১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

খালেদা জিয়ার বিলেত যাত্রা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

  • সিডনির মেলব্যাগ ॥ অজয় দাশগুপ্ত

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন অনেক প্রাজ্ঞ। তাঁর চিন্তা ও অভিজ্ঞতা ব্যাপক পরিবর্তিত। খালেদা জিয়ার লন্ডন যাত্রার পর তিনি ডেভিড ক্যামেরনকে যে সতর্ক বার্তা পাঠিয়েছেন তার মূল্য অনেক। লন্ডনের মাটিতে বসে যারা নানা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, দেশে দেশে মৌলবাদের রফতানিকারকদের বিরুদ্ধে এই হঁশিয়ারি আমাদের জন্য তো বটেই খোদ বিলেতের জন্যও দরকারী। যাক মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

মাতা-পুত্রের মিলন সবসময় আনন্দের। জগতে যত সম্পর্ক আছে তার ভেতর এটাই মধুরতম। খালেদা জিয়াও তারেক রহমানের দেখা হওয়ার ঘটনাটা সেদিক থেকে ঠিক আছে। তবে এই দেখা হওয়া না হওয়ার কারণ কিন্তু এমন যাতে আমাদের দেশ জাতিও জড়িত। একদা দেশের যুবরাজ, হাওয়া ভবনের মালিক খাম্বারাজ নামে পরিচিত তারেক রহমান কিন্তু স্বেচ্ছায় বিদেশ যাননি। তার এই আপাত অগস্ত্য যাত্রার পেছনে আছে কালো ইতিহাস। দেশের রাজনীতিতে বোমা ছুরি গুলি বা চাপাতি নতুন পুরনো যাই হোক না কেন গ্রেনেড একেবারেই ভিন্ন স্বাদের একটা বিষয়। আমরা জানতাম যুদ্ধে ব্যবহার করে সৈনিকরা। মুক্তিযুদ্ধের সময় গ্রেনেড হামলা ছিল আশাব্যঞ্জক একটি খবর। আবার উপমহাদেশে পাক- ভারত লড়াইতেও এর বহুল ব্যবহার শুনেছিলাম। কিন্তু খোদ ঢাকার বুকে বড় বড় গ্রেনেড হামলা বড়সড় বুকের পাটা না থাকলে করানো বা করা অসম্ভব। নিন্দুকরা বলে এর সামনে যদিও ছিল উগ্রবাদী নামের কিছু যুবক বা মানুষ, নেতা হিসেবে যদিও ছিল চুল খাড়া জেলিমাখা বাবর, পেছনে নাকি ছিলেন এই তারেক রহমান। কি করে কি করে জানি আমাদের দেশের সঞ্জয় গান্ধী হয়ে ওঠা তারেকের মার অবস্থাও ধীরে ধীরে ইন্দিরা গান্ধীর মতো হয়ে গেছিল। পার্থক্য এই ইন্দিরার পুত্রটি ষড়যন্ত্রে বা দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর শ্রীমতী গান্ধী তাঁর দূরদর্শিতা আর প্রজ্ঞায় আবারও উঠে দাঁড়াতে পেরেছিলেন। কিন্তু খোদার ফজলে তারেক মরেননি তার মাও এখন পর্যন্ত আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি।

খালেদা জিয়াকে যদ্দিন আপোসহীন নেত্রী বলে জানতাম ততদিন তাকে পুরো না হলেও কিছু বুঝতাম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বদলায়। তিনি ও তার দলের বয়স বাড়ার পর এমন বদলে গেলেন যে আমরা যারা আহম্মক বা বোকা টাইপের পড়ে গেলাম বড় ফাঁপড়ে। কখনও মনে হতে লাগলো বিএনপি আসলে জামায়াত অঙ্গ সংগঠন কখনওবা উগ্রবাদী কখনও নেই নেই ভাবের ছায়াভূত। মুশকিলটা বাড়ল যখন আওয়ামী লীগ যেন তেন প্রকারে একটা নির্বাচন করে পাওয়ারে চলে গেল। বিএনপি না পারল ঠেকাতে না জনমত গড়ে তুলতে। বদলে তাদের আসল জায়গা হারিয়ে হয়ে উঠল জামায়াতের ছায়াসঙ্গী। এককালে যে জামায়াত বিএনপির কল্যাণে দেশের রাজনীতিতে জায়গা করতে পেরেছিল তারাই চলে এলো চালকের আসনে। কথাগুলো বললাম এই কারণে যে, এর পেছনে তারেক রহমানের ভূমিকাই দায়ী। একটা কথা মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের মানুষ যেকোন বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে। তারা কখনও নীরবে কখন সরবে তার জানান দেয়। ভারতবিরোধিতা সাম্প্রদায়িকতা আর পাক প্রীতির রাজনীতি যে চিরকাল চলবে না এটা হয়ত আঁচ করতে পারেনি তারা। পারার কথাও না। রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ পুঁচকে তারেক রহমান যাদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন বা যারা তাকে মদদ দিত তাদের সামনে ছিল এক আদর্শ এক উদ্দেশ্যÑ ভোগ আর মজা লোটা। কোন ভবন যে কাউকে বাঁচাতে পারে না সেটা বোঝার আগেই তার বিদায়ের ঘণ্টা বেজে যায় এবং একসময় গণতন্ত্রের সূতিকাগার নামে পরিচিত বিলেতে আশ্রয় নেয়া তারেক মাঝে মাঝেই খবরের শিরোনাম হতে শুরু করেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে তার একটি অডিও ভিডিও বার্তা দেখা ও শোনার সুযোগ হয়েছিল। বাংলা বলেন ভাল। উচ্চারণও পরিষ্কার। কিন্তু বিষয়বস্তু ছিল সাংঘাতিক। জানি না কারা তাকে মদদ ও উস্কানি দিয়েছিল। তাদের কথামতো তারেক ভেবেছিলেন তিনি বললেই বাংলার মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্বাচন বয়কটের জন্য জান দিতে এগিয়ে আসবে। খাম্বার ছেঁড়া তারে তখনও যে জোড়া লাগেনি সেটা বুঝতে না পারার মাসুল দিয়েছে বিএনপি। তখন থেকে একধরনের আন্ডার গ্রাউন্ড খেলা আর অফিসে বসবাস করে খালেদা জিয়া হয়ে উঠলেন আর নিঃসঙ্গ। এদিকে রাস্তায় মাতমÑ পেট্রোলবোমা, যানবাহন, মানুষের জীবননাশ আরেকদিকে না আন্দোলন না কোন সমঝোতা। এসব কিছু একসময় থিতিয়ে এলে খালেদা জিয়া কি এখন আসলে আইনের ভয়ে বিচারের রায় বেরুনোর আগে সরে পড়লেন, না এও এক ধরনের গোপন সন্ধি?

যে কথা বলছিলাম, আমাদের দেশের হাজার হাজার পরিশ্রমী মানুষ যারা বিদেশে কষ্ট করেন দিনরাত পরিশ্রম করেন তাদের অনেকের গাড়ি নেই। রিকশা অটোহীন এসব দেশে কি কষ্ট আর দুর্ভোগ তা দেশের মানুষ কল্পনাও করতে পারবেন না। যারা গাড়ি কেনেন তাদের বেশিরভাগের গাড়ি সেকেন্ড হ্যান্ড, থার্ড হ্যান্ড বা হাত হাত বদলাতে বদলাতে প্রায় নো হ্যান্ড টাইপের। কিন্তু পার্থক্য এই তারা সবাই দেশে টাকা পাঠান। রক্তে অর্জিত অর্থ পাঠিয়ে দেশকে সবল করেন। আর তারেক রহমানরা দেশের টাকায় বিদেশে মার্সিডিজ হাঁকান। কি যে দিনকাল পড়েছে সভ্য দেশেও এগুলোর কোন স্বচ্ছতা বা জবাবদিহিতা নেই। গাড়ি কোম্পানিভাবে আমার গাড়ি বিক্রি হলেই হলৌল ইন্স্যুরেন্স ভাবে মন্দ কি আমার তো ব্যবসা হলো। এভাবেই চলছে।

তারেক রহমানের আয় উপার্জনের উৎস জানা আমার উদ্দেশ্য নয়। তাদের জমানো টাকা অঢেল হতেও পারে। আর দেশে-বিদেশে তাদের দেয়ার বা নেওয়ার লোকের সংখ্যাও কম নয়। আমাদের দুর্ভাবনা অন্যত্র। ষড়যন্ত্র কি থেমে থাকবে? খালেদা জিয়া এখন প্রায় নিঃসঙ্গ আর হতাশ। যেকোন ফাঁদে পড়ার এটাই সময়। মহাভারতের বিদুষী গান্ধারীও সন্তানের শঠতায় নীতিতে থাকতে পারেননি। তারেক রহমান বিলাতের রাজনীতি করেন না। লেবার, লিবারেল, কনজারভেটিভ কোন দলে যাওয়ার মতো জায়গায় নেই তিনি। তার ধ্যান জ্ঞান সব দেশের সিংহাসনকেন্দ্রিক। প্রায় পেতে পেতে হারিয়ে ফেলা বস্তুটি কি এত সহজে ছেড়ে দেবেন? সঙ্গে আছে জামায়াতের বিদেশী লবিং আর অর্থায়ন। আর শুনতে খারাপ লাগলেও সত্য আওয়ামী লীগের চাইতে নীরব ভোটে বিএনপি এগিয়ে। আওয়ামী লীগবিরোধী দলে ভাল খেললেও সরকারে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া বাকিরা কমবেশি হোপলেস। আশাহীন মানুষদের ওপর জনগণের আস্থাও তাই নড়বড়ে।

আগেই লিখেছি মা পুত্রের মিলন মধুর। তবে এর পানি কোথায় গড়াবে বলা মুশকিল। সরকার বাধ্য হবে অথবা সমঝোতায় যেভাবেই তাঁকে যেতে দিক না কেন এর একটা অন্তর্নিহিত রহস্য অবশ্যই আছে। কে নিরাপদ আর কারা আসলে জয়ী তা এখনই বলা যাবে না। তবে অনেকদিন পর বিদেশের আলো হাওয়া গায়ে মাখা খালেদা জিয়া নিশ্চয়ই তাঁর লাল কার্পেট আর রাজকীয় অর্ভ্যথনা মিস করবেন। অন্যদিকে তারেক রহমানের চিন্তা চেতনা আর রাজনীতিতে যদি এখনও উগ্রতা আর ষড়যন্ত্র থাকে তার মাসুলও ছেড়ে কথা বলবে না। অগ্রজরা বহুকাল আগে বিলেত ঘুরে এসে লিখেছিলেন : বিলেত দেশটা মাটির। সে দেশে বাংলাদেশের ভাল-মন্দ উভয়দিকে কাজ করার মানুষগুলো প্রমাণ করেছে মাটির হলেও এর একটা কঠিন পাষাণ দিক আছে। এই সফর কি সেই জগদ্দল পাথরকে ভারি করবে না নতুন কোন আপদ বিপদ ডেকে আনবে ? না সবকিছু চলবে সেই ছকে যার হদিস খোদ সরকার, বিরোধী দল বা নেতা-মন্ত্রী কেউই জানে না ? সেটাই এখন দেখার বিষয়।