয়েকটি সংস্থার দুর্নীতি ও অনিয়ম মারাত্মক পর্যায়ে উপনীত হওয়ার পর তিনটি তদন্ত কমিটির কার্যক্রমও থমকে দিতে সক্ষম হয়েছে দুর্নীতিবাজ চক্র। এ অধিদফতরের অধীন চট্টগ্রাম নৌ পরিবহন অধিদফতর, শিপিং মাস্টার, নাবিক নিয়োগ ও ট্রেনিং কেন্দ্রে অন্ততপক্ষে ২৯ কোটি টাকার দুর্নীতির হওয়ার পর একের পর এক অভিযোগ হলেও এ নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর। শুধু তাই নয়, সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর থেকেই একের পর এক ভুয়া ও অবৈধ সীম্যান আইডি ইস্যু করার জের হিসেবে বহির্বিশ্বে এসব ঘটনা ধরা পড়ে যাওয়ায় গত আগস্টে ২৮শ’ অবৈধ সীম্যান আইডি বাতিল করা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে। ’১৪ সালের নবেম্বরে বে মেরিটাইম ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নামের একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ৭ ক্যাডেট সিঙ্গাপুরের ভিসা নিয়ে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার পর ঢাকার সিঙ্গাপুর দূতাবাস বাংলাদেশী নাবিকদের ভিসা দেয়া বন্ধ করে। এরপর চলতি মাসের প্রথমদিকে বেলজিয়াম, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং এবং ইরানেও এ ধরনের জাল সনদধারী ক্যাডেট ধরা পড়ে। সর্বশেষ কম্বোডিয়া সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়, সে দেশের এমভি ওয়াং মিং নামে একটি জাহাজে বাংলাদেশী ক্যাপ্টেন এবং চীফ ইঞ্জিনিয়ার ভুয়া হিসেবে ধরা পড়েছেন। অপরদিকে, শুধু ইরানে বাংলাদেশী নাবিকদের ‘ওকে টু বোর্ড’ সুবিধার বিপরীতে বিনা ভিসায় ভ্রমণের সুযোগ ছিল। গত বছর সৌদি আরবের একটি জাহাজে চাকরি নেয়া ১৭ বাংলাদেশী নাবিক বিদেশের বন্দর থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এসব কারণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়ে ২৮শ’ ভুয়া সীম্যান আইডি বাতিল করতে বাধ্য হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিপিং সেক্টরে বিভিন্ন দুর্নীতির কারণে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের নির্দেশে চট্টগ্রাম শিপিং অফিসে শিপিং মাস্টারসহ ৬ জনকে সরিয়ে দেয়া হয়। শিপিং অফিস, নৌ বাণিজ্য অধিদফতর অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অস্তিত্ববিহীন নৌযানের বিপরীতে ফিটনেস প্রদানের অবৈধ তৎপরতা নিয়ে তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরিয়ে দেয়া শিপিং মাস্টারের দায়িত্ব পালনকালীন দুর্নীতির পরিমাণ প্রায় দশ কোটিতে উন্নীত হয়। এছাড়া সরকার ওই সময় রাজস্ব হারায় প্রায় সোয়া কোটি টাকার। অপরদিকে, চট্টগ্রাম নৌ বাণিজ্য অধিফতরে আর্থিক দুর্নীতির ঘটনা ৮ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় চার কোটি টাকা। এছাড়া অস্তিত্ববিহীন নৌযানের ফিটনেস ইস্যু ও নবায়নের ক্ষেত্রে দুর্নীতির পরিমাণ ২০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

এসব ঘটনা নিয়ে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু প্রায় আড়াই মাসে তদন্তের কোন কাজই শুরু করতে পারেনি কমিটি। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ অর্থে উঁচু মহলকে প্রভাবিত করে তদন্ত কমিটিকে এগোতে দিচ্ছে না। পাশাপাশি যে শিপিং মাস্টারকে দুর্র্নীতির অভিযোগে সরিয়ে দেয়া হয় তিনি পুনরায় চট্টগ্রামে ফিরে আসার তদ্বিরে লিপ্ত। সূত্রে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে হয়ত দুর্নীতিবাজ চক্রের সহায়তায় অভিযুক্ত শিপিং মাস্টার তার অপতৎপরতায় সফলতা লাভ করতে পারেন।

এদিকে, নৌ বাণিজ্য অধিদফতরের ব্যাপারে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির অভিযোগে বলা হয়েছে, চলতি বছর মার্চে জাতীয় অডিট কমিটিকে ম্যানেজ করে রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। অথচ, নৌবাণিজ্য অধিদফতরে শুধু রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন কোটি টাকা। মংলা বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হওয়া সত্ত্বেও খুলনা নৌবাণিজ্য অধিদফতরের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে অর্ধকোটি টাকা। নাবিকদের চক্ষু পরীক্ষার জন্য গৃহীত ৫শ’ টাকা হারে ফি দুর্নীতিবাজরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছে। নৌ বাণিজ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে প্রেরিত একপত্রে সম্পূর্ণ অবৈধ পন্থায় ৩০ বছরের উর্ধে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৭৫ নৌযানকে ফিটনেস দিয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শন ব্যতিরেকে অস্তিত্ববিহীন নৌযানের ফিটনেস প্রদান সংক্রান্ত একটি তদন্ত ধামাচাপা দেয়ার পরও অভিযোগটি পুনঃ তদন্তের বিষয়ে মন্ত্রণালয় কমিটি টালবাহানায় লিপ্ত। এ ঘটনা কেন্দ্র করে এর আগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) পক্ষ থেকে ত্রিশ বছরের উর্ধে নৌযানগুলো চিহ্নিত করে স্ক্র্যাপের আওতায় আনার ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়। অথচ, হয়েছে এর উল্টো।

