২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আলমাস ভাই ফিরে আসুন...

আলমাস ভাই ফিরে আসুন...

আলমাস আলী দেওয়ান। দেশের একজন গুণী বেহালাবাদক, একজন সঙ্গীত পরিচালক। বাবা রজব আলী দেওয়ান ছিলেন একজন নামী বাউল গায়ক। তিনি লিখেছেন হাজার হাজার গান। যা এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তাঁর কী কথা কী সুর। অন্তর ছুঁয়ে যায়। গানের টানে আলমাস ভাই আর কিছু জীবনে করতে পারেননি। ইচ্ছে করলে গায়ক হতে পারতেন। তিনি সেদিকে যাননি। হাতে তুলে নিয়েছেন বেহালা। বাবার সঙ্গে রাত জেগে বিচার গানের আসরে বেহালা বাজাতেন, কখনও দোহারি করতেন। সেই ’৮০-এর দশকে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। সবে গানের ভুবনে পা রেখেছি। কাউকে তেমন চিনি না-জানি না। আরও কয়েকজনের মতো আমাকে কাছে টেনে নিলেন আলমাস ভাই। ধীরে ধীরে দুজন কাছাকাছি হয়ে গেলাম। আমার সব গানে বেহালা বাজাতেন তিনি। কাজ আমার কিন্তু আমি থাকতাম চিন্তামুক্ত। ভরসা একটাইÑ আলমাস ভাই। তাঁকে দেয়া কাজ এমন সুন্দরভাবে শেষ করতেন যে কিছুই বলার থাকত না। তিনি আনুমানিক এক হাজার এ্যালবামের মিউজিক ডিরেক্টর। এর মধ্যে আমাদের দেশের জনপ্রিয় শিল্পী সংসদ সদস্য মমতাজেরও শত শত গান রয়েছে। প্রথম জীবনের সব গানই তাঁর আলমাস ভাই করেছেন। সে সময় বেহালা মানেই আলমাস ভাই। কারও সঙ্গে কখনও টাকা-পয়সা নিয়ে দরাদরি করেছেন বলে আমার জানা নেই। আমি যাদের হাতে ধরে গানের জগতে এনেছি আজকের দিলরুবা খান, মুজিব পরদেশি, আশরাফ উদাস, সুজন রাজাসহ সবাই আলমাস ভাইয়ের কাছে ঋণী। আরও অনেকেই কে না? আমার মনে আছে আমি যখন ভাবলাম মমতাজের গান করব তখন মমতাজ আমাকে বললেন, আপনার গান তো আর দশজনের মতো নয় তাই গাইতে হলে কয়েকদিন আগেই সুর তুলে দিতে হবে। না হলে আপনি যা চাইবেন সে রকম হবে না। আর গান তুলে দিতে হবে আমার বাড়ি সিঙ্গাইর গিয়ে। এক কথায় রাজি হয়ে বললাম আমার সঙ্গে আর একজন যাবেন। বললেন কে? আমি বললাম আলমাস ভাই, আমি বলতেই মমতাজের চোখে মুখে খুশির ঢেউ খেলে গেল। অনেক বিনয় করে আমাকে বললেন, যেভাবেই পারেন আলমাস ভাইকে নিয়ে যাবেন। আমি আর আলমাস ভাই মমতাজের বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম আগের ঠিক করে রাখা দিনে। দুপুর বেলা। খুব গরম। মমতাজ আমাদের আপ্যায়ন করার জন্য কিছুই বাকি রাখেননি বলে মনে হলো। ঘরে না বসে আলমাস ভাই বললেন বাড়ির সামনে আম গাছের ছায়ায় বসব। এরপর আমাদের সুন্দর একটা পাটি পেতে দিলেন। ওখানে বসেই গান তুলে দিলাম। গান শুনেই মমতাজ এবং আলমাস ভাই বললেন ‘মতি ভাই গানগুলো দারুণ হয়েছে।’ কথা এবং সুর আমার কাছে একদম আলাদা। পেট ভরে খেয়ে আমরা ঢাকা চলে এলাম। মমতাজের কণ্ঠে আমার লেখা ও সুরে প্রথম গান ‘জাত গেল পিরিতে পাড়া দিয়া সোনা বন্ধুরে...’ (বেঈমান বন্ধু)। বেহালা বাজালেন আলমাস ভাই। শুরু হলো আমার জীবনের নতুন আর এক পথচলা। মমতাজ আর সঙ্গে আলমাস ভাই। সব এ্যালবাম সুপারহিট নজিরবিহীন ঘটনা। সেই আলমাস ভাই আজ ক্যান্সারে আক্রান্ত। তার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ। বেহালা বাজাতে পারছেন না। জানি না তাঁর মনের ভাব কী। তবে বুঝতে পারি বেহালা ছেড়ে থাকা তাঁর জন্য কত কষ্টের। আমরা চেষ্টা করছি কিছু করার জন্য। সবাই দোয়া করবেন। মনে রাখবেন আলমাস ভাইদের মতো যন্ত্রশিল্পীরা যদি না থাকতেন আমাদের গান কে শুনত? আমরা যদি চাল, তেল, লবণ, মরিচ হই আলমাসরা হলেন বাবুর্চি। উনাদের পাক ভাল না হলে কেউ খেতে পারবেন না। যত দামী মসলাই হোক। একজন গায়ক-গায়িকা অসুস্থ হলে আমরা যেমন মানবিক কারণে ঝাঁপিয়ে পড়ি, আসুন একজন যন্ত্রশিল্পীর বেলায়ও তেমনিভাবে এগিয়ে আসি। ভুলে যাবেন না গানের ভুবনে যারা আছি তারা সবাই মিলে একটি পরিবার। সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায় আমরা সবাই এক মিছিলের সহযাত্রী। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি আলমাস আলী ভাই যেন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসে। তাঁর বেহালায় আবার বেজে উঠুক ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি...’। সেই প্রত্যাশা।