১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

১৫২ জনকে হত্যা করে বিজয় উল্লাস করেছিল পাকিরা

  • বোয়ালিয়া দিবস আজ ॥ স্বাধীনতার মূল্য কত তা স্মরণ করিয়ে দেয় দিনটি

স্টাফ রিপোর্টার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ॥ আজ ১৯ সেপ্টেম্বর। গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়াবাসীর কাছে দুঃস্বপ্নের এক কালো দিবস। একাত্তরের এই দিনে ইতিহাসের এক জঘন্যতম হত্যাকা- চালিয়েছিল বর্বর পাকি হানাদার বাহিনী। মাত্র কয়েক ঘণ্টার নারকীয় তা-বে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৫২ জন। অসহায় নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে বিজয় উল্লাস করেছিল। ঘৃণিত পাকিরা বিজয় উল্লাসে লাশ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফুটবল খেলেছিল দিনভর। শহীদ ১৫২ বাঙালীর মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা ছিল বেশি। নিরস্ত্র আবালবৃদ্ধ বনিতার ওপর নির্বিচারে গুলি করে হত্যার সময় রেহাই পায়নি অবুঝ ২-১ মাসের বাচ্চারাও। এমনকি মায়ের পেটে থাকা শিশুদেরও বেয়োনেট ব্যবহার করে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সেই থেকে দিনটিকে বোয়ালিয়া হত্যা দিবস বলা হয়ে থাকে। দিনটি বোয়ালিয়ার স্বাধীনতাকামী মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় তাদের কাছে স্বাধীনতার মূল্য কত বেশি। এখনও মায়ের কোলে মাথা রেখে এ প্রজন্মের শিশুরা আতঙ্কে ও ভয়ে ঘুমিয়ে পড়ে কাহিনী শুনে। এই অঞ্চলের তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা বারবার পাকিদের নাজেহাল করায় তারা অনেকটাই বেপরোয়া হয়ে উঠে। তাড়া খাওয়া হানাদাররা দূরে সরে গেলেও প্রতিশোধ নিতে নারকীয় হত্যায় মেতে উঠে। একাধিক অস্থায়ী ক্যাম্প থেকে একত্রিত হয়ে আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে একাত্তরের ১৯ সেপ্টেম্বর রবিবার সকালে ঝাঁপিয়ে পড়ে বোয়ালিয়া গ্রামে। পরাজয়ের গ্লানির জ্বালা মেটাতে রাজাকারদের প্রত্যক্ষ মদদে প্রায় পাঁচশ’ হানাদার বাহিনী স্বয়ংক্রিয় ভারি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মহানন্দা নদী পেরিয়ে প্রথমেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ল-ভ- করে দখলে নেয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে এর আগে এই ডিফেন্স থেকে উচ্ছেদ হয়ে পাকিরা পালিয়েছিল। এদিন হানাদার বাহিনী একই সঙ্গে ঘেরাও করে ১৬টি গ্রাম। ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রথমেই লুণ্ঠন ও গণধর্ষণে। গান পাউডার ব্যবহার করে প্রতিটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের তাপে বাড়ির সদস্যরা বেরিয়ে আসলে গুলি চালিয়ে ঝাঝরা করা হতো বাঙালীদের। কিশোরী, যুবতী ও নারী পেলে দূরে সরিয়ে প্রথমে ধর্ষণ তারপর হত্যা করা হয়। গুলির পর গুলি চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়া পাকিরা শিশুদের পেটে বেয়োনেট ঢুকিয়ে দূরে নিক্ষেপ করেছে। শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা মাথা বুটের আঘাতে ফুটবলের মতো এদিক সেদিক ঠেলে দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বিজয় উল্লাস করেছে। নির্মমতা থেকে রক্ষা পায়নি গোয়াল ঘরের পশুরাও। তাদের গুলি করে কিংবা পুড়িয়ে মেরেছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বোয়ালিয়াসহ ১৬ গ্রামের পুরো অস্তিত্ব চাপা পড়ে যায় জলন্ত ছাইয়ের স্তূপের নিচে। মানুষসহ কোন প্রাণের অস্তিত্ব ছিল না গ্রামগুলোতে। গৌরীপুর, দরবারপুর, ঘাটনগর, লক্ষ্মীপুর, নারায়ণপুর, নওদাপাড়া, বোয়ালিয়া, বোরতলী, কাঞ্চনতলা, বড়বঙ্গেশপুর, বঙ্গেশপুর, বাবুপুর, চকমজুমদার, নরশিয়া, পলাশবনী, মাহাশুর ও আলমপুর গ্রামের বহু পরিবারের বংশ সাবাড় হয়ে গেছে। গম্ভীরা গানের প্রতিষ্ঠাতা নানা খ্যাত মরহুম কৃষিবিদ কুতুবুল আলমের স্ত্রীসহ একাধিক (সবকটি) সন্তান পাক হানাদারদের বোয়ালিয়া অভিযানে শহীদ হয়েছিল। ৪৫ বছর পার হওয়ার পরও আতঙ্ক তাড়া করে নিয়ে বেড়াচ্ছে গ্রামবাসীকে। বোয়ালিয়া হামলায় শহীদ এই পরিবার সদস্যদের অভিযোগ ৪৫ বছরেও বিষয়টি কেউ আমলে নেয়নি। তাদের অভিযোগ, যে সব চিহ্নিত রাজাকার সেদিন সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়ে পাকিদের নৃশংস করে তুলেছিল তাদের আজও কেউ বিচারের সম্মুখীন হয়নি।