এদিকে, ভুয়া সীম্যান আইডি বাতিল ঘোষণার পর বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হয়েছে। ফলে প্রকৃত সিডিসিধারী ও নাবিকের কর্মসংস্থানের পথ রুদ্ধ। তবে নতুন করে অন্য কোন দেশে এ নিয়ে আর কোন অবনতি এখনও ঘটেনি। জাল সিডিসি ও নকল সনদের বিপরীতে প্রায় ৮ কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর ঘটনা মারাত্মক দুর্র্নীতির পর্যায়ে পড়লেও তা নিয়ে তদন্ত কমিটি কাজই শুরু করতে পারছে না কেন, তা বড় ধরনের জিজ্ঞাস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, দেশের ৪০ সমুদ্রগামী জাহাজ, ২শ’ ফিশিং ট্রলার, ৫ হাজার ফিশিং ও কার্গো বোট, ৩শ’ উপকূলীয় তেল ও মালবাহী জাহাজের ফিটনেস প্রদানে জড়িত মাত্র দুই সার্ভেয়ার। এদের একজন খ-কালীন। নৌ বাণিজ্য অধিদফতরের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরাও দৈনিক ১০-১৫ ফিশিং ও কার্গো বোটের ভুয়া সনদ ইস্যুর সঙ্গে জড়িত থাকার ব্যাপারে অভিযোগ পাওয়ার পরও এ ঘটনা নিয়ে সদর দফতরের কোন তদন্ত বা কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

এর আগে ২০১১ সালেও চট্টগ্রাম শিপিং মাস্টারের বিরুদ্ধে ১শ’ নাবিক নিয়োগে বিভিন্ন জালিয়াতির প্রমাণ উদঘাটিত হয়। এরপর ২০১৪ সালে সরকারী একটি তদন্ত কমিটি ওই সময়ের শিপিং মাস্টারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সত্যতা পাওয়ার পর তিনিসহ ৬ জনকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে। সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের নিয়ন্ত্রণাধীন এসব সংস্থার অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশী প্রকৃত অফিসার, ক্যাডেট ও নাবিক বিদেশে চাকরির বাজার হারাচ্ছেন। চট্টগ্রাম ও ঢাকাকেন্দ্রিক ভুয়া নাবিক রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এ অপকর্ম চালিয়ে দুর্নীতিবাজরা বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলেছে। বহির্বিশ্বে বর্তমানে বিদেশী জাহাজে প্রায় দেড়লাখ নাবিকের চাকরির সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশী নাবিকরা তা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশী নাবিকদের অন এ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা স্থগিত করে রেখেছে ভারত, সিঙ্গাপুর, কম্বোডিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বেলজিয়াম। যাদের কারণে বাংলাদেশের এ ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ এবং দেশীয় নাবিকরা বিদেশে চাকরি লাভে ব্যর্থ হচ্ছে তাদের ব্যাপারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরের কথা, তদন্তই সেখানে শুরু করা যাচ্ছে না। ফলে নিশ্চিত করে বলা যায়, এদের খুঁটির জোর ব্যক্তিগত প্রভাবে নয়, বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের কারণেই সম্ভব হচ্ছে না। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করা না হলে আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যে নাবিক নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চরম ক্ষতির মুখে পড়বে বলে শিপিং সেক্টরের বিশেষজ্ঞ সূত্রসমূহে জানানো হয়েছে। এ সেক্টরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী শুক্রবার জনকণ্ঠকে জানান, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এ খাতটি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেই। অথচ এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এ সেক্টরের সকলেরই দাবি।

উল্লেখ্য, বর্তমানে সরকারী পর্যায়ে নৌ ক্যাডেট প্রশিক্ষণের জন্য রয়েছে শুধু চট্টগ্রামের মেরিন একাডেমি। বেসরকারী পর্যায়ে রয়েছে ১৮টি। এগুলোর অবস্থান অধিকাংশ ঢাকায়। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১৪ প্রাইভেট মেরিন একাডেমি যে অনুমোদন লাভ করে এগুলো থেকে প্রকৃতপক্ষে প্রশিক্ষণ গ্রহণের বিষয়টি সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এসব নিয়ে অভিযোগ হওয়ার পর বর্তমানে একটি তদন্ত শুরু হয়েছে একাডেমির মান যাচাইয়ের জন্য। ধারণা করা হচ্ছে, এর ৯০ শতাংশের অনুমোদন বাতিল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।