২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চামড়া পাচার রোধে মাঠে টাস্কফোর্স

গাফফার খান চৌধুরী ॥ চামড়া পাচার রোধে স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স যৌথভাবে মাঠে নেমেছে। দেশীয় চামড়াশিল্প শক্তিশালী করতে এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে চলতি অর্থবছরে প্রায় এক শ’ কোটি মার্কিন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছে টাস্কফোর্স। এজন্য চামড়া পাচার রোধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে সরকার।

ঢাকাসহ দেশের অভ্যন্তরেই চামড়া পাচার রোধে ৭৭টি এবং সীমান্তে বেশ কয়েকটি বাড়তি চেকপোস্ট বসছে। শুধু ঢাকার চারদিকেই বসছে ১৪টি চেকপোস্ট। ঈদপরবর্তী তিন দিন ঢাকা থেকে চামড়াবাহী সব ধরনের যানবাহন ঢাকার বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে চামড়াবাহী যানবাহন ঢাকায় ও সাভারে প্রবেশ করতে পারবে। চামড়া পাচার সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেয়াসহ পাচারকারীদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। ভাল চামড়ার সঙ্গে নিম্নমানের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বেআইনীভাবে চামড়া বেচাকেনার সঙ্গে জড়িতদের তাৎক্ষণিকভাবে জেল-জরিমানা করতে মাঠে থাকছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে ছোট-বড় ৩শ’ চামড়া প্রস্তুতকারী কারখানা রয়েছে। এরমধ্যে ঢাকায় ২৬৫টি। প্রতিবছর ঈদ-উল-আযহায় সারাদেশে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ প্রাণী কোরবানি হয়। অধিকাংশ চামড়াই ঢাকায় আসে। কারণ ঢাকায় চামড়া প্রস্তুতকারী কারখানার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বাকি চামড়ার মধ্যে অধিকাংশই সাভারে যায়। বাকিগুলো দেশের বিভিন্ন জেলায় থাকা কারখানায় চলে যায়।

পরিসংখ্যান মোতাবেক বাংলাদেশ থেকে রফতানিকারক পণ্যের মধ্যে শীর্ষে তৈরি পোশাক, দ্বিতীয় অবস্থানে হিমায়িত মাছ এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। বিগত দিনগুলোর মধ্যে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে ৫০ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৬২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে বৈদেশিক আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় এক শ’ কোটি ডলার। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এবং দেশীয় চামড়াশিল্প অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করতে সরকার চামড়া পাচার রোধে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে।

এছাড়া জেলা হাইওয়ে পুলিশের তরফ থেকেও বিভিন্ন জেলায় চেকপোস্ট বসানো হচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পাচার রোধে টহল জোরদার করেছে বিজিবি। পাচার বন্ধ করে দেশীয় চামড়াশিল্প চাঙ্গা করতেই সরকার এমন উদ্যোগ নিয়েছে। চামড়া পাচারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে সরকার।

স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স চামড়া পাচার রোধে যৌথভাবে কাজ করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চামড়া পাচার বন্ধ করতে পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিজিবিকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে। এসব বাহিনীর প্রধানরা চামড়া পাচার রোধে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া জানান, চামড়া পাচার রোধে রাজধানীর চারদিকে ১৩টি চেকপোস্ট বসানো হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এসব চেকপোস্ট বসছে পোস্তা, লালবাগ, হাজারীবাগ,সোয়ারীঘাট, সদরঘাট, আশুলিয়া বেড়িবাঁধ, আমিনবাজার, গাবতলী, সাভার, সাভারের বইলারপুর, আব্দুল্লাহপুর, যাত্রাবাড়ীসহ মোট ১৪টি জায়গায়। সাভারের বইলারপুরের চেকপোস্টটি পরিচালনা করবে ঢাকা জেলা পুলিশ। সড়ক-মহাসড়ক ছাড়াও টহল জোরদার করা হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে। চেকপোস্ট বসছে গাজীপুরের জয়দেবপুর চৌরাস্তা, মানিকগঞ্জ, মাওয়া ফেরিঘাট, কাঁচপুর ব্রিজসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সুলতানা কামাল ব্রিজ এলাকায়। এছাড়া রেলস্টেশন ও লঞ্চ টার্মিনালেও চেকপোস্ট বসানো হবে।

চেকপোস্টে অহেতুক তল্লাশির নামে টাকা আদায় বা হয়রানির সঙ্গে জড়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রতিটি চেকপোস্ট ছাড়াও বিভিন্ন পয়েন্টে ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করবে। বেআইনীভাবে চামড়া বেচাকেনার সঙ্গে জড়িতদের সরাসরি গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাদের তাৎক্ষণিক জেল-জরিমানাও করা হবে। এমনকি চামড়া বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজিসহ যে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বাড়তি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পাড়া-মহল্লায় চামড়া বেচাকেনা নিয়ে যাতে কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক মল্লিক ফখরুল ইসলাম জানান, চামড়া পাচার রোধে সারাদেশেই সড়ক-মহাসড়ক ও সীমান্ত জেলাগুলোতে চেকপোস্ট বসছে। জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ যৌথভাবে চেকপোস্টগুলো পরিচালনা করবে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে চামড়া পাচার রোধে অন্তত ৭৭টি চেকপোস্ট বসছে। এছাড়াও টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবে পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি মাঠে থাকছে সকল গোয়েন্দা সংস্থা ও বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ)। চামড়া পাচারের সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রও জড়িত। মূলত বাড়তি টাকার লোভে ভাল চামড়ার সঙ্গে নিম্নমানের চামড়া রফতানি করে থাকে কিছু ব্যবসায়ী, যা দেশের ভাবমূর্তি বিদেশে চরমভাবে বিঘিœত করেছে।

একাধিক চামড়া ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে জানান, চামড়া ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রক্রিয়াজাতকরণের আওতায় আনতে হয়। বিশেষ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চামড়া পরিষ্কার করতেই হবে। অন্যথায় চামড়ায় পচন ধরে। চামড়া পরিষ্কারের অর্থ ধৌত করা নয়। চামড়া ভালভাবে ধৌত করে তা থেকে চর্বি ও মাংস পরিষ্কার করতে হয়। এরপর পরিমাণমতো লবণ দিতে হয় চামড়ায়। কত বর্গফুট চামড়ায় কী পরিমাণ লবণ দিতে হয়, তারও হিসাব আছে। সঠিক সময়ের মধ্যে পরিমাণমতো লবণ দেয়ার মধ্য দিয়েই আসল বা পাকা চামড়া তৈরির প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। যেসব চামড়ায় সময়মতো লবণ দেয়া সম্ভব হয় না তা নিম্নমানের চামড়ায় পরিণত হয়। সময়মতো লবণ না দিলে চামড়া পচে আংশিক বা পুরোটাই নষ্টও হয়ে যায়।

এমন সুযোগকেই কাজে লাগায় চামড়া পাচারকারী ও অসাধু চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলো। চামড়া কয়েকটি ধাপে বেচাকেনা হয়। মাঠপর্যায় থেকে প্রথমে খুচরা ক্রেতা, এরপর তাদের থেকে মাঝারিমানের ক্রেতারা কিনে থাকে। এরপর থানাপর্যায়ের ক্রেতারা চামড়াগুলো যানবাহনযোগে চামড়ার বাজারগুলোতে বিক্রি করতে নিয়ে যান। মূলত এখানেই সিন্ডিকেট বা পাচারকারীদের কারসাজি।

চামড়া যেহেতু পচনশীল, এমন সুযোগকে কাজে লাগায় অসাধু ব্যবসায়ীরা। তারা সিন্ডিকেট করে চামড়া কেনা ইচ্ছা করেই বন্ধ রাখে। এমন পরিস্থিতিতে চামড়া বিক্রেতারা পড়েন মহাবিপাকে। কারণ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিষ্কার করে উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় লবণ দিতে না পারলে চামড়া পচতে বাধ্য। ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে মাঝারিমানের ব্যবসায়ীরা সস্তায় চামড়া বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। যারা বিষয়টি বুঝতে পারেন, তারা হয় সস্তায় নতুবা পাচারকারী সিন্ডিকেট বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের কাছে আগেই চামড়া বিক্রি করে দেন। চামড়ায় লবণ দেয়ার প্রক্রিয়াটি মাঝারিমানের ব্যবসায়ীদের প্রায় সবারই অজানা। এমন সুযোগকেই পুরোপুরি কাজে লাগায় চামড়া পাচারকারী ও অসাধু চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলো। যারা চামড়া পরিষ্কার করে তাতে লবণ দেয়ার প্রক্রিয়া জানেন, তারা সহজেই চামড়া বিক্রি করেন না। তবে এ সংখ্যা খুবই কম।

চামড়া পাচারকারী সিন্ডিকেটের অধিকাংশই প্রক্রিয়াজাত করে রাখা চামড়া কিনে থাকে। কারণ এসব চামড়ার গুণগতমান খুবই ভাল। সিন্ডিকেটের সদস্যরা আবার নিম্নমানের চামড়াও কিনে থাকে। তারা ভাল চামড়ার আড়ালে নিম্নমানের চামড়া বিক্রি করে দেয়। শুধু পাচারের ক্ষেত্রে নয়, বৈধভাবে চামড়া রফতানির ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে। এ কারণে বাংলাদেশের চামড়াশিল্প নিয়ে বিদেশী ক্রেতাদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে।

চামড়া পাচারের বিষয়ে রহমান লেদার ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক আব্দুর রহমান জানান, অবশ্যই চামড়া পাচার বন্ধ হওয়া উচিত। কতিপয় অসাধু চামড়া পাচারকারীর কারণে পুরো শিল্পের দুর্নাম হচ্ছে। দেশে-বিদেশে ভাবমূর্তিও ক্ষুণœ হচ্ছে। দ্রুত চামড়া পাচারের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবিও জানান তিনি